কলকাতার সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে অচলাবস্থা কাটার লক্ষণ নেই। আন্দোলনের ৩৪তম দিনে কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের হস্তক্ষেপ চাইলেন পড়ুয়ারা। একই সঙ্গে ক্যাম্পাস থেকে পুলিশ সরানো, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রত্যাহার এবং ছাত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে। শনিবার, ৩১ অক্টোবর কলকাতা প্রেস ক্লাবে ছাত্রছাত্রী ও প্রাক্তনীদের যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। উপাচার্য সন্তোষ অজমেরার পদত্যাগের দাবিতেও অনড় ছাত্র সংসদ।

পড়ুয়াদের অভিযোগ, নিরাপত্তার দাবি জানিয়ে আন্দোলনে নামলেও এখন তাঁদেরই নজরদারির মধ্যে থাকতে হচ্ছে। প্রশাসনিক ভবনের প্রবেশপথে পুলিশের উপস্থিতি এবং হস্টেলের আশপাশে টহল নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন তাঁরা। কয়েকজন ছাত্রীর অভিযোগ, তাঁদের অনুমতি ছাড়াই ছবি ও ভিডিয়ো তোলা হচ্ছে। এক ছাত্রী সাংবাদিক সম্মেলনে জানান, সমাজমাধ্যমে ধর্ষণের হুমকি পাওয়ার বিষয়ে কলকাতা পুলিশের সাইবার শাখায় অভিযোগ জানানো হয়েছে। এসবের মধ্যে অবাধ চলাফেরা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা করছেন পড়ুয়ারা।

বিরোধের সূত্রপাত ২৭ সেপ্টেম্বর। সেদিন প্রতিষ্ঠানের ভিতরে আরএসএস-ঘনিষ্ঠ অখিল ভারতীয় গ্রাহক পঞ্চায়েতের অনুষ্ঠান ঘিরে ছাত্রদের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। পড়ুয়াদের অভিযোগ, বহিরাগতদের হামলায় তাঁদের কয়েকজন আহত হন। সংশ্লিষ্ট সংগঠনও পাল্টা অভিযোগ তোলে। ৪ অক্টোবর প্রতিষ্ঠানের মূল ফটকের কাছে বঙ্গীয় হিন্দু জাগরণ মঞ্চের কর্মসূচি ঘিরে ফের উত্তেজনা ছড়ায়। ছাত্রদের বক্তব্য, পরপর এই ঘটনাগুলির পরে নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর না মেলায় তাঁরা প্রতিবাদ চালিয়ে যাচ্ছেন।

২৮ সেপ্টেম্বর থেকে শিক্ষাক্রম বয়কটের পাশাপাশি ১২ অক্টোবর উপাচার্যের দপ্তরের সামনে অনির্দিষ্টকালের অবস্থান শুরু হয়। এর মধ্যে উপাচার্যকে হেনস্থা, দপ্তরে ভাঙচুর এবং অন্যান্য অসদাচরণের অভিযোগে ছয় পড়ুয়াকে বহিষ্কার করেন কর্তৃপক্ষ। ছাত্র সংসদ অভিযোগগুলি অস্বীকার করেছে। নিয়মিত পঠনপাঠন ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত বন্ধ রেখে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হস্টেল ছাড়ার নির্দেশও দেওয়া হয়। পড়ুয়াদের বক্তব্য, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ছাত্রছাত্রীদের পক্ষে এত অল্প সময়ে বিকল্প বাসস্থানের ব্যবস্থা করা অসম্ভব।

পুলিশ মোতায়েন ঘিরে নতুন বিতর্ক শুরু হয় ২৭ অক্টোবরের মশাল মিছিলের পরে। ছাত্রদের দাবি, তাঁদের কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ ছিল এবং সন্ধ্যার মধ্যেই শেষ হয়েছিল। তারপর গভীর রাতে পুলিশ আনার প্রয়োজন কী ছিল, সেই প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা। কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অবশ্য ভিন্ন। তাঁদের দাবি, অনুমতি ছাড়া আবাসিক এলাকা-সহ ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় মিছিল এবং ভীতিপ্রদ স্লোগানের ফলে বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। সকলের নিরাপত্তার জন্যই পুলিশের সাহায্য চাওয়া হয়েছিল।

প্রাক্তনীরা সমস্যা মেটাতে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রত্যাহার, পুলিশ সরানো এবং অর্থবহ আলোচনা শুরুর দাবি জানিয়েছেন। ২৭ সেপ্টেম্বর ও ৪ অক্টোবরের ঘটনার স্বাধীন তদন্তও চেয়েছেন তাঁরা। ছাত্র সংসদের দাবি, তদন্তে ক্যাম্পাসে বহিরাগত সংগঠনের অনুষ্ঠান করার অনুমতি এবং প্রশাসনের ভূমিকা খতিয়ে দেখতে হবে। ভবিষ্যতে প্রতিষ্ঠানের জায়গা ব্যবহারের নিয়ম সংশোধন করে চলচ্চিত্র-সংশ্লিষ্ট সংগঠনকে অনুমতি দেওয়া এবং তার আগে সংশ্লিষ্ট সকলের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাবও রয়েছে তাঁদের দাবিপত্রে।

অন্যদিকে, রেজিস্ট্রার দীপক কুমার ছাত্রদের নিরাপত্তার বিষয়ে প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর বক্তব্য, পুলিশি সমন্বয়, আহতদের চিকিৎসা, সাইবার নিরাপত্তা সংক্রান্ত অভিযোগ শোনা এবং মানসিক সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, সাধারণ প্রতিবাদে অংশ নেওয়ার জন্য শাস্তি দেওয়া হয়নি; নির্দিষ্ট হুমকি, ভয় দেখানো এবং হামলার অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ছাত্রদের প্রকৃত সমস্যার সমাধানে আলোচনা চলবে, তবে প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা বজায় রাখাও জরুরি।

এই টানাপড়েনে পড়াশোনা, শুটিং ও কর্মশালায় ফেরার অপেক্ষা দীর্ঘ হচ্ছে। ছাত্রদের বক্তব্য, তাঁরা নিজেদের চলচ্চিত্রের কাজ আবার শুরু করতে চান, কিন্তু তার জন্য নিরাপদ পরিবেশ এবং অভিযোগের জবাব প্রয়োজন। কর্তৃপক্ষ আলোচনার মাধ্যমে স্বাভাবিক পঠনপাঠন ফেরানোর আশা প্রকাশ করেছে। আপাতত নিরাপত্তা, শাস্তি ও পুলিশি উপস্থিতি নিয়ে দু’পক্ষের বিরোধ বহাল।