পশ্চিমবঙ্গে ভবিষ্যতে নিযুক্ত স্কুলশিক্ষকদের প্রত্যক্ষ রাজনীতি ও নির্বাচনে অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা জারির সিদ্ধান্ত ঘিরে বিতর্ক তীব্র হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সরকারের বক্তব্য, শিক্ষার পরিবেশ ও পেশার মর্যাদা রক্ষার জন্য এই পদক্ষেপ প্রয়োজন। বিরোধী দল এবং একাধিক শিক্ষক সংগঠন অবশ্য এর বিরোধিতা করছে। তাদের আপত্তির কেন্দ্রে রয়েছে শিক্ষকদের গণতান্ত্রিক অধিকার এবং সরকারি কর্মীদের সমমর্যাদা ও সুযোগসুবিধা পাওয়ার দীর্ঘদিনের দাবি।

গত ২৮ অক্টোবর নবান্নে মন্ত্রিসভার বৈঠকের পরে মুখ্যমন্ত্রী জানান, স্কুল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে আগামী দিনে যাঁরা শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হবেন, তাঁরা পঞ্চায়েত, পুরসভা, বিধানসভা কিংবা লোকসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না। ইতিমধ্যে কর্মরত শিক্ষকদের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ প্রযোজ্য হবে না। সরকারের যুক্তি, তাঁদের নিয়োগের সময় এমন শর্ত ছিল না। মুখ্যমন্ত্রী বিহার ও উত্তরপ্রদেশের ব্যবস্থার উল্লেখ করে দাবি করেছেন, পূর্ববর্তী সরকারের আমলে শিক্ষার যে অবনতি হয়েছে, তা দূর করতেই এই উদ্যোগ। অর্থাৎ, বর্তমানে শিক্ষকতার পাশাপাশি যাঁরা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করছেন, তাঁদের সেই ভূমিকা ছাড়তে হবে না; নতুন নিয়োগেই এই শর্ত যুক্ত করা হচ্ছে।

এই সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক তাৎপর্যও রয়েছে। বাংলায় স্কুলশিক্ষকদের নির্বাচনী রাজনীতিতে অংশগ্রহণের দীর্ঘ ইতিহাস আছে। বিশেষত সত্তরের দশকের শেষ থেকে বামেরা পঞ্চায়েত নির্বাচনে বহু শিক্ষককে প্রার্থী করেছে। স্থানীয় স্তরে তাঁদের পরিচিতি ও তুলনামূলক পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি প্রার্থী বাছাইয়ে গুরুত্ব পেত। ফলে নতুন নিষেধাজ্ঞা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক দলগুলির প্রার্থী নির্বাচনের পরিসরেও প্রভাব ফেলতে পারে।

বিতর্কে উঠে এসেছে শাসক দলের নিজস্ব অবস্থানও। শুভেন্দুর মন্ত্রিসভায় শিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মণ এবং পর্যটনমন্ত্রী শঙ্কর ঘোষের মতো শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিত্ব রয়েছেন। দীপক স্বীকার করেছেন, আগের সরকারের দেওয়া ছাড়ের সুযোগেই তাঁর মতো অনেকে শিক্ষকতা থেকে রাজনীতিতে এসেছেন। তবে নতুন সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছেন তিনি। শিক্ষকদের রাজনৈতিক ভূমিকা থেকে বিজেপিও উপকৃত হয়েছে—এই প্রসঙ্গ তুলে সমালোচকেরা সরকারের অবস্থানের সঙ্গতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।

শিক্ষকদের চাকরির মর্যাদার প্রশ্নটি ব্যাখ্যা করেছেন অ্যাডভান্সড সোসাইটি অব হেডমাস্টার্সের ব্যারাকপুর এডুকেশন সার্কলের সাধারণ সম্পাদক সৌমেন পাল। তাঁর বক্তব্য, সরকারি কর্মীদের সমমর্যাদা এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক সুযোগসুবিধা দেওয়ার দাবি দীর্ঘদিনের। সরকার সেই দাবির নিষ্পত্তি না করে রাজনৈতিক অধিকার সংকুচিত করতে চাইছে। তাঁর অভিযোগ, সরকারি কর্মীদের মতো সুবিধা দেওয়া হচ্ছে না, অথচ তাঁদের জন্য নির্ধারিত বিধিনিষেধ শিক্ষকদের উপরে চাপানোর চেষ্টা চলছে।

প্রতিবেদনে এবিটিএ-র সাধারণ সম্পাদক সুজিত দাস প্রশ্ন তুলেছেন, সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলের শিক্ষকরা সরকারি কর্মচারী না হলে তাঁদের উপরে একই নিষেধাজ্ঞা চাপানো হবে কীভাবে? শিক্ষানুরাগী ঐক্য মঞ্চের কিঙ্কর অধিকারীর আশঙ্কা, এর ফলে প্রতিবাদের অধিকারও ক্ষুণ্ণ হতে পারে। কোনও দলের সদস্য না হয়েও শিক্ষানীতি, পেশাগত সমস্যা কিংবা ন্যায্য দাবি নিয়ে কথা বললে সেটিও রাজনৈতিক কাজ বলে গণ্য হবে কি না, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা চেয়েছেন তিনি।

বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতির স্বপন মণ্ডলের বক্তব্য, অন্য রাজ্যের নিয়ম উদ্ধৃত করার আগে সেখানে শিক্ষকদের চাকরির মর্যাদা এক কি না, দেখতে হবে। হিন্দু স্কুল বা হেয়ার স্কুলের মতো সরাসরি সরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের নির্বাচনে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে ইতিমধ্যেই বিধিনিষেধ আছে বলেও জানিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে, আরএসএস-ঘনিষ্ঠ অখিল ভারতীয় রাষ্ট্রীয় শৈক্ষিক মহাসংঘ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। সংগঠনের বাপি প্রামাণিকের মতে, এটি দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা।

কংগ্রেস নেতা প্রদীপ ভট্টাচার্য এই সিদ্ধান্তকে শিক্ষকদের গণতান্ত্রিক অধিকারে আঘাত বলে অভিহিত করেছেন এবং আদালতে চ্যালেঞ্জের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন। সিপিএমের সুজন চক্রবর্তীর বক্তব্য, সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত শিক্ষক নিয়োগ ও স্কুলের পরিকাঠামো উন্নয়ন। শিক্ষকদের এসআইআর ও জনগণনার কাজে লাগানোর প্রসঙ্গও তুলেছেন তিনি। বিতর্কের মূলে তাই শিক্ষা প্রশাসনের প্রয়োজন এবং শিক্ষকের নাগরিক অধিকার—এই দুয়ের সীমারেখা কোথায় টানা হবে, সেই প্রশ্ন।