দলীয় নেতা মণীশ শুক্ল হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের সঙ্গে মঞ্চ ভাগ করে নেওয়ার অভিযোগে রাজ্যের পরিবহণমন্ত্রী অর্জুন সিংহের বিরুদ্ধে সরব হলেন বিজেপিরই বিধায়ক কৌস্তভ বাগচী। সোমবার, ২৬ অক্টোবর ব্যারাকপুরের বিধায়ক অভিযোগ করেন, দলের প্রবীণ নেতাদের এমন আচরণে কর্মীরা বিব্রত হচ্ছেন এবং সাধারণ মানুষের প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে তাঁকে। অর্জুনের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত বিরোধ নেই জানালেও রাজনৈতিক আপত্তি থেকে সরেননি কৌস্তভ। পাল্টা অর্জুনও বিধায়কের সমালোচনাকে গুরুত্ব দিতে অস্বীকার করেছেন।

বিতর্কের কেন্দ্রে ব্যারাকপুর পুরসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যান উত্তম দাস এবং টিটাগড় পুরসভার প্রাক্তন চেয়ারম্যান প্রশান্ত চৌধুরী। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রবিবার ব্যারাকপুরের একটি বিজয়া সম্মিলনীতে অর্জুনের সঙ্গে তাঁদের একই মঞ্চে দেখা যায়। সেই ছবি ছড়িয়ে পড়তেই স্থানীয় বিজেপির একাংশে ক্ষোভ তৈরি হয়। একটি স্থানীয় ফুটবল অনুষ্ঠানে অর্জুন ও উত্তমকে এক মঞ্চে দেখে কৌস্তভ মঞ্চ ছেড়ে চলে যান বলেও খবর। ফলে আপত্তি শুধু বিবৃতিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি, প্রকাশ্য অনুষ্ঠানেও তার ছাপ পড়েছে।

২০২০ সালের ৪ অক্টোবর টিটাগড়ে বিজেপি কার্যালয়ের বাইরে গুলি করে খুন করা হয় মণীশ শুক্লকে। তিনি বিজেপির যুবনেতা এবং পুরসভার কাউন্সিলর ছিলেন। তদন্তে সিআইডি ভাড়াটে খুনি ও শার্পশুটার-সহ একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছিল। কৌস্তভের বক্তব্য, নিহত নেতার বাবা উত্তম ও প্রশান্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়েছিলেন। এই অভিযোগের সূত্রেই তাঁদের বিজেপি নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন তিনি। তবে অভিযোগ ওঠা এবং আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া পৃথক বিষয়।

কৌস্তভের দাবি, তৎকালীন শাসকদলের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে ওই দু’জনের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা হয়নি। রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পরে তাঁরা এখন রাজনৈতিক আশ্রয় বদলানোর চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর আপত্তি, মণীশের হত্যায় যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের দলীয় পরিসরে জায়গা দেওয়া হলে কর্মীদের কাছে ভুল বার্তা যাবে। উত্তম ও প্রশান্তকে বিজেপিতে নেওয়ার যে কোনও উদ্যোগের বিরোধিতা করবেন বলেও স্পষ্ট জানিয়েছেন ব্যারাকপুরের বিধায়ক।

পেশায় আইনজীবী কৌস্তভ জানিয়েছেন, মামলায় অগ্রগতি নিশ্চিত করতে তিনি নতুন আইনি পদক্ষেপের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বিষয়টি জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, মুখ্যসচিব, সিআইডির ডিজি এবং ব্যারাকপুরের পুলিশ কমিশনারকে চিঠি দেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি। তাঁর আরও অভিযোগ, অভিযুক্তেরা বর্তমানে বিজেপি নেতাদের একাংশের আশ্রয় পাচ্ছেন। অর্থাৎ, তাঁর অভিযোগের লক্ষ্য শুধু তৃণমূলের প্রাক্তন নেতারা নন; নিজের দলের ভিতরে তাঁদের সহায়তা করছেন বলে যাঁদের সন্দেহ করছেন, তাঁদের ভূমিকাও তিনি সামনে এনেছেন।

দলবদলের সম্ভাবনা ঠেকাতে নিজের অবস্থানের কঠোরতা বোঝাতে গিয়ে কৌস্তভ রাজ্য বিজেপি দফতরের সামনে আত্মাহুতির হুমকিও দেন। পাশাপাশি স্মরণ করিয়ে দেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার ক্ষমতাচ্যুত না হওয়া পর্যন্ত চুল না রাখার সংকল্পে তিনি সাড়ে তিন বছর মাথা মুণ্ডিত রেখেছিলেন। তাঁর বক্তব্য, রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে অনেকে বিদ্রুপ করলেও নিজের সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে যাননি। এই ঘটনাতেও আপস করবেন না বলে বোঝাতে চেয়েছেন তিনি।

অর্জুন অবশ্য সমালোচনা উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, কৌস্তভের মন্তব্যকে তিনি গুরুত্ব দিচ্ছেন না; দীর্ঘদিন রাজনীতি করার অভিজ্ঞতা থেকে কী ভাবে রাজনীতি করতে হয়, তা তিনি জানেন। অন্যদিকে কৌস্তভ অর্জুনকে দলের প্রবীণ নেতা ও অভিভাবক হিসেবে উল্লেখ করে আশা প্রকাশ করেছেন, ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না। কিন্তু মন্ত্রীর প্রতিক্রিয়ায় সেই আবেদন মেনে নেওয়ার কোনও ইঙ্গিত মেলেনি।

এই বিবাদে ব্যারাকপুর বিজেপির অভ্যন্তরীণ টানাপড়েন প্রকাশ্যে এসেছে। প্রশ্ন উঠেছে, দলীয় কর্মীর হত্যাকাণ্ডে যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়েছিল, তাঁদের সঙ্গে রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা কতটা গ্রহণযোগ্য। প্রকাশিত খবরগুলিতে উত্তম ও প্রশান্তের আনুষ্ঠানিক বিজেপি-যোগের নিশ্চয়তা নেই। আপাতত বিরোধের কেন্দ্র তাঁদের মঞ্চে উপস্থিতি এবং সম্ভাব্য অন্তর্ভুক্তি। কৌস্তভের প্রতিবাদ ও অর্জুনের পাল্টা অবস্থান সেই বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে।