পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর সংক্রান্ত আপিলের নিষ্পত্তিতে এবার বাধা নির্বাচন কমিশনের পোর্টালে বিচারকদের আধার যাচাইয়ের শর্ত। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে গঠিত আপিল ট্রাইবুনালের বিচারকেরা এই শর্ত প্রত্যাহার এবং পোর্টালের ত্রুটি সংশোধনের দাবি জানিয়েছেন। চার সপ্তাহে অন্তত দু’বার বিষয়টি কমিশনের নজরে এনেছেন তাঁরা।

২১ সেপ্টেম্বর পোর্টালে আধার যাচাইয়ের ব্যবস্থা চালুর পরে ২৪ সেপ্টেম্বর তা সরানোর লিখিত অনুরোধ জানানো হয়। ১৩ অক্টোবর ফের সমস্যার সমাধান চেয়েছেন ট্রাইবুনালগুলির দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, কাগজে আদেশ দেওয়া হলেও সেগুলি পোর্টালে আপলোড করা যাচ্ছে না। ফলে বিচারিক সিদ্ধান্ত এবং তার ডিজিটাল নথিভুক্তির মধ্যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।

এখানে আধার নিয়ে আপত্তির বিষয়টি স্পষ্ট করা জরুরি। আদেশ আপলোড করতে বিচারকদের নিজেদের ব্যক্তিগত আধার সংক্রান্ত তথ্য ব্যবহারের শর্ত নিয়েই বিরোধ। ২৫ সেপ্টেম্বর বৈঠকে উপস্থিত ১৩ জন বিচারক একমত হন যে, আপিলের সিদ্ধান্ত আপলোডের জন্য তাঁরা ব্যক্তিগত আধার নম্বর বা অন্য ব্যক্তিগত বিবরণ দেবেন না। তাঁদের বক্তব্য, কমিশনের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত দিয়ে ট্রাইবুনালের বিচারিক কাজ নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।

নথি গ্রহণের ক্ষেত্রেও আপত্তি রয়েছে। নতুন পোর্টালে কমিশনের নির্দিষ্ট ১৩ ধরনের নথির মধ্যেই বিচারকদের নির্বাচন সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। অথচ বিচারকদের বক্তব্য অনুযায়ী, সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে ওই তালিকা নির্দেশক, চূড়ান্ত নয়। প্রাসঙ্গিক ও গ্রহণযোগ্য অন্য নথিও তাঁরা বিবেচনা করতে পারেন। উদাহরণ হিসেবে রাজ্যের স্কুলশিক্ষা দফতরের যাচাই করা চতুর্থ বা পঞ্চম শ্রেণি পাশের শংসাপত্রের কথা এসেছে। বিচারকদের দাবি, সফটওয়্যারের নির্ধারিত ঘর তাঁদের বিচারবিবেচনার সীমা ঠিক করতে পারে না। আপলোডের পরে করণিক ভুল সংশোধনের ব্যবস্থাও চেয়েছেন তাঁরা। পুরনো ব্যবস্থায় ওয়ার্ড ফাইলে আদেশ আপলোড করে আবেদন গৃহীত বা প্রত্যাখ্যাত জানানো যেত। নতুন ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট তালিকা থেকে সর্বাধিক পাঁচটি নথি বেছে দেখাতে হয়। এই পরিবর্তনেই নথি গ্রহণের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

পোর্টালের সমস্যা অবশ্য সেপ্টেম্বরেই প্রথম দেখা দেয়নি। ১১ আগস্টের বৈঠকেই বিচারকেরা জানান, পক্ষগুলিকে নোটিস পাঠানো, অতিরিক্ত নথি সংগ্রহ, ভার্চুয়াল শুনানি এবং প্রয়োজন হলে বাদ যাওয়া ভোটারের নাম পুনর্বহালের উপযুক্ত ব্যবস্থা নেই। আবেদনকারীরা ট্রাইবুনালের আদেশ ডাউনলোড করতেও পারছিলেন না। এই অভিযোগ নির্বাচন কমিশন ও কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে জানানো হয়েছিল। ফলে পোর্টালের সীমাবদ্ধতা বিচারপ্রক্রিয়ার একাধিক ধাপে প্রভাব ফেলছে।

সরাসরি জমা দেওয়া আপিল নিয়েও সমস্যা ওঠে। জেলাশাসক বা সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী আধিকারিকের কাছে কাগজে আবেদন জমা পড়লেও তা ডিজিটাল নথিতে তুলে ট্রাইবুনালের সামনে আনার কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বিচারকেরা। অতিরিক্ত নথি চেয়ে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে ইমেল পাঠিয়েও যথেষ্ট সাড়া মিলছিল না বলে তাঁদের অভিযোগ। অর্থাৎ আবেদন জমা, সংশ্লিষ্ট পক্ষকে খবর দেওয়া, প্রমাণ সংগ্রহ এবং সিদ্ধান্ত জানানো—প্রতিটি ধাপেই কার্যকর পরিকাঠামোর প্রয়োজন। শুধু আবেদন গ্রহণের সুযোগ থাকলে আপিলের প্রতিকার সম্পূর্ণ হয় না। মে মাসেও এক বিচারক নোটিস পাঠানোর ব্যবস্থার অভাবে নিষ্পত্তি বিলম্বিত হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। এর আগেই সুপ্রিম কোর্ট কমিশনকে প্রয়োজনীয় পরিকাঠামোগত সহায়তা দেওয়ার কথা বলেছিল। তাই বিচারকদের অভিযোগগুলি দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক ঘাটতির দিকেও নজর টেনেছে।

এই অচলাবস্থার পটভূমিতে রয়েছে বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ যাওয়ার ঘটনা। কমিশনের সফটওয়্যারে অসংগতি চিহ্নিত হওয়া ৬০.০৬ লক্ষ ভোটারের যোগ্যতা পরীক্ষা করেছিলেন বিচারবিভাগীয় আধিকারিকেরা। সেই পর্যায়ে ২৭.১৬ লক্ষ নাম বাদ পড়ে। তাঁদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল শুনতে অবসরপ্রাপ্ত হাই কোর্টের বিচারপতিদের নিয়ে ১৯টি ট্রাইবুনাল তৈরি হয়। সেপ্টেম্বর মাসে কমিশন সুপ্রিম কোর্টকে জানায়, মোট ৩৮.৩১ লক্ষ আপিলের মধ্যে ২২.২১ লক্ষ ছিল বাদ যাওয়া ভোটারদের নাম ফেরানোর আবেদন; বাকি ১৬.১০ লক্ষ ছিল তালিকায় থাকা নামের বিরুদ্ধে আপিল।

সেপ্টেম্বরের হলফনামা অনুযায়ী, তখন ৩৮.৩১ লক্ষ আপিলের মধ্যে মাত্র প্রায় ১.২৬ লক্ষের নিষ্পত্তি হয়েছিল। অর্থাৎ প্রায় ৯৭ শতাংশ আবেদন অনিষ্পন্ন ছিল। এই পরিসংখ্যানকে সমস্ত আবেদনকারীর নাম বাদ যাওয়ার হিসাব হিসেবে দেখা ঠিক হবে না, কারণ অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে আবেদনও মোট সংখ্যার মধ্যে রয়েছে। তবে নিষ্পত্তির গতির সঙ্গে জমে থাকা কাজের ব্যবধান কতটা বড়, তা এই হিসাবেই স্পষ্ট।

বিচারকদের কর্মপরিবেশও দুরবস্থার মধ্যে। ১ অক্টোবর দশজন বিচারক জানান, জোকায় ছোট ঘরে সাত-আটজন কর্মীর সঙ্গে কাজ করতে হচ্ছে; পৃথক চেম্বার ও শৌচাগারের সুবিধা নেই। তাঁরা কেন্দ্রীয় কলকাতায় দফতর সরানো এবং সাপ্তাহিক সাম্মানিক ২৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা করার দাবি তোলেন। ২১ অক্টোবর পাঠানো প্রশ্নের উত্তর কমিশন দেয়নি।

কমিশন এর আগে ট্রাইবুনালের সংখ্যা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে এবং জানিয়েছে, তাদের সফটওয়্যারের সাহায্যে বর্তমান দফতরের বাইরে থেকেও শুনানি সম্ভব। কিন্তু বিচারকদের উত্থাপিত সমস্যাগুলি দেখায়, শুধু সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনার পাশাপাশি প্রতিদিনের কাজের ব্যবস্থাও সচল করা প্রয়োজন। বিশেষত আদেশ প্রকাশের পথ আটকে থাকলে শুনানি এগোলেও আবেদনকারী তার ফল সহজে জানতে পারবেন না।

এই বিরোধের মূল তাৎপর্য নাগরিকের প্রতিকার পাওয়ার সুযোগে। নাম বাদ যাওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার অধিকার তখনই কার্যকর, যখন আবেদন পৌঁছবে, শুনানি হবে, সিদ্ধান্ত পাওয়া যাবে এবং প্রয়োজনীয় সংশোধন বাস্তবায়িত হবে। বিচারকদের অভিযোগের ভিত্তিতে যে প্রশ্নটি সামনে আসে, তা সরাসরি: বিচারিক সিদ্ধান্ত প্রকাশের ব্যবস্থা কেন ব্যক্তিগত আধার যাচাইয়ের শর্তে আটকে থাকবে? কমিশনের দায়িত্ব এমন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, যেখানে প্রযুক্তি আপিল নিষ্পত্তিতে সহায়তা করবে এবং আবেদনকারী সিদ্ধান্ত জানার জন্য অনির্দিষ্ট অপেক্ষায় থাকবেন না। সেই অপেক্ষার অবসান জরুরি।