কলকাতার সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে আন্দোলনের ৩৫তম দিনে সামনে এল পড়ুয়াদের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ। আন্দোলনকারী কয়েকজন ছাত্রী সমাজমাধ্যমে ধর্ষণের হুমকি পাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন। অভিযোগ উঠেছে, ক্যাম্পাসের বাইরে ছাত্রীদের অনুসরণ করা হচ্ছে, এক ছাত্রকে চলন্ত বাসে মারধর করা হয়েছে। রবিবার, ১ নভেম্বর প্রকাশিত সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদনে এই অভিযোগগুলি উঠে এসেছে।

এক ছাত্রী জানিয়েছেন, মধ্য কলকাতার একটি কফিশপে কয়েকজন ব্যক্তি সমাজমাধ্যমের ছবি দেখে তাঁকে চিনে ফেলেন এবং তাঁকে নিয়ে মন্তব্য করতে থাকেন। নিরাপত্তার অভাব বোধ করায় তিনি সেখান থেকে চলে যান। অন্য এক ছাত্রীকে বাইরে অনুসরণ করা হয়েছে বলেও তাঁর অভিযোগ। অপরিচিত ব্যক্তিরা নাম ও যোগাযোগের তথ্য জানতে চাওয়ায় আতঙ্ক আরও বেড়েছে। আরেক পড়ুয়ার অভিযোগ, তাঁর ফোন নম্বর সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

হুমকির বিষয়ে কলকাতা পুলিশের সাইবার শাখায় ই-মেলে অভিযোগ জানিয়েছেন পড়ুয়ারা। সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভিযোগের তদন্ত শুরু হয়েছে। ক্যাম্পাসের ভিতরেও স্বস্তি নেই বলে অভিযোগ আন্দোলনকারীদের। তাঁদের বক্তব্য, পুলিশ, নিরাপত্তারক্ষী ও অপরিচিত ব্যক্তিরা তাঁদের ছবি এবং ভিডিয়ো তুলছেন। শনিবারের বৈঠকেও বিষয়টি তোলেন তাঁরা। নিরাপত্তার দাবিতে চলা আন্দোলনের মধ্যে এই ছবি তোলার ঘটনায় তাঁদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

তবে প্রতিষ্ঠানের রেজিস্ট্রার দীপক কুমারের বক্তব্য, পড়ুয়াদের আপত্তিতে ক্যাম্পাসে সিসিটিভি বসানো যায়নি। তাই অপ্রীতিকর ঘটনা ঠেকাতে প্রকাশ্য জায়গায় ছবি ও ভিডিয়ো রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে নিরাপত্তাকর্মীদের। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত পঠনপাঠন বন্ধ রয়েছে। ১৬ অক্টোবর ক্যাম্পাস ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও কিছু পড়ুয়া এখনও সেখানে রয়েছেন। তাঁদের দ্রুত চলে যাওয়ার আবেদন করা হয়েছে।

নিরাপত্তার অভিযোগে প্রশাসনিক উদাসীনতার দাবি অস্বীকার করেছেন রেজিস্ট্রার। তাঁর বক্তব্য, উপাচার্য সন্তোষকুমার আজমেরা ছাত্রপ্রতিনিধি ও ফিল্ম বিভাগের ডিনকে নিয়ে দু’বার কলকাতা পুলিশের উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। হিংসার ঘটনায় প্রতিষ্ঠান এফআইআর করেছে; আহতদের চিকিৎসা এবং মানসিক সহায়তার ব্যবস্থাও করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, ভাঙচুর ও আধিকারিকদের ভয় দেখানোর ঘটনার পর পুলিশি সাহায্য চাওয়া হয়। শৃঙ্খলাভঙ্গের নির্দিষ্ট অভিযোগে ডিনস কাউন্সিলের সুপারিশে ছ’জন পড়ুয়াকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

গত ২৭ সেপ্টেম্বর ক্যাম্পাসে আরএসএস-সংশ্লিষ্ট অখিল ভারতীয় গ্রাহক পঞ্চায়েতের অনুষ্ঠান ঘিরে বিরোধের সূত্রপাত। চলচ্চিত্রের সঙ্গে সম্পর্কহীন অনুষ্ঠানের জন্য প্রতিষ্ঠানের প্রেক্ষাগৃহ ব্যবহারের বিরোধিতা করেন পড়ুয়ারা। তাঁদের অভিযোগ, প্রতিবাদ করতে গিয়ে তাঁরা মারধর, গালিগালাজ ও যৌন হুমকির মুখে পড়েন। পরবর্তী বিক্ষোভেও বাইরে থেকে ক্যাম্পাসের ভিতরে পাথর এবং বোতল ছোড়ার অভিযোগ ওঠে। এই ঘটনাপ্রবাহের জেরেই নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক জবাবদিহির দাবিতে আন্দোলন চলতে থাকে। অনুষ্ঠানের আয়োজকেরা অবশ্য পাল্টা অভিযোগ করেছিলেন, পড়ুয়াদের হাতেই তাঁদের সদস্যেরা আক্রান্ত হন।

ছাত্র সংসদের দাবি, উপাচার্যকে পদত্যাগ করতে হবে, ক্যাম্পাস থেকে পুলিশ সরাতে হবে এবং বহিষ্কার, শাস্তিমূলক প্রক্রিয়া ও শোকজ নিঃশর্তে প্রত্যাহার করতে হবে। ২৭ সেপ্টেম্বর ও ৪ অক্টোবরের হিংসা, বহিরাগত সংগঠনকে অনুষ্ঠান করার অনুমতি এবং প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রাক্তনীদের সংগঠনের মাধ্যমে স্বাধীন তদন্ত চেয়েছেন তাঁরা। ভবিষ্যতে চলচ্চিত্রের সঙ্গে সম্পর্কহীন বহিরাগত সংগঠনের অনুষ্ঠান নিয়ন্ত্রণে প্রতিষ্ঠানের বিধি সংশোধনের বিষয়টিও তুলেছেন আন্দোলনকারীরা। আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে ভবিষ্যতে আর কোনও পড়ুয়ার বিরুদ্ধে নতুন করে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ করা হবে না, কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সেই নিশ্চয়তাও চেয়েছেন ছাত্র সংসদের প্রতিনিধিরা।

অচলাবস্থা কাটাতে কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের সরাসরি হস্তক্ষেপ চেয়েছেন পড়ুয়ারা। তাঁদের অভিযোগ, উপাচার্য পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করছেন না। হস্টেল ও মেস বন্ধের নির্দেশ সত্ত্বেও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন তাঁরা। অন্যদিকে উপাচার্য জানিয়েছেন, শিক্ষকেরা পড়ুয়াদের সঙ্গে কথা বলছেন। আলোচনার মাধ্যমে স্বাভাবিক পঠনপাঠন ফেরানোর আশা প্রকাশ করেছেন তিনি। কিন্তু নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং শাস্তি প্রত্যাহারের প্রশ্নে দু’পক্ষের অবস্থানের ব্যবধান এখনও স্পষ্ট।