কলকাতার সরশুনায় এক তরুণ, তাঁর বাবা এবং এক বন্ধুকে মারধর করে নগ্ন অবস্থায় রাস্তায় হাঁটানোর অভিযোগে তিন জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ধৃতেরা এক তেরো বছরের নাবালিকার বাবা, মা এবং মামা। ওই নাবালিকার সঙ্গে আঠারো বছরের তরুণকে ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখার পর এই নির্যাতন চালানো হয় বলে অভিযোগ। রবিবার, ২৫ অক্টোবরের এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই এলাকায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সোমবার পুলিশ গ্রেফতারির কথা জানায়।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, রবিবার বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে নাবালিকার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন ওই তরুণ। কথাবার্তার সময়ে তিনি মেয়েটিকে চুমু খান বলে অভিযোগ। মেয়েটির মামার এক পরিচিত ব্যক্তি তা দেখে পরিবারের কাছে খবর পৌঁছে দেন। এরপর মেয়েটির বাবা ও মামা সেখানে হাজির হন। তরুণ এবং তাঁর বন্ধুকে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে যান তাঁরা। সেখানেই শুরু হয় মারধর। বন্ধুটির বয়স উনিশ বছর বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
অভিযোগ, দুই যুবককে বাড়ির মধ্যে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। তারপর আঠারো বছরের তরুণকে দিয়ে তাঁর বাবাকে ডেকে পাঠানো হয়। ছেলের ডাকে ঘটনাস্থলে পৌঁছনোর পর বাবাও হামলার শিকার হন। তাঁকেও মারধর করা হয়। এরপর তিন জনকে পোশাক খুলতে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ। নগ্ন হয়ে রাস্তায় হাঁটতে রাজি না হলে তাঁদের গুলি করে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে পুলিশকে জানিয়েছেন আক্রান্তেরা।
ঘটনাটির বিষয়ে কলকাতা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার, অপরাধ, কুণাল আগরওয়াল জানিয়েছেন, বাড়ির সামনের গলিতে প্রায় পঞ্চাশ মিটার নগ্ন করে হাঁটানো হয় তিন জনকে। পুলিশের বিবরণ অনুযায়ী, নির্যাতনের সময়ে মেয়েটির মামা আরও কয়েক জন পরিচিতকে বাড়িতে ডেকেছিলেন। ফলে ঘটনায় ধৃত তিন জন ছাড়াও অন্যদের ভূমিকা রয়েছে বলে তদন্তকারীরা মনে করছেন। তাঁদের খোঁজে অভিযান চলছে। প্রকাশিত বিবরণে নির্যাতনের ঘটনাস্থল হিসেবে সরশুনা থানা এলাকার কথা বলা হয়েছে।
তরুণের বাবার বক্তব্যে আরও ভয়াবহ অভিযোগ উঠে এসেছে। তাঁর দাবি, তাঁকে নিজের ছেলেকে মেরে ফেলতে বলা হয়েছিল। বন্দুক অথবা ছুরি ব্যবহার করার চাপ দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি। সেই হুমকির মুখেই নগ্ন হয়ে হাঁটতে বাধ্য হন তাঁরা। কয়েক জন স্থানীয় বাসিন্দার অভিযোগ, বাধা দিতে গেলে তাঁদেরও গুলি করার ভয় দেখানো হয়। এই বক্তব্যগুলি আক্রান্ত ও প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ; তদন্তে সেগুলি যাচাই হওয়া প্রয়োজন।
তরুণের বাবার লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে সরশুনা থানায় মামলা রুজু হয়েছে। পুলিশের বক্তব্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতীয় ন্যায় সংহিতার অধীনে খুনের চেষ্টা, বিপজ্জনক অস্ত্র বা উপায়ে আঘাত, গুরুতর আঘাত, বেআইনি আটকে রাখা, অপহরণ, ভয় দেখানো এবং মানহানির অভিযোগ আনা হয়েছে। অস্ত্র আইনেও মামলা হয়েছে। নাবালিকার বাবা ও মামার পাশাপাশি মায়ের বিরুদ্ধেও অভিযোগ থাকায় তাঁকেও গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকি অভিযুক্তদের চিহ্নিত করার কাজ চলছে।
তবে বন্দুক দেখিয়ে হুমকির অভিযোগ এবং অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়টি আলাদা করে জানিয়েছে পুলিশ। সোমবার পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, কোনও আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হয়নি। ফলে কী অস্ত্র ব্যবহার হয়েছিল এবং সেটি কোথায় রয়েছে, তা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। দুই তরুণের ডাক্তারি পরীক্ষা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হচ্ছে। কয়েক জন স্থানীয় সাক্ষীকেও চিহ্নিত করা হয়েছে; তদন্তে তাঁদের বক্তব্য নেওয়া হবে।
ঘটনার একটি ভিডিও সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তার পরেই নির্যাতনের অভিযোগ ঘিরে জনরোষ আরও বাড়ে। অভিযুক্ত পরিবারের বাড়ির সামনে বিক্ষুব্ধ মানুষ জমায়েত হন। বাড়িতে ভাঙচুরের চেষ্টার খবরও পাওয়া গিয়েছে। পরিস্থিতি সামলাতে সরশুনা থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, আক্রান্ত তিন জনকে প্রকাশ্যে অপমান করার অভিযোগের পাশাপাশি পরবর্তী অশান্তির ঘটনাও পুলিশের নজরে রয়েছে। এলাকায় পুলিশের উপস্থিতি বাড়ানো হয়।
পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ। তাঁদের অভিযোগ, অভিযুক্তদের ধরতে প্রথমে যথেষ্ট তৎপরতা দেখানো হয়নি। পুলিশ অবশ্য গড়িমসির অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের বক্তব্য, মূল অভিযুক্ত তিন জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং অন্যদের ধরতে তল্লাশি চলছে। কে কখন খবর পেয়েছিল, পুলিশ কখন পৌঁছেছিল এবং আক্রান্তদের উদ্ধারে কী পদক্ষেপ হয়েছিল, ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তে সেই সময়ক্রমও স্পষ্ট হওয়া দরকার।
প্রকাশ্যে এমন নির্যাতনের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছেন সমাজকর্মী ও সমাজবিশ্লেষকেরাও। তাঁদের বক্তব্যে উঠে এসেছে শহরের মধ্যে দলবদ্ধভাবে শাস্তি দেওয়ার প্রবণতা এবং প্রতিবাদ করার পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন। একটি পরিবারের সদস্যেরা কীভাবে অন্য তিন জনকে আটকে রেখে এমন অপমানের মুখে ঠেলে দিতে পারলেন, তা নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে। নির্যাতনের অভিযোগের পাশাপাশি অস্ত্র দেখিয়ে প্রতিবেশীদের ভয় দেখানোর বক্তব্য ঘটনাটির গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে।
নাবালিকার নিরাপত্তা বা তার সঙ্গে কারও আচরণ নিয়ে পরিবারের উদ্বেগ থাকলে অভিযোগ জানানোর পথ রয়েছে। কিন্তু কাউকে আটকে রেখে মারধর, প্রাণনাশের হুমকি এবং প্রকাশ্যে নগ্ন করে হাঁটানো কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। বাবা ও বন্ধুকেও একই নির্যাতনের শিকার করার অভিযোগ ঘটনাটির নিষ্ঠুরতা আরও স্পষ্ট করেছে। এটি ব্যক্তিগত বিরোধের সীমা ছাড়িয়ে মানুষের মর্যাদা ও জননিরাপত্তার ওপর আঘাতের প্রশ্ন তুলেছে।
এখন তদন্তের সামনে রয়েছে নির্যাতনে যুক্ত প্রত্যেককে চিহ্নিত করা, অস্ত্রের অভিযোগ যাচাই করা এবং সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহের কাজ। একই সঙ্গে আক্রান্তদের নিরাপত্তা এবং নাবালিকার পরিচয় ও মর্যাদা রক্ষা জরুরি। তিন জনের গ্রেফতারির পরও ঘটনার সমস্ত অভিযোগের নিষ্পত্তি হয়নি। কার কী ভূমিকা ছিল, তা প্রমাণের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হবে। তবে প্রকাশ্যে মানুষকে নগ্ন করে অপমান করার এই বর্ণনা কলকাতার নাগরিক নিরাপত্তার সামনে গভীর প্রশ্ন রেখে গেল। দোষীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি এমন প্রকাশ্য নির্যাতন ঠেকাতে প্রশাসনের প্রস্তুতি ও দ্রুত হস্তক্ষেপের সক্ষমতাও এই ঘটনায় পরীক্ষার মুখে পড়েছে।