চাষের খরচ কমাতে বিদ্যুতে ভর্তুকি এবং আলুচাষিদের জন্য পরিবহণ, ফসলবিমা ও বাজারদরে সহায়তার একগুচ্ছ ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর হুগলির পুরশুড়ার সভা থেকে তিনি জানান, রাজ্যের চার লক্ষ কৃষককে বিদ্যুতের প্রতি ইউনিটে ২ টাকা ভর্তুকি দেওয়া হবে। পাশাপাশি আলিপুরদুয়ার, ঝাড়গ্রাম ও পুরুলিয়ার কৃষকদের জন্য বিশেষ প্যাকেজের প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি। কৃষকের আয় ও ফসল বিক্রির সমস্যা মোকাবিলাকে সরকারের অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী।

আলুচাষিদের জন্য ঘোষণার গুরুত্বপূর্ণ অংশ অন্য রাজ্যে ফসল পাঠানোর সুযোগ। মুখ্যমন্ত্রী জানান, সড়ক বা রেলপথে ভিন্‌রাজ্যে আলু পাঠালে প্রতি কুইন্টালে ৫০ টাকা পরিবহণ ভর্তুকি দেবে সরকার। সীমান্তে আলুবোঝাই গাড়ি আটকানো হবে না বলেও আশ্বাস দেন তিনি। অতিরিক্ত উৎপাদন হলে বিহার, ঝাড়খণ্ড, অসম বা উত্তরপ্রদেশের বাজারে আলু বিক্রি করতে পারবেন চাষিরা। এতে রাজ্যের বাইরের ক্রেতাদের কাছে ফসল পৌঁছনোর খরচ কিছুটা কমবে।

বাজারে আলুর দাম পড়ে গেলে আর্থিক সহায়তার কথাও ঘোষণা করেছেন শুভেন্দু। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতি কুইন্টালে ১,১২০ টাকা ‘ফ্রি বন্ড’ মূল্যের নীচে দর নেমে গেলে সেই ঘাটতি ভর্তুকির মাধ্যমে পূরণ করবে রাজ্য সরকার। ফসলের দাম কমে যাওয়ায় চাষিদের যে ক্ষতির মুখে পড়তে হয়, তার মোকাবিলায় এই ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। তবে সহায়তা পাওয়ার শর্ত এবং মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হবে।

আলু চাষকে প্রধানমন্ত্রী ফসলবিমা যোজনার আওতায় আনার কথাও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। বিমার প্রিমিয়ামের যে অংশ কৃষকদের দেওয়ার কথা, তা রাজ্য সরকার বহন করবে বলে তাঁর আশ্বাস। অর্থাৎ, ঘোষিত ব্যবস্থা কার্যকর হলে আলুর ফসলের বিমার জন্য চাষিদের নিজেদের টাকা দিতে হবে না। পরিবহণে সহায়তা, দামের সুরক্ষা এবং বিমা—এই তিন ব্যবস্থার মাধ্যমে আলুচাষের আর্থিক ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা করছে সরকার।

ফসল সংরক্ষণ ও বিপণনের পরিকাঠামো নিয়েও একাধিক পরিকল্পনার কথা জানান শুভেন্দু। ‘স্মার্ট মান্ডি’ উদ্যোগে ৫০টি আদর্শ কৃষিবাজার গড়ে তোলা হবে; প্রতিটির জন্য বরাদ্দ ৩ কোটি টাকা। সুফল বাংলার পরিষেবা বাড়াতে আরও ৫৫০টি বিক্রয়কেন্দ্র যুক্ত করার কথাও ঘোষণা করা হয়েছে। এই ব্যবস্থায় কৃষকদের কাছ থেকে উপযুক্ত দামে আলু কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সরকার। হিমঘরগুলির মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং সেখান থেকে ফসল বিক্রির সুবিধা তৈরির কথাও বলেন মুখ্যমন্ত্রী।

সভায় শুভেন্দু দাবি করেন, রাজ্যের ৪৬ লক্ষের বেশি কৃষক প্রধানমন্ত্রী কিষান সম্মান নিধির সুবিধা পাবেন। কেন্দ্রের এই প্রকল্পে কৃষক পরিবার বছরে তিন কিস্তিতে মোট ৬,০০০ টাকা পায়। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, রাজ্যের সহায়তা মিলিয়ে কৃষকদের প্রাপ্তি বছরে ৯,০০০ টাকা হবে। কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দলের সরকার থাকার সুফল হিসেবে এই বাড়তি সহায়তাকে তুলে ধরেন তিনি।

বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সাহায্যের ঘোষণাও হয়েছে। সম্পূর্ণ ভেঙে যাওয়া বাড়ির জন্য ১ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা, আংশিক ক্ষতির জন্য ৯০ হাজার এবং সামান্য ক্ষতির ক্ষেত্রে ৪,০০০ টাকা দেওয়ার কথা জানান মুখ্যমন্ত্রী। মালদহের ভূতনির চরের ১০,৭৫০ জন বন্যাদুর্গত কৃষকের মধ্যে মুসুর ও সর্ষের বীজ বিতরণ করা হয়।

আগের তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে আলুর গাড়ি আটকে কৃষকদের বিপাকে ফেলার অভিযোগ করেন শুভেন্দু। তাঁর দাবি, পুলিশের নির্দেশে পরিবহণে বাধা সৃষ্টি হয়েছিল। বর্তমান সরকার সেই পরিস্থিতি বদলাতে চায়। আগের সরকার রাজ্যের বাজারে আলুর দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভিন্‌রাজ্যে সরবরাহে বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল। সেই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ব্যবসায়ীরা ধর্মঘটও করেছিলেন। ফলে নতুন ঘোষণায় চাহিদা ও কৃষকের স্বার্থের ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্নও থাকছে।

তবে ঘোষণাগুলির সাফল্য নির্ভর করবে ভর্তুকি সময়মতো পৌঁছনো, প্রকৃত চাষির কাছে সহায়তা যাওয়া এবং ফসল বিক্রির কার্যকর সুযোগ তৈরির উপর। বিশেষত দাম কমার ক্ষতিপূরণ কীভাবে হিসাব হবে ও কৃষক কীভাবে আবেদন করবেন, সেই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা জরুরি।