নিরাপত্তার জন্য লাগানো হয়েছিল ৩০টি সিসিটিভি ক্যামেরা। অথচ তার মধ্যে ১৭টিই কাজ করছিল না। উত্তর কলকাতার চোরবাগান দুর্গাপুজোর মণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যুর তদন্তে উঠে এসেছে এই তথ্য। তদন্তকারী সূত্রের বক্তব্য, অচল ক্যামেরাগুলি কার্যত ‘শো-পিস’ হয়ে ঝুলছিল। ফলে বিপর্যয়ের আগে এবং ঘটনার সময়ে কী ঘটেছিল, তার দৃশ্যপট তৈরি করতে হোঁচট খাচ্ছেন তদন্তকারীরা।

সবচেয়ে বড় সমস্যা মণ্ডপের বেরোনোর দরজা ঘিরে। সেখানে লাগানো তিনটি ক্যামেরার মধ্যে দু’টিই অচল ছিল বলে তদন্তকারী সূত্রের দাবি। অর্থাৎ, যে জায়গার ছবি ঘটনাক্রম বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, সেখানকার নজরদারিই ছিল অসম্পূর্ণ। এখন একমাত্র সচল ক্যামেরার রেকর্ডিংয়ের সাহায্যে ভিড়ের গতিবিধি এবং মানুষের বেরিয়ে আসার পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা চলছে।

পুলিশ মণ্ডপ থেকে দু’টি ডিজিটাল ভিডিও রেকর্ডার বা ডিভিআর বাজেয়াপ্ত করেছে। একটি যন্ত্রে ১৪টি এবং অন্যটিতে ১৬টি ক্যামেরার ছবি সংরক্ষিত থাকার কথা ছিল। কিন্তু একটি ডিভিআর থেকে মাত্র ১৩টি ক্যামেরার রেকর্ডিং উদ্ধার হয়েছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে তদন্তকারী সূত্রের দাবি, বাকি ১৭টি ক্যামেরা আদৌ চালু করা হয়নি।

এই ঘাটতি পুষিয়ে নিতে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞেরা একই সময়ে চার-পাঁচটি ক্যামেরার ছবি মিলিয়ে দেখছেন। উদ্দেশ্য, বিভিন্ন অবস্থান থেকে পাওয়া দৃশ্যের সময় এবং ঘটনাক্রমের মধ্যে যোগসূত্র খুঁজে বার করা। প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানও পাশাপাশি যাচাই হচ্ছে। ইতিমধ্যেই ঘটনায় আহত ২৫ জনের সঙ্গে কথা বলেছেন তদন্তকারীরা। মৃতদের পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকেও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

তদন্তের আওতায় মণ্ডপের নকশা ও নির্মাণও রয়েছে। থিমশিল্পী সুশান্ত শিবানী পালকে মণ্ডপের পরিকল্পনা, নির্মাণপদ্ধতি এবং সম্ভাব্য কাঠামোগত সমস্যার বিষয়ে জানতে তলব করেছে লালবাজার। ভিতরে পর্যাপ্ত আলো ছিল কি না, দর্শনার্থীদের ঢোকা ও বেরোনোর ব্যবস্থা কেমন ছিল এবং বিপুল জনসমাগম সামলানোর পরিকল্পনা কী ছিল, সেই প্রশ্নগুলিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

গত ১৭ অক্টোবরের ওই বিপর্যয়ের পিছনে একাধিক কারণ কাজ করেছে বলে তদন্তকারীদের ধারণা। তবে মাইকে মণ্ডপ ভেঙে পড়ার বিভ্রান্তিকর ঘোষণা আতঙ্ক ছড়ানোর প্রধান কারণ হয়ে থাকতে পারে। এক পুলিশ আধিকারিক জানিয়েছেন, ওই ঘোষণার পরেই দর্শনার্থীদের মধ্যে হুড়োহুড়ি শুরু হয় বলে তাঁরা মনে করছেন। এটি এখনও তদন্তকারীদের প্রাথমিক মূল্যায়ন; চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়।

এদিকে রাজ্য সরকারের গঠিত ছয় সদস্যের বিশেষ তদন্তদলও কাজ এগোচ্ছে। অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অনিন্দিতা রায় সরস্বতীর নেতৃত্বাধীন দলের বৈঠকে প্রাথমিক তথ্য এবং পরবর্তী তদন্তের বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৩১ অক্টোবর থেকে সাক্ষ্যপ্রমাণ ও বয়ান সংগ্রহের সিদ্ধান্ত হয়েছে। স্থানীয় পুলিশ এবং পুজো উদ্যোক্তাদের প্রশাসনিক ও নিরাপত্তাগত গাফিলতি ছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তদন্তদলের নজরে রয়েছে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, প্রবেশ ও প্রস্থানের পথ, ভিড় নিয়ন্ত্রণের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা এবং নির্মাণে কোনও ত্রুটি ছিল কি না। অর্থাৎ, অনুসন্ধান শুধু আতঙ্কের তাৎক্ষণিক কারণেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। সেই আতঙ্ক কেন এত বড় প্রাণঘাতী বিপর্যয়ে পরিণত হল, তা বোঝার জন্য আয়োজন ও নজরদারির ব্যবস্থাও পরীক্ষা করা হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে জরুরি প্রশ্ন উঠছে: ক্যামেরা বসানোর পরে সেগুলি সচল আছে কি না, তা পরীক্ষা করার দায়িত্ব কার ছিল? পুজো শুরুর আগে রেকর্ডিং যাচাই হয়েছিল কি? অচল ব্যবস্থার কথা কারও জানা থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন? এগুলির উত্তর ছাড়া শুধু ক্যামেরার সংখ্যা জানিয়ে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনের দাবি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।

উনিশটি প্রাণ চলে যাওয়ার পরে সেই নজরদারির ঘাটতিই এখন সত্য উদ্‌ঘাটনের পথে বাধা। ঘটনার দায় নির্ধারণে প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ। অথচ যে ছবি সেই প্রমাণ জোগাতে পারত, তার বড় অংশই তদন্তকারীদের হাতে নেই। চোরবাগানের বিপর্যয় তাই আয়োজনের নিরাপত্তার পাশাপাশি নিরাপত্তা যাচাইয়ের ব্যবস্থাকেও কঠিন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।