দিল্লিতে শি?

যা জানা জরুরি
- সাত বছর পর ফের ভারতে আসতে পারেন চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।
- আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে বসতে চলা ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে তাঁর যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
- সফর চূড়ান্ত হলে শি-র সঙ্গে প্রায় ৪০০ সদস্যের বিশাল প্রতিনিধিদল ভারতে আসতে পারে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
সাত বছর পর ফের ভারতে আসতে পারেন চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে বসতে চলা ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে তাঁর যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সফর চূড়ান্ত হলে শি-র সঙ্গে প্রায় ৪০০ সদস্যের বিশাল প্রতিনিধিদল ভারতে আসতে পারে।
ভারত-চিন সম্পর্ক যখন সীমান্ত সংঘাতের দীর্ঘ ছায়া সরিয়ে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করছে, ঠিক তখন শি-র সম্ভাব্য দিল্লি সফরকে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন কূটনৈতিক মহল।
তবে এখনও কিছুই চূড়ান্ত নয়। শি-র সফরসূচি আনুষ্ঠানিক ভাবে ঘোষণা করেনি বেজিং। সম্ভাব্য দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের আলোচ্যসূচিও ঠিক হয়নি। তবে চিনা কর্মকর্তারা ইতিমধ্যেই দিল্লিতে প্রতিনিধিদলের থাকা ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রস্তুতি শুরু করেছেন বলে খবর। ৪০০ সদস্যের এই দলটি ২০১৯ সালে শি-র সঙ্গে ভারতে আসা প্রতিনিধিদলের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি হতে পারে।
অর্থাৎ, বেজিংয়ের কাছে এবারের ব্রিকস সম্মেলনের গুরুত্ব যে কম নয়, সেই বার্তাও মিলছে।
শেষ বার এসেছিলেন ২০১৯-এ
ভারতে শি-র শেষ সফর হয়েছিল ২০১৯ সালের অক্টোবরে। তামিলনাড়ুর মামল্লপুরমে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক শীর্ষ বৈঠকে যোগ দিয়েছিলেন তিনি।
তার কয়েক মাসের মধ্যেই বদলে যায় ভারত-চিন সম্পর্কের আবহ। পূর্ব লাদাখে শুরু হয় সামরিক উত্তেজনা। ২০২০ সালের জুনে গালওয়ান উপত্যকার সংঘর্ষে ২০ জন ভারতীয় সেনার মৃত্যু হয়। চিনেরও কয়েক জন সেনা নিহত হন।
এর পরেই প্রায় ৩,৮০০ কিলোমিটার দীর্ঘ বিতর্কিত সীমান্ত বরাবর বিপুল সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম মোতায়েন করে দুই দেশ। কয়েক দশকের মধ্যে সম্পর্ক পৌঁছে যায় অন্যতম তলানিতে।
বরফ কি একটু গলছে?
বহু দফা সামরিক ও কূটনৈতিক আলোচনার পরে ২০২৪ সালের অক্টোবরে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংঘর্ষস্থল থেকে সেনা সরানো এবং টহলদারি ফের শুরু করার বিষয়ে সমঝোতা হয়।
তাতে উত্তেজনা কিছুটা কমলেও সীমান্ত সমস্যার স্থায়ী সমাধান এখনও অধরা। সম্প্রতি টহলদার বাহিনী ফের মুখোমুখি চলে আসার ঘটনাও দেখিয়েছে, মাটির পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক নয়।
এই অবস্থায় দিল্লিতে শি এলে সেটি নিছক ব্রিকস সম্মেলনে অংশগ্রহণের সফর হবে না। মোদীর সঙ্গে পৃথক বৈঠক হলে সীমান্তে শান্তি, অসম্পূর্ণ সেনা প্রত্যাহার, টহলদারি, সরাসরি বিমান যোগাযোগ, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং দুই দেশের মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর মতো বিষয় সামনে আসতে পারে।
সীমান্তে ঠান্ডা, বাজারে উষ্ণতা
রাজনৈতিক অবিশ্বাস থাকলেও ভারত-চিন অর্থনৈতিক সম্পর্ক এখনও যথেষ্ট গভীর। চিন ভারতের অন্যতম বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। কিন্তু সেই সম্পর্কের মধ্যেই রয়েছে বড় অস্বস্তি—বাণিজ্য ঘাটতি, চিনা পণ্যের উপর নির্ভরতা এবং চিনের বাজারে ভারতীয় সংস্থাগুলির সীমিত প্রবেশাধিকার।
গালওয়ান সংঘর্ষের পর ভারত একাধিক চিনা মোবাইলভিত্তিক পরিষেবা নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি চিনা বিনিয়োগের উপরেও কড়া নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছিল।
তাই সম্পর্কের বরফ গলাতে হলে শুধু সীমান্তে শান্তি নয়, নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্বার্থের মধ্যেও নতুন সমীকরণ খুঁজতে হবে।
ডোভাল-ওয়াং বৈঠকে কী হল?
এই আবহেই ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল এবং চিনের বিদেশমন্ত্রী ওয়াং ই ২৫ আগস্ট বেজিংয়ে সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠক করেছেন।
দুই পক্ষই একটি ন্যায্য, যুক্তিসঙ্গত এবং পারস্পরিক ভাবে গ্রহণযোগ্য সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে। সীমান্তে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং মতপার্থক্য নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত যোগাযোগ বাড়ানোর উপরেও জোর দেওয়া হয়েছে।
পরবর্তী দফার সীমান্ত আলোচনা ২০২৭ সালে ভারতে হওয়ার কথা।
আমেরিকাও কি ফ্যাক্টর?
আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও ভারত ও চিনকে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আমেরিকার শুল্কনীতি, পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বিশ্ব বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে উন্নয়নশীল দেশগুলির মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজন বাড়ছে।
ব্রিকস সম্প্রসারিত হওয়ার পর সংগঠনটির রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্বও বেড়েছে। ভারত ও চিন এশিয়ায় কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলির সংস্কারের মতো কিছু বিষয়ে তাদের অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে।
চিনের বিদেশ মন্ত্রক ভারতের ব্রিকস সভাপতিত্বকে সমর্থনও জানিয়েছে।
এক সফরে কি বরফ গলবে?
এখনও শি-র দিল্লি সফর নিশ্চিত করেনি বেজিং। কিন্তু তিনি এলে ব্রিকস সম্মেলনের গুরুত্ব এক ধাক্কায় অনেকটাই বাড়বে। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে নজর থাকবে মোদী-শি বৈঠকের দিকেও।
তবে একটি উচ্চপর্যায়ের সফরেই পাঁচ বছরের অবিশ্বাস মুছে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। শেষ পর্যন্ত ভারত-চিন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ ঠিক করবে সীমান্তে বাস্তব শান্তি, ধারাবাহিক সংলাপ এবং একে অপরের নিরাপত্তা ও সংবেদনশীলতার প্রতি সম্মান।
শি দিল্লিতে এলে তাই আসল প্রশ্ন হবে একটাই—এ কি সত্যিই সম্পর্ক জোড়ার নতুন শুরু, নাকি কূটনীতির মঞ্চে সাময়িক উষ্ণতা?
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



