সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন বা সিএএ-র আওতায় পশ্চিমবঙ্গের আড়াই লক্ষ আবেদনকারীকে আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে নাগরিকত্ব দেওয়ার আশ্বাস দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। রবিবার, ১ নভেম্বর উত্তর ২৪ পরগনার ঠাকুরনগরে আন্তর্জাতিক মতুয়া গোঁসাই সম্মেলনে তিনি জানান, আবেদনগুলির শুনানি দ্রুত শেষ করে যোগ্য আবেদনকারীদের হাতে নাগরিকত্বের শংসাপত্র তুলে দেওয়া হবে। মতুয়াদের দীর্ঘদিনের নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত উদ্বেগ দূর করতেই এই প্রক্রিয়ায় গতি আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।

মুখ্যমন্ত্রীর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, রাজ্যে এখনও পর্যন্ত সিএএ-র মাধ্যমে নাগরিকত্ব পেয়েছেন প্রায় ২৫ হাজার মানুষ। এবার আরও আড়াই লক্ষ আবেদনকারীর জন্য বছরের শেষ দিনকে সময়সীমা হিসেবে সামনে আনলেন তিনি। রাজ্যে বিজেপি সরকার প্রতিষ্ঠার পিছনে মতুয়া সমাজের সমর্থনের কথা উল্লেখ করে শুভেন্দু বলেন, এই সম্প্রদায়ের দাবি সংবিধান ও আইন মেনেই পূরণ করবে তাঁর সরকার।

নাগরিকত্বের সঙ্গে ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির বিষয়টিও তুলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, নাগরিকত্বের শংসাপত্র পাওয়ার পরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভোটার তালিকায় নাম তোলার ব্যবস্থা করতে জানুয়ারিতে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করবে রাজ্য সরকার। পাশাপাশি, নাগরিকত্ব পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে যাঁরা তফসিলি জাতির শংসাপত্র পাওয়ার যোগ্য, তাঁদের সেই শংসাপত্রও দেওয়া হবে। ফলে নাগরিকত্বের আবেদন নিষ্পত্তির সঙ্গে সামাজিক অধিকার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও জুড়েছেন তিনি।

মতুয়া পরিবারের মহিলাদের সরকারি সহায়তার আওতায় আনার কথাও বলেছেন শুভেন্দু। তিনি জানান, নাগরিকত্বের শংসাপত্র পাওয়ার পরে যোগ্য ২৫ থেকে ৬০ বছর বয়সি মহিলাদের অন্নপূর্ণা প্রকল্পের সুবিধা দেওয়ার জন্য সরকার পদক্ষেপ করবে। যোগ্য পরিবারগুলিকে রাজ্যের স্বাস্থ্যবিমা এবং আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের সুবিধা পেতেও সাহায্য করা হবে। উপভোক্তাদের তালিকা তৈরির জন্য সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের এগিয়ে আসতে বলেছেন মুখ্যমন্ত্রী।

এই কাজগুলির অগ্রগতি দেখার জন্য মুখ্যমন্ত্রীর দফতরে একজন আধিকারিক রাখার কথাও ঘোষণা করেছেন তিনি। আবেদনপত্রের অবস্থা এবং সরকারি সুবিধা পৌঁছনোর বিষয়টি ওই আধিকারিক দেখবেন। শুভেন্দুর বক্তব্য, যোগ্য কোনও পরিবার যেন প্রাপ্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত না হয়। মতুয়াদের রাজনৈতিক গুরুত্ব বোঝাতে তিনি দাবি করেন, রাজ্যের প্রায় ৭০টি বিধানসভা কেন্দ্রে বিজেপির প্রতিনিধি নির্বাচনে এই সম্প্রদায়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

সম্মেলনের মঞ্চ থেকে মতুয়া সমাজের উন্নয়নে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দের ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। আগামী বাজেটে ঠাকুরনগরকে পুরসভা করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। বারুণী মেলার জন্য বিশেষ সহায়তার কথা জানিয়ে তাঁর বক্তব্য, ঠাকুরবাড়ি ও ধর্মীয় মঞ্চকে ঘিরে বিভাজনের রাজনীতির অবসান ঘটানো হবে। ঠাকুরনগরের জন্য কাজ করতে পারাকে নিজের বড় প্রাপ্তি বলে বর্ণনা করেন তিনি।

একই সঙ্গে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তৃণমূল সরকারকে তীব্র আক্রমণ করেছেন শুভেন্দু। তাঁর অভিযোগ, মমতা গোড়া থেকেই সিএএ-র বিরোধিতা করেছেন এবং মতুয়া সমাজকে বিভক্ত করেছেন। তৃণমূল ক্ষমতায় থেকে গেলে পশ্চিমবঙ্গ ‘বৃহত্তর বাংলাদেশ’ হয়ে যেত বলেও দাবি করেন তিনি। বিপরীতে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী মতুয়াদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি পালন করেছেন বলে মন্তব্য করেন মুখ্যমন্ত্রী।

বর্তমান বাংলাদেশের সঙ্গে মতুয়া সমাজের বহু পরিবারের শিকড়ের যোগ রয়েছে। হরিচাঁদ ঠাকুরের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ধর্মীয় ও সমাজসংস্কার আন্দোলন অবিভক্ত পূর্ববঙ্গের নমঃশূদ্র সমাজের মধ্যে বিশেষ প্রভাব বিস্তার করেছিল। পশ্চিমবঙ্গে উত্তর ২৪ পরগনা ও নদিয়া-সহ বিভিন্ন এলাকায় মতুয়াদের উপস্থিতি নির্বাচনী রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ। সেই সামাজিক ও রাজনৈতিক পটভূমিতেই নাগরিকত্ব এবং উন্নয়ন নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণাগুলি এসেছে।

ঘোষণাগুলি মিলিয়ে স্পষ্ট, নাগরিকত্ব, ভোটাধিকার এবং সরকারি সুযোগসুবিধা—এই তিন বিষয়কে একসঙ্গে সামনে আনছেন শুভেন্দু। তবে আড়াই লক্ষ মানুষ ইতিমধ্যেই নাগরিকত্ব পেয়েছেন, এমন ঘোষণা হয়নি; এটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আবেদন নিষ্পত্তির প্রতিশ্রুতি। এখন দেখার, ডিসেম্বরের মধ্যে শুনানি শেষ করে কতজন যোগ্য আবেদনকারীর হাতে শংসাপত্র পৌঁছে দিতে পারে প্রশাসন।