প্রাক্তন ব্যক্তিগত সহকারী চন্দ্রনাথ রথের হত্যাকাণ্ড নিয়ে তৃণমূল নেতৃত্বের দিকে ফের অভিযোগের আঙুল তুললেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বুধবার, ২৮ অক্টোবর বিধানসভায় তাঁর প্রশ্ন, চন্দ্রনাথকে খুন করতে দু’কোটি টাকার ‘সুপারি’ কে দিয়েছিল—কালীঘাট, ক্যামাক স্ট্রিট, না ডায়মন্ড হারবার? মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, এই মামলায় সাত জন গ্রেফতার হলেও খুনের জন্য টাকা জুগিয়েছিল কে, তা এখনও তদন্তে নির্ধারিত হয়নি। সেই সূত্র মিললেই ষড়যন্ত্রের সম্পূর্ণ ছবি পরিষ্কার হবে।

চন্দ্রনাথের মা হাসিরানি রথ এবং রেজিনগরের নবনির্বাচিত বিজেপি বিধায়কের শপথগ্রহণের পরে এই মন্তব্য করেন শুভেন্দু। নন্দীগ্রামের উপনির্বাচনে জয়ী হয়ে বিধানসভায় এসেছেন হাসিরানি। শুভেন্দুর অভিযোগ, তাঁর সহযোগী হিসেবে কাজ করতেন বলেই চন্দ্রনাথকে হত্যা করা হয়েছিল। নিহত সহকারীর মায়ের বিধায়ক হিসেবে শপথের দিনেই তাই ফের সামনে এল সেই হত্যাকাণ্ড এবং তার নেপথ্যের নির্দেশদাতাদের পরিচয়।

মুখ্যমন্ত্রীর উল্লেখ করা তিনটি জায়গার রাজনৈতিক তাৎপর্য স্পষ্ট। কালীঘাটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবন। ক্যামাক স্ট্রিটের সঙ্গে যুক্ত অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দফতর। ডায়মন্ড হারবার তাঁর লোকসভা কেন্দ্র। ফলে সরাসরি কারও নাম না বললেও শুভেন্দুর আক্রমণের লক্ষ্য মমতা ও অভিষেক। তবে এই রাজনৈতিক ইঙ্গিতের ভিত্তিতে তাঁদের কারও অপরাধে সংশ্লিষ্টতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর তথ্য প্রকাশিত প্রতিবেদনে নেই।

গত ৬ মে রাতে উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যমগ্রামে গুলিবিদ্ধ হন চন্দ্রনাথ। বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার দু’দিন পরের ঘটনা। তখনও শুভেন্দু মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেননি। পুলিশের প্রাথমিক বিবরণ অনুযায়ী, চন্দ্রনাথের গাড়ি আটকে খুব কাছ থেকে গুলি চালায় হামলাকারীরা। তিনি চালকের পাশের আসনে বসেছিলেন। ঘটনায় তাঁর গাড়ির চালকও গুরুতর আহত হন। রাজ্যে ক্ষমতা বদলের সন্ধিক্ষণে এই খুন রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দেয়।

প্রথমে রাজ্য পুলিশ ও বিশেষ তদন্তকারী দল তদন্ত শুরু করে। পরে তদন্তভার যায় সিবিআইয়ের হাতে। অগস্টে প্রকাশিত সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়, তদন্তকারীরা প্রায় ছ’মাস ধরে চলা একটি কথিত ষড়যন্ত্রের সূত্র পেয়েছেন। সিসিটিভির ছবি, গাড়ির টোলের নথি, মোবাইল এবং অন্যান্য ডিজিটাল তথ্য মিলিয়ে অভিযুক্তদের গতিবিধি পুনর্গঠনের চেষ্টা হয়েছে। একাধিক রাজ্যে যাতায়াত এবং আগাম নজরদারির অভিযোগও উঠে এসেছে। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভিযুক্তেরা হত্যার আগে মধ্যমগ্রাম, চন্দ্রনাথের দফতর এবং বিধানসভা সংলগ্ন এলাকায় নজরদারি চালিয়েছিল বলে সিবিআইয়ের অভিযোগ। গাড়িতে ভুয়ো নম্বরপ্লেট ব্যবহার এবং পরিচয় গোপন করে হোটেলে থাকার কথাও তদন্তে উঠে এসেছে বলে জানানো হয়।

দু’কোটি টাকার অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। সেপ্টেম্বরে হাসিরানির মনোনয়ন জমা দেওয়ার সময়ও শুভেন্দু একই অঙ্কের কথা বলেছিলেন। তখন তিনি ‘ভাইপো গ্যাং’-এর দিকে অভিযোগ তুলেছিলেন এবং ডায়মন্ড হারবারের কিছু ফোনালাপ শোনার দাবি করেছিলেন। কিন্তু সেই সময় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল, ধৃতদের সঙ্গে তৃণমূলের যোগের সূত্র সিবিআই তখনও পায়নি। বুধবারের বক্তব্যেও অর্থদাতার পরিচয় অমীমাংসিত থাকার কথা স্বীকার করেছেন মুখ্যমন্ত্রী।

হাসিরানিকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্তে বিজেপি চন্দ্রনাথের হত্যাকাণ্ডকে সরাসরি নির্বাচনী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করেছিল। শুভেন্দুর ছেড়ে দেওয়া নন্দীগ্রাম আসনে তাঁর জয় এবং বিধানসভায় প্রবেশ সেই ঘটনার নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়। শপথের অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী নন্দীগ্রামের ভোটারদের ধন্যবাদও জানান। কিন্তু নির্বাচনী সাফল্যের পরেও পরিবারের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি রয়ে গিয়েছে: চন্দ্রনাথকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল কারা, এবং কেন?

এখন তদন্তের সামনে মূল কাজ অর্থের লেনদেন, নির্দেশের উৎস এবং ধৃতদের সঙ্গে সম্ভাব্য নির্দেশদাতাদের যোগাযোগ প্রমাণসহ প্রতিষ্ঠা করা। মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর, কারণ তার নিশানায় রাজ্যের প্রধান বিরোধী নেতৃত্ব। সেই অভিযোগের নিষ্পত্তিও হতে হবে সমান দৃঢ় প্রমাণে। চন্দ্রনাথ হত্যার বিচার সম্পূর্ণ হওয়ার দাবি তাই শুধু বন্দুকবাজদের গ্রেফতারে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; পরিকল্পনাকারী ও অর্থদাতাদের পরিচয়ও নির্ভরযোগ্য তদন্তে সামনে আসা প্রয়োজন। নিহতের পরিবারের কাছে ন্যায়বিচারের অর্থ গোটা অপরাধচক্রের জবাবদিহি।