পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক হিংসায় নিহতদের পরিবারের একজন যোগ্য সদস্যকে সরকারি চাকরি দেওয়ার প্রকল্প চালু করল শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার। ২০০১ সালের ১ জানুয়ারি থেকে রাজ্যে রাজনৈতিক হিংসায় যাঁরা প্রাণ হারিয়েছেন, তাঁদের নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যরা এই সুবিধার জন্য আবেদন করতে পারবেন। নিয়োগ হবে গ্রুপ ডি পদে। ক্ষমতায় আসার প্রায় ছয় মাসের মধ্যে এই সিদ্ধান্ত নিল সরকার। সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজনৈতিক হিংসায় নিহতদের পরিবারকে চাকরি দেওয়ার এমন প্রকল্প এই প্রথম।

সরকারের ঘোষিত উদ্দেশ্য, পরিবারের উপার্জনকারীকে হারিয়ে আর্থিক সংকটে পড়া মানুষদের পুনর্বাসন। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, রাজ্যে বহু রাজনৈতিক সংঘর্ষে এমন ব্যক্তিরা নিহত হয়েছেন, যাঁদের আয়ের উপর গোটা পরিবার নির্ভরশীল ছিল। তাঁদের মৃত্যুর পরে সংসারের অর্থনৈতিক ভিত্তি ভেঙে পড়েছে। সেই পরিস্থিতিতে পরিবারের একজনের সরকারি চাকরি জীবিকার স্থায়ী অবলম্বন তৈরি করতে পারে। সরকারি গেজেটে প্রকাশের দিন থেকে প্রকল্প কার্যকর হওয়ার কথা।

৩০ অক্টোবর স্বরাষ্ট্র ও পার্বত্য বিষয়ক দপ্তরের জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে সই করেছেন মুখ্যসচিব মনোজ আগরওয়াল। প্রকল্পের জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় অতিরিক্ত গ্রুপ ডি পদ তৈরি করা হবে। নিহত ব্যক্তির স্বামী বা স্ত্রী, ছেলে, মেয়ে কিংবা তৃতীয় লিঙ্গের সন্তান আবেদন করতে পারবেন। অবিবাহিত ব্যক্তির মৃত্যুর ক্ষেত্রে নির্ভরশীল ভাইবোনের আবেদনও নির্দিষ্ট শর্তে বিবেচিত হবে। তবে প্রত্যেক পরিবার থেকে চাকরির জন্য বিবেচিত হবেন মাত্র একজন।

যোগ্যতার ক্ষেত্রে কয়েকটি আর্থিক ও ব্যক্তিগত শর্ত রয়েছে। আবেদনের সময়ে পরিবারের মাসিক আয় ৫০ হাজার টাকার বেশি হওয়া চলবে না। পরিবারের কোনও সদস্য নিয়মিত সরকারি চাকরিতে থাকলে অথবা আয়করদাতা হলে এই সুবিধা মিলবে না। আবেদনকারীকে ভারতীয় নাগরিক এবং পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা হতে হবে। সাধারণভাবে অষ্টম শ্রেণি উত্তীর্ণ হওয়া প্রয়োজন। ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি তাঁর বয়স অন্তত ১৮ বছর হতে হবে। সাধারণ শ্রেণির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়স ৪৫ এবং তফসিলি জাতি ও জনজাতির ক্ষেত্রে ৫০ বছর।

যে জেলায় মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, সেই জেলার জেলাশাসকের কাছে আবেদন জমা দিতে হবে। সঙ্গে প্রয়োজন মৃত্যুর শংসাপত্র, নিহতের সঙ্গে সম্পর্কের প্রমাণ, এফআইআর, চার্জশিট এবং আদালতে অভিযোগ গঠনের নথি। মৃত্যুটি রাজনৈতিক হিংসার কারণে ঘটেছিল কি না, তা যাচাই করবে জেলাশাসকের নেতৃত্বাধীন জেলা পর্যায়ের কমিটি। অর্থাৎ, রাজনৈতিক হত্যার দাবি প্রশাসনিক যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হবে।

আবেদন পাওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে জেলা কমিটিকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। সেই সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট হলে আবেদনকারী ৩০ দিনের মধ্যে রাজ্য পর্যায়ের কমিটির কাছে আপিল করতে পারবেন। স্বরাষ্ট্র দপ্তরের অতিরিক্ত মুখ্যসচিব অথবা প্রধান সচিবের নেতৃত্বাধীন ওই কমিটি আপিল বিবেচনা করবে। সম্ভব হলে ছয় মাসের মধ্যে আপিল নিষ্পত্তির কথা বলা হয়েছে।

তবে আবেদন করার যোগ্যতা থাকলেই চাকরি নিশ্চিত নয়। নিয়োগ নির্ভর করবে কমিটির সুপারিশ, পদ থাকা, পুলিশি যাচাই এবং স্বাস্থ্যপরীক্ষার উপর। একই ঘটনায় পরিবারের কেউ ইতিমধ্যে সরকারি চাকরি পেয়ে থাকলে নতুন করে সুবিধা মিলবে না।

এই সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক তাৎপর্যও রয়েছে। ২০০১ সাল থেকে সময়সীমা ধরায় বামফ্রন্টের শেষ এগারো বছরের শাসনকালও প্রকল্পের আওতায় আসছে। সেই সময়ে রাজনৈতিক হিংসায় নিহতদের মধ্যে তৃণমূল ও কংগ্রেসের কর্মীরাও ছিলেন। অন্যদিকে, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকে বিজেপি নিহত দলীয় কর্মীদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছে। নতুন প্রকল্পে সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পাশাপাশি আগের শাসনপর্বগুলির ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকেও অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে প্রকল্পের বাস্তব গুরুত্ব নির্ভর করবে আবেদন যাচাইয়ে সমান মানদণ্ড, স্বচ্ছতা এবং সময়মতো নিয়োগের উপর। প্রশাসনিক বাস্তবায়নেই বোঝা যাবে, ঘোষিত পুনর্বাসনের সুযোগ কতগুলি পরিবারের কাছে পৌঁছল।