পুজোর বইয়ের স্টলে হামলা চলছে। মাটিতে ছুড়ে ফেলা হচ্ছে বই। সেই আক্রমণের সামনে দাঁড়িয়ে এক বৃদ্ধ হামলাকারীদের বই পড়তে বলছেন। বয়স ৭৩। নাম বিপুল দাশগুপ্ত। নাগেরবাজারের এই সিপিএম কর্মী, পাড়ায় যিনি ‘বুজুদা’ নামে পরিচিত, বই বাঁচানোর সেই মুহূর্তে অনেকের নজর কেড়েছেন। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে তাঁর কথা।
বিপুলের বিশ্বাস, পৃথিবীকে জানতে হলে পড়তে হবে; সমাজকে বদলানোর শক্তি রয়েছে শিক্ষার মধ্যে। হামলাকারীদের সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য, লড়াই কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়, তাদের চালিত করা মতাদর্শের বিরুদ্ধে। বই পড়লে মানুষ নিজের বিচারবোধ তৈরি করতে পারে। তাই ভাঙচুর করতে আসা মানুষগুলিকেও তিনি পাঠক হয়ে উঠতে বলেছিলেন।
কমিউনিস্ট রাজনীতির সঙ্গে তাঁর পরিবারেরও সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। সেই পরিবেশেই শিক্ষার গুরুত্ব বুঝেছেন বিপুল। তাঁর ব্যাখ্যায়, বামেদের স্টলে শুধু মার্ক্সবাদী সাহিত্য থাকে না; বাংলা ধ্রুপদি সাহিত্যসহ নানা ধরনের বই রাখা হয়। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের এবং ভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্বাসের মানুষও সেখান থেকে বই কেনেন। বইয়ের প্রতি সম্মান দেখানোর আবেদন তাই সকলের কাছেই করেছেন তিনি।
বিপুল সিপিএমের সর্বক্ষণের কর্মী। সাড়ে পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে বইয়ের স্টলের সঙ্গে যুক্ত। নাগেরবাজারের ঘটনার ভিডিওতে দেখা যায়, এক তরুণ প্রবল উত্তেজনায় বই মাটিতে ছুড়ে ফেলছেন। ফতুয়া-পাজামা পরা প্রবীণ মানুষটি তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করছেন। অনুরোধ করছেন বইয়ের পাতা উল্টে দেখতে। হামলার মুখে নিজের জায়গা ছেড়ে সরে যাননি তিনি।
ওই হামলায় মাটিতে ছুড়ে ফেলা বইয়ের মধ্যে ছিল শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পথের দাবী’। ঘটনাটি দেখিয়ে দেয়, রাজনৈতিক বিদ্বেষ কীভাবে বাংলা সাহিত্যের পরিচিত সৃষ্টিকেও আক্রমণের নিশানা করে তুলতে পারে। বিপুলের অভিজ্ঞতায়, এত বছরের বইবিপণির কাজে এমন ঘটনা তিনি দেখেননি। তাঁর শান্তভাবে বোঝানোর চেষ্টা এবং হামলাকারীর আগ্রাসনের ব্যবধানই ভিডিওটিকে বিশেষ তাৎপর্য দিয়েছে।
এবারের পুজোয় বইয়ের স্টল ঘিরে বিরোধ শুধু নাগেরবাজারে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বর্ধমান শহরের জিটি রোডের একাধিক স্টলে মুখঢাকা লোকজন ভাঙচুর চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে সিপিএম। দলের দাবি, আগে থেকেই পুলিশকে ইমেল করে নিরাপত্তা চাওয়া হয়েছিল। তারপরও হামলা হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় পুজোমণ্ডপের পাশে স্টল বসানোর অনুমতি নিয়েও বিরোধ তৈরি হয়।
সিপিএম এই হামলাগুলির জন্য বিজেপি সমর্থকদের দায়ী করেছে। বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য অবশ্য দলের নির্দেশে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে পুলিশে অভিযোগ জানাতে বলেছেন। তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষও হামলার সমালোচনা করেন। সিপিএমের এক প্রবীণ নেতার বক্তব্য, আগের আমলেও আক্রমণ হয়েছে, কিন্তু এবারের ব্যাপ্তি আলাদা।
বইয়ের স্টলে হামলার প্রকাশ্য নিন্দা করেছেন রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্তও। তাঁর বক্তব্য, বামপন্থীদের সঙ্গে মতাদর্শগত বিরোধ থাকলেও তাঁদের বইয়ের স্টল ভাঙার অধিকার কারও নেই। একাধিক জায়গায় এমন ঘটনা ঘটায় বিষয়টিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না বলেও তিনি মন্তব্য করেন। ঘটনাগুলি দেখে লজ্জিত হওয়ার কথা জানান তিনি।
হামলার পরদিনই নাগেরবাজারের স্টল ফের চালু হয়। সিপিএমের রাজ্য কমিটির সদস্য ময়ূখ বিশ্বাসের দাবি, এক ঘণ্টার মধ্যে সমস্ত বই বিক্রি হয়ে যায়। তাঁর দেওয়া হিসাবে, এবার রাজ্যজুড়ে তাঁদের বই বিক্রি হয়েছে ১ কোটি ৪৭ লক্ষ টাকার; আগের বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
বইয়ের সঙ্গে দ্বিমত থাকলে তার বক্তব্য খণ্ডন করা যায়। বই ছুড়ে ফেলা যুক্তির পরাজয় এবং পাঠকের স্বাধীনতার ওপর আঘাত। কোন বই মানুষ পড়বেন, তা হামলাকারীরা ঠিক করে দিতে পারেন না। এই ঘটনায় বিপুলের ভূমিকার তাৎপর্য সেখানেই: ভয় দেখিয়ে পাঠ বন্ধ করার সামনে তিনি পড়ার প্রয়োজনটি তুলে ধরেছেন। তাঁর সংযমকে দুর্বলতা ভাবার কারণ নেই। উত্তেজিত আক্রমণের মুখে দাঁড়িয়ে নিজের বিশ্বাস প্রকাশ করতেও সাহস লাগে। এই সাহস বই বিক্রির অধিকার এবং স্বাধীনভাবে চিন্তা করার অধিকারকে একসূত্রে বেঁধেছে।