মঙ্গলবার গাইঘাটা ও শমসেরগঞ্জে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে দুই অভিযুক্তের মৃত্যু হয়। গাইঘাটায় ভোররাতে পুলিশের অভিযানে নিহত ব্যক্তির নাম প্রহ্লাদ দাস। এক নাবালিকাকে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় তিনি অভিযুক্ত ছিলেন। শমসেরগঞ্জে পুলিশের ‘এনকাউন্টারে’ নিহত হন স্থানীয় এক বিজেপি নেতার খুনে অভিযুক্ত সামিউল শেখ।
এই ঘটনার আবহে রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়নমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল ফেসবুকে ‘এনকাউন্টার’ শিরোনামে একটি কবিতা পোস্ট করেছেন। কবিতায় তিনি সরাসরি পুলিশের অভিযানের উল্লেখ করেননি। তবে যে সময়ে পোস্টটি করা হয়েছে, তাতে মঙ্গলবারের দুই ঘটনার প্রতিক্রিয়াতেই তিনি কবিতাটি লিখেছেন বলে মনে হচ্ছে।
বাংলায় লেখা কবিতার প্রথম কয়েকটি পঙ্ক্তিতে অগ্নিমিত্রা অপরাধের অবসান চেয়েছেন। বলেছেন, মানুষ যেন শান্তিতে বাঁচতে পারেন। তাঁর আশা, এবার ‘ভয়ের অন্ধকার’ দূর হবে এবং মানুষের নিরাপত্তার দায়িত্বে যাঁরা রয়েছেন, তাঁরা নানা ধরনের নৃশংস ঘটনার পুনরাবৃত্তি রুখবেন।
দ্বিতীয় স্তবকে অগ্নিমিত্রা লিখেছেন, অন্যায়ের সঙ্গে কোনও আপস হতে পারে না। অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন। কঠিন পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া যে সহজ নয়, তা স্বীকার করে তিনি বলেছেন, সাহসের মূল্য দিতে হয়। তবে জননিরাপত্তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছু নেই।
কবিতার শেষ অংশে অগ্নিমিত্রা মানুষের পাশে রাষ্ট্রের দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। চেয়েছেন, প্রতিটি ঘরে শান্তি ফিরে আসুক। তাঁর বক্তব্য, জননিরাপত্তার প্রশ্নে কোনও আপস করা যায় না; অপরাধ দমনে কঠোরতা প্রয়োজন।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী যখন জানাচ্ছেন, রাজ্যে নারী নির্যাতন ও মাদক পাচার—এই দুই প্রধান সমস্যা মোকাবিলায় পুলিশকে ‘পূর্ণ স্বাধীনতা’ দেওয়া হয়েছে, তখনই অগ্নিমিত্রার এই কবিতা প্রকাশ্যে এল।
পুলিশের পদক্ষেপকে সমর্থন জানিয়েছেন শিল্প প্রতিমন্ত্রী মৌমিতা বিশ্বাস মিশ্রও। তাঁর বক্তব্য, বিজেপি সরকার যে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, এই ঘটনাই তার প্রতিফলন।
তিনি বলেন, “বাংলায় পরিবর্তন দেখতে এমনই হয়। মানুষ এই পরিবর্তনই চেয়েছিলেন।”
মিশ্রের অভিযোগ, বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার আগের বছরগুলিতে মহিলাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়নি। এই প্রশ্নে তিনি বামফ্রন্ট এবং পূর্ববর্তী তৃণমূল কংগ্রেস সরকার—উভয়েরই সমালোচনা করেন। তাঁর দাবি, বামফ্রন্টের আমলে অপরাধের যথাযথ তদন্ত হতো না। আগের সরকারগুলি প্রায়ই অপরাধের গুরুত্ব লঘু করে দেখাত বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
বিজেপি সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মিশ্র বলেন, শপথ নেওয়ার পরই অধিকারী স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন, গুন্ডামি এবং মহিলাদের অপমান সহ্য করা হবে না। “পশ্চিমবঙ্গের মানুষ আজ সেটাই দেখেছেন,” বলেন তিনি। অপরাধের বিরুদ্ধে সরকারের ঘোষিত ‘কোনও রকম প্রশ্রয় না দেওয়ার’ নীতির কথাও ফের তুলে ধরেন।
গাইঘাটার এনকাউন্টার নিয়ে প্রশ্নের উত্তরে পঞ্চায়েতমন্ত্রী দিলীপ ঘোষ কয়েক মাস আগে দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে ঘটে যাওয়া একই ধরনের একটি ঘটনার উল্লেখ করেন।
ঘোষ বলেন, “এর আগেও দক্ষিণ ২৪ পরগনায় এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল। একজন খুনি পালাচ্ছিল। এনকাউন্টার হয়েছিল। এখানেও, গাইঘাটায়, তা-ই হয়েছে।”
তাঁর বক্তব্য, যারা গুরুতর অপরাধ করছে, তাদের পরিণতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, প্রত্যেককে বিচারের আওতায় আনতে হবে এবং কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। তাঁর কথায়, “কেউ আইন অমান্য করলে তার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটবে।”
ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা পুলিশের দায়িত্ব বলে যুক্তি দেন ঘোষ। তাঁর মতে, পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন। তিনি বলেন, “আস্থা ফেরাতে হলে পুলিশকে কিছু অপ্রিয় কাজ করতেই হবে।”
গত জুলাইয়ে বারুইপুরে এক নাবালিকাকে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় মূল অভিযুক্ত পুলিশের এনকাউন্টারে নিহত হন। অভিযোগ, ঘটনার পুনর্নির্মাণের সময় তিনি এক পুলিশকর্মীর আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে গুলি চালিয়েছিলেন।
পুলিশের দাবি, গাইঘাটা ও শমসেরগঞ্জের ঘটনাতেও একইভাবে অভিযুক্তেরা তাঁদের সঙ্গে থাকা পুলিশকর্মীদের আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে হেফাজত থেকে পালানোর চেষ্টা করেন। এরপর পুলিশের ‘পাল্টা গুলিতে’ তাঁদের মৃত্যু হয়।
বিরোধীরা অবশ্য এনকাউন্টারের পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিজেপি সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছেন।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল শিবিরের প্রবীণ বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় বলেন, এনকাউন্টার করে প্রচার পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু দেশে একটি বিচারব্যবস্থা রয়েছে। ধর্ষণের মামলায় দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তী প্রশ্ন তোলেন, অভিযুক্তেরা কীভাবে পুলিশের কাছ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র ছিনিয়ে নিতে পারলেন?
মানবাধিকার সংগঠন গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা সমিতি বা এপিডিআরও গাইঘাটার ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। একটি বিবৃতিতে সংগঠনের সহ-সভাপতি রঞ্জিত শূর প্রশ্ন তুলেছেন, কোন পরিস্থিতিতে অভিযুক্তকে মাঝরাতে ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
তিনি বলেন, “মাঝরাতে বন্দিকে ঘটনার পুনর্নির্মাণে নিয়ে যাওয়াটাই অত্যন্ত সন্দেহজনক। তার উপর বন্দির হাতও বাঁধা ছিল না।” অভিযুক্ত কীভাবে পুলিশের রিভলভার ছিনিয়ে নিতে পারলেন, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
মন্তব্য করতে আপনার বাংলাস্ফিয়ার অ্যাকাউন্টে লগইন করুন। সদস্যতা কেনার প্রয়োজন নেই।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।