যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীর যৌন হেনস্থার অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযুক্ত শিক্ষাকর্মীর ক্যাম্পাসে প্রবেশ নিষিদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ অভিযোগ কমিটি বা আইসিসি তদন্ত শেষ না করা পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার কথা জানিয়েছেন তিনি। অভিযুক্ত গণিত বিভাগের অশিক্ষক কর্মী। ঘটনাটি ঘিরে পড়ুয়াদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাঁরা দ্রুত তদন্ত এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

ছাত্রীর অভিযোগ অনুযায়ী, শুক্রবার তিনি কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের টেকনোলজি ভবনের সাততলার সিঁড়িতে বসেছিলেন। তাঁদের সেখান থেকে চলে যেতে বলা হয়। অন্যরা নীচে নেমে গেলেও তিনি তখনও সেখানে ছিলেন। অভিযুক্ত কর্মী তাঁর কাছে এসে নাম, বিভাগ এবং ফোন নম্বর জানতে চান। পরে ওই কর্মী তাঁকে ছয়তলায় নিয়ে যান। সেখানেই তাঁকে যৌন হেনস্থা করা হয় বলে উপাচার্যের কাছে অভিযোগ জানিয়েছেন ওই ছাত্রী।

অভিযোগপত্রের বিবরণ অনুযায়ী, ছয়তলায় নিয়ে গিয়ে কয়েকটি তালাবন্ধ ঘর দেখান কর্মীটি। তিনি জানান, আগে ল্যাপটপ চুরি যাওয়ায় ওই অংশে ছাত্রছাত্রীদের যাতায়াত নিষিদ্ধ। ছাত্রীটির অভিযোগ, ফিরে আসার সময় ওই কর্মী তাঁর হাত ধরে টানেন এবং কোমর জড়িয়ে ধরেন। তিনি বাধা দিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে আসেন। পরে বন্ধুদের ঘটনাটি জানান। অভিযুক্ত নীচে নামলে পড়ুয়ারা তাঁকে ঘিরে অভিযোগের জবাব চান।

অভিযুক্ত কর্মী যৌন হেনস্থার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, ভবনের উপরের অন্ধকার অংশে পড়ুয়াদের দেখে তিনি তাঁদের পরিচয় জানতে চেয়েছিলেন এবং সেখান থেকে চলে যেতে বলেছিলেন। কলা বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা সেখানে কেন বসেছিলেন, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি। তাঁর দাবি, ঘটনাটিকে বিকৃত করে উপস্থাপন করা হচ্ছে। প্রকৃত ঘটনা জানতে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সিসিটিভির ফুটেজ খতিয়ে দেখার আবেদন জানিয়েছেন অভিযুক্ত।

কিন্তু সিসিটিভি নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারী ছাত্রীর সহপাঠীরা। তাঁদের বক্তব্য, টেকনোলজি ভবনের ছয় ও সাততলায় ক্যামেরা নেই। ফলে ওই অংশে নজরদারির ঘাটতি রয়েছে। অভিযোগপত্রে আলো ও নিরাপত্তার বিষয়টিও সামনে এসেছে। ভবনের নির্জন অংশে পড়ুয়াদের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তাঁরা। অভিযোগের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও তাই প্রশ্ন উঠেছে।

সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফে ছাত্রীটিকে পুলিশে অভিযোগ জানানো অথবা আইসিসির তদন্ত চাওয়ার বিকল্প দেওয়া হয়েছিল। তিনি আইসিসির তদন্তের পথ বেছে নিয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। উপাচার্য অভিযোগটি ওই কমিটির কাছে পাঠিয়েছেন। তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং পরবর্তী ব্যবস্থা নির্ধারণ করার কথা।

এদিকে, শুধু তদন্তের আশ্বাসে থামতে চাইছেন না পড়ুয়ারা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমবার, ২ নভেম্বর প্রশাসনিক ভবন অরবিন্দ ভবনে যাওয়ার কর্মসূচি নিয়েছেন তাঁরা। তাঁদের দাবি, অভিযুক্তের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার বিজ্ঞপ্তি জারি করতে হবে এবং অভিযোগটি আইসিসির কাছে পাঠানো নিশ্চিত করতে হবে। তদন্ত দীর্ঘায়িত হওয়া এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কার্যকর করতে দেরি হওয়ার বিরুদ্ধেও ক্ষোভ জানিয়েছেন তাঁরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের এক আধিকারিক ওই সংবাদপত্রকে জানিয়েছেন, কিছু ক্ষেত্রে আইসিসি তদন্ত শেষ করে সুপারিশ জমা দিলেও কর্মসমিতির বৈঠক না হওয়ায় শাস্তির সিদ্ধান্ত কার্যকর করা যায়নি। পড়ুয়ারা যৌন হেনস্থা প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়ানোর দাবিও তুলেছেন। ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের জন্য নিয়মিত কর্মশালা এবং লিঙ্গসংবেদনশীলতা তৈরির উদ্যোগ চান তাঁরা। ফলে বর্তমান অভিযোগের নিষ্পত্তির পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিযোগ মোকাবিলার ব্যবস্থাটিও আলোচনায় এসেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত আইসিসি নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, অভিযোগকারী এবং অভিযুক্ত—উভয়ের ক্ষেত্রেই কমিটিকে নিরপেক্ষ থাকতে হবে। কোনও পক্ষের প্রতি পক্ষপাত না করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই তার দায়িত্ব। পড়ুয়াদের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়ে কমিটির বৈঠকে ছাত্র প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের ব্যবস্থাও রয়েছে। বর্তমান ঘটনায় অভিযোগের তদন্ত এবং ক্যাম্পাসে প্রবেশের অন্তর্বর্তী নিষেধাজ্ঞা পৃথক বিষয়। তদন্তের সিদ্ধান্ত আসার আগে অভিযুক্তের অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যাবে না।