শিল্পে বিনিয়োগ টানার পাশাপাশি কর্মসংস্থান বাড়ানোকে প্রধান অগ্রাধিকার দিয়ে নতুন বিনিয়োগ উৎসাহ নীতি ঘোষণা করল পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সরকার। বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর নিউ টাউনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল ইনভেস্টমেন্ট প্রোমোশন পলিসি, ২০২৬’ প্রকাশ করেন। এই নীতিতে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের একাধিক আর্থিক সুবিধাকে সরাসরি কর্মী নিয়োগের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। শিক্ষিত যুবসমাজের কাজের সুযোগ বাড়ানো এবং শিল্পে পিছিয়ে থাকা এলাকায় বিনিয়োগ পৌঁছে দেওয়াই ঘোষিত লক্ষ্য।
নতুন ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক কর্মীদের প্রভিডেন্ট ফান্ডে নিয়োগকর্তার জমা দেওয়া অর্থের একাংশ ফেরত দেওয়া। যোগ্য অতি ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে মহিলা এবং রূপান্তরকামী কর্মীদের জন্য নিয়োগকর্তার ইপিএফ অবদানের সম্পূর্ণ অর্থ ফেরত দেবে রাজ্য। পুরুষ কর্মীদের ক্ষেত্রে ফেরত মিলবে ৫০ শতাংশ। এই সুবিধা পাওয়া যাবে দশ বছর। অর্থাৎ কর্মী নিয়োগের নিয়মিত ব্যয় কমিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলিকে কর্মসংস্থান বাড়াতে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।
পরিষেবা ক্ষেত্রেও নিয়োগের ভিত্তিতে সুবিধা নির্ধারিত হয়েছে। দু’শোর বেশি কর্মী রয়েছে, এমন যোগ্য প্রতিষ্ঠানে মহিলা কর্মীদের জন্য নিয়োগকর্তার ইপিএফ অবদানের ৭৫ শতাংশ এবং পুরুষদের ক্ষেত্রে ৫০ শতাংশ ফেরত দেওয়া হবে পাঁচ বছর। বড় শিল্প ও মেগা প্রকল্পে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত এলাকায় অন্তত ২০০ এবং অন্য এলাকায় অন্তত ৪০০ জনের কর্মসংস্থান হলে পাঁচ বছর ৫০ শতাংশ ইপিএফ সহায়তা মিলবে। সম্প্রসারণের সুবিধা পেতে চালু প্রতিষ্ঠানকেও অতিরিক্ত কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে।
প্রণোদনার মোট পরিমাণেও এলাকা ও শিল্পের ধরন অনুযায়ী পার্থক্য রাখা হয়েছে। সাধারণ যোগ্য প্রকল্পে অনুমোদিত যন্ত্রপাতি ও উৎপাদন সরঞ্জামে বিনিয়োগের সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত সহায়তার সংস্থান রয়েছে। বিশেষ গুরুত্বপ্রাপ্ত শিল্প অথবা অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত এলাকায় তা ১১০ শতাংশ। দু’টি শর্তই পূরণ হলে সর্বোচ্চ সীমা হবে ১২০ শতাংশ। এই অর্থ একবারে দেওয়া হবে না; উৎপাদন শুরু হওয়ার পরে নির্ধারিত শর্ত ও বার্ষিক সীমা মেনে পর্যায়ক্রমে সুবিধা মিলবে।
বিনিয়োগকারীদের প্রশাসনিক দেরি কমানোর জন্য এক জানালা পদ্ধতিতে অনলাইন আবেদনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আবেদন জমার ৩০ দিনের মধ্যে প্রাথমিক অভিপ্রায় সনদ এবং উৎপাদন শুরুর ৪৫ দিনের মধ্যে যোগ্যতার সনদ দেওয়ার কথা। সম্পূর্ণ দাবি জমা পড়ার পরে সহায়তা অনুমোদনের জন্যও ৩০ দিনের সময়সীমা নির্ধারিত হয়েছে। বড় প্রকল্পে দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক থাকবেন; অগ্রগতি পর্যালোচনা হবে মুখ্যসচিবের স্তর পর্যন্ত।
বৈদ্যুতিক গাড়ি ও ব্যাটারি, সেমিকন্ডাক্টর, সবুজ হাইড্রোজেন, প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, ওষুধ, জাহাজ নির্মাণ এবং খাদ্য প্রক্রিয়াকরণের মতো ক্ষেত্রকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, পর্যটন ও শিক্ষার মতো পরিষেবার জন্যও আলাদা সুবিধা রয়েছে। শিল্পে পিছিয়ে থাকা এলাকায় বাড়তি সহায়তা দিয়ে বিনিয়োগের ভৌগোলিক বিস্তার ঘটাতে চাইছে সরকার। বিদ্যুৎ শুল্ক, স্ট্যাম্প ডিউটি এবং গবেষণা ও উন্নয়নেও সহায়তার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
মহিলাদের কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ বাড়াতে শুধু নিয়োগের খরচে ছাড় নয়, পরিকাঠামোগত সহায়তাও থাকছে। একশোর বেশি মহিলা কর্মী কাজ করেন, এমন শিল্পগুচ্ছ বা পার্কে কর্মরত মহিলাদের আবাসন তৈরিতে অনুদানের প্রস্তাব রয়েছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে মহিলা এবং রূপান্তরকামী কর্মীদের নিয়োগে বাড়তি ইপিএফ সুবিধার সঙ্গে এই ব্যবস্থাও নতুন নীতির একটি উল্লেখযোগ্য দিক।
বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে নীতির স্থায়িত্বের আশ্বাসও দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রাথমিক সনদ পাওয়ার সময়ে যে সুবিধা নির্ধারিত হবে, পরবর্তী সংশোধনে তা কমানো হবে না বলে জানানো হয়েছে। অনুমোদিত সহায়তা দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট তহবিল থাকবে। আবেদন থেকে অর্থপ্রদান পর্যন্ত প্রক্রিয়া যতটা সম্ভব অনলাইনে চালানোর লক্ষ্য রাখা হয়েছে।
নীতির কাঠামো থেকে স্পষ্ট, সরকারি সহায়তার সঙ্গে বাস্তব নিয়োগের সম্পর্ক আরও দৃঢ় করতে চায় রাজ্য। তবে ঘোষণার সাফল্য নির্ভর করবে কতগুলি প্রকল্প উৎপাদনে পৌঁছয়, কতজন নিয়মিত কাজ পান এবং প্রতিশ্রুত সহায়তা সময়মতো মেলে কি না, তার উপর। এখন নজর থাকবে সেই বাস্তব ফলাফলে।
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
এই প্রতিবেদনে নতুন মন্তব্য গ্রহণ বন্ধ রয়েছে।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।