গির্জা ও প্রার্থনাসভায় হামলার প্রতিবাদে প্রার্থনাকেই হাতিয়ার করলেন খ্রিস্টানরা। বৃহস্পতিবার কলকাতার রানি রাসমণি অ্যাভিনিউয়ে বঙ্গীয় খ্রিস্টীয় পরিষেবার ডাকে সমবেত হন বিভিন্ন জেলার মানুষ। ওড়িশা, নাগাল্যান্ড ও মিজোরাম থেকেও ধর্মীয় নেতারা যোগ দেন। সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা রাজ্য সম্পাদক হেরোদ মল্লিকের অভিযোগ, গত পাঁচ মাসে ভয় দেখানো, ভাঙচুর ও মারধরের ঘটনায় রাজ্যের খ্রিস্টানরা অভূতপূর্ব সংকটে পড়েছেন।

মল্লিক জানান, নথিভুক্ত ঘটনার সংখ্যা ৪৮ হলেও প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। তাঁর দাবি, এফআইআর হয়েছে মাত্র ১৬টি; বহু ক্ষেত্রেই পুলিশ অভিযোগ নিতে চায়নি। কোথাও পুলিশ হামলাকারীদের সঙ্গে সহযোগিতা করেছে, কোথাও তাদের চাপে কাজ করেছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এই সংখ্যাগুলি সংগঠনের বক্তব্য, স্বাধীনভাবে যাচাই করা সরকারি পরিসংখ্যান নয়।

সমাবেশে পশ্চিম মেদিনীপুরের বালিচকের বাসিন্দা পঞ্চুগোপাল মণ্ডল জানান, প্রায় পাঁচ বছর আগে তিনি খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর অভিযোগ, ৩০ সেপ্টেম্বর মায়ের সমাধিস্থ করার অনুষ্ঠানের সময় বাড়িতে হামলা হয়। পুলিশ সাধারণ ডায়েরিও নিতে অস্বীকার করে। বারবার আবেদনেও প্রশাসনিক সাহায্য মেলেনি বলে দাবি তাঁর। নভেম্বরের শেষদিকে বিভিন্ন গির্জার নেতৃত্বকে নিয়ে আলোচনায় বসে ধর্মান্তরণ সম্পর্কে ভুল ধারণা দূর করার পরিকল্পনার কথাও জানান মল্লিক।

প্রতিবাদের পাশাপাশি আলোচনার পথও খোলা রাখছে সংগঠনটি। বুধবার মল্লিকের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল আরএসএস নেতা জিষ্ণু বসুর সঙ্গে দেখা করে। তাদের বিবৃতিতে বলা হয়, প্রতিষ্ঠিত গির্জা থেকে বাড়িতে আয়োজিত প্রার্থনাসভা—বিভিন্ন জায়গায় যাজক ও বিশ্বাসীদের আক্রমণ করা হচ্ছে। প্রলোভন দেখিয়ে ধর্মান্তরণের অভিযোগ তুলে এসব হামলা চালানো হচ্ছে বলে প্রতিনিধিরা জানান। প্রশাসনের সাড়া না পাওয়ার অভিযোগও আলোচনায় তোলা হয়।

বসু জানান, খ্রিস্টান সংগঠনগুলির সঙ্গে আলোচনা চলবে। তবে জোর করে ধর্মান্তরণ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তাঁর বক্তব্য, হামলা এবং জোরপূর্বক ধর্মান্তরণ—দুই ধরনের অভিযোগেরই তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। খ্রিস্টান প্রতিনিধিরা জানান, চার্চ বেআইনি ধর্মান্তরণের বিরোধী; যাঁরা স্বেচ্ছায় নিজের বিশ্বাস থেকে আসেন, তাঁদেরই গ্রহণ করা হয়। মল্লিকও উভয় অভিযোগের তদন্তের পক্ষে সওয়াল করেন। ফলে এই আলোচনায় হামলা বন্ধের দাবির সঙ্গে ধর্মান্তরণের অভিযোগ খতিয়ে দেখার প্রশ্নটিও উঠে এসেছে। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে তদন্তের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন উভয় পক্ষই।

এই সমাবেশের আগে, ২ নভেম্বর কলকাতায় নাগরিক সমাজের উদ্যোগে আয়োজিত গণশুনানিতেও আক্রান্তদের বক্তব্য নথিবদ্ধ হয়। হর্ষ মন্দার, জহর সরকার, আকার পটেল, জন দয়ালসহ বিশিষ্টজনেরা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। ওই গণমঞ্চ গত ছয় মাসে রাজ্যে খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে হিংসার ৪৮টি ঘটনার কথা জানায়। প্রার্থনাসভায় হামলা, সম্পত্তি নষ্ট এবং পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ উঠে আসে সাক্ষ্যগুলিতে।

পশ্চিম মেদিনীপুরের এক মহিলা অভিযোগ করেন, ২ অক্টোবর তাঁর বাড়ির প্রার্থনাসভায় ৮০ থেকে ১০০ জন হামলা চালায়। তাঁকে মারধর করে তুলসীগাছ পুঁততে এবং ধর্মীয় স্লোগান দিতে বাধ্য করা হয়। তাঁর দাবি, থানায় দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করানোর পরে দু’দিন বাদে এফআইআর নেয় পুলিশ; উল্টে প্রার্থনাসভা না করার সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়।

এখানে ৪৮ সংখ্যাটি শুধু গির্জার উপর হামলার হিসাব নয়; বাড়িতে প্রার্থনাসভা, বিশ্বাসীদের হেনস্থা এবং অন্যান্য হিংসার অভিযোগও তার মধ্যে রয়েছে। আক্রান্তদের বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে, হামলার পরেও অভিযোগ জানাতে গিয়ে তাঁদের নানা বাধার মুখে পড়তে হয়েছে।

উত্তর ২৪ পরগনার হিঙ্গলগঞ্জের রত্না মণ্ডল জানান, গিটার শেখাতে আসা এক আর্জেন্টিনীয় দম্পতিকে আশ্রয় দেওয়ার পরে তাঁর বাড়িতে হামলা হয়। ধর্মান্তরণের অভিযোগ তুলে ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয় বলে দাবি তাঁর। ঘটনার পর থেকে নিজের বাড়িতে নিয়মিত থাকতেও পারছেন না তিনি। এসব সাক্ষ্যে উঠে আসা ভয় ও নিরাপত্তাহীনতাই বৃহস্পতিবারের প্রতিবাদকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করেছে।