রাজ্যে স্কুল সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে আগামী দিনে নিযুক্ত শিক্ষকেরা চাকরিতে থাকাকালীন সক্রিয় রাজনীতিতে অংশ নিতে পারবেন না। পঞ্চায়েত, পুরসভা, বিধানসভা কিংবা লোকসভা—কোনও নির্বাচনেই প্রার্থী হতে পারবেন না তাঁরা। বুধবার, ২৮ অক্টোবর নবান্নে মন্ত্রিসভার বৈঠকের পরে এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা এবং শিক্ষার মান ফেরানোই এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য বলে দাবি করেছে রাজ্য সরকার।
মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, এসএসসির শিক্ষক নিয়োগের বিধিতে এই শর্ত যুক্ত করা হবে। তবে ইতিমধ্যেই নিযুক্ত এবং রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত শিক্ষকদের ক্ষেত্রে নতুন নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য হবে না। বর্তমানে শিক্ষকতার পাশাপাশি যাঁরা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করছেন, তাঁদেরও সেই অধিকার বহাল থাকবে। সরকারের যুক্তি, তাঁদের নিয়োগের সময়ে এমন শর্ত ছিল না; ভবিষ্যতের নিয়োগে শুরু থেকেই বিষয়টি স্পষ্ট করে দেওয়া হবে।
সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যায় শুভেন্দু বিহার ও উত্তরপ্রদেশের উদাহরণ টেনেছেন। তাঁর বক্তব্য, অন্য রাজ্যে শিক্ষকদের প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে অংশগ্রহণের উপরে বিধিনিষেধ রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গেও সেই ব্যবস্থা চালু করতে চায় সরকার। পূর্ববর্তী বামফ্রন্টের ৩৪ বছর এবং তৃণমূলের ১৫ বছরের শাসনকে শিক্ষার অবনতির জন্য দায়ী করেন তিনি। শিক্ষকের মর্যাদা, শিক্ষাঙ্গনের পবিত্রতা এবং পড়াশোনার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার সঙ্গে এই সিদ্ধান্তকে যুক্ত করেছেন মুখ্যমন্ত্রী।
কিন্তু ঘোষণার পরেই প্রশ্ন উঠেছে, প্রচলিত বিধি সংশোধন না করে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা সম্ভব কি না। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৮ সালের শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের নিয়োগ, আচরণ এবং শৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিধির ২২(১) ধারায় নির্দিষ্ট শর্তে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কমিটির অনুমোদন এবং প্রযোজ্য নিয়ম মেনে সংসদ, বিধানসভা ও স্থানীয় স্বশাসিত সংস্থার নির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার বিধান আছে।
আইনজীবী শামিম আহমেদের বক্তব্য, মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে আইন সংশোধন করতে হবে। প্রবীণ আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্যের আপত্তি পুরনো ও নতুন শিক্ষকদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা নিয়ে। তাঁর প্রশ্ন, একই পেশায় কর্মরত একজন রাজনীতি করতে পারবেন, অথচ পরে নিযুক্ত আরেকজন পারবেন না কেন? এই বৈষম্যের প্রশ্ন তুলে সংশোধনী এলে আদালতে চ্যালেঞ্জ করার কথাও জানিয়েছেন তিনি। ফলে ঘোষণার পরেও বাস্তবায়নের আইনি পথ নিয়ে বিতর্ক থাকছে।
রাজনৈতিক বিরোধিতাও শুরু হয়েছে। সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তীর বক্তব্য, সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত শূন্য শিক্ষকপদ পূরণ এবং বিদ্যালয়ের পরিকাঠামোর উন্নতি। পর্যাপ্ত শিক্ষক ছাড়াই বহু স্কুল চলছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত ঠিক করার পরিবর্তে শিক্ষকদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বন্ধ করাকে সামনে আনার সমালোচনা করেছে বিরোধী শিবির। কংগ্রেসও সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছে।
এই বিতর্কের একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হল, বর্তমান বিজেপি সরকারের মন্ত্রীদের মধ্যেও শিক্ষকতার পেশা থেকে উঠে আসা জনপ্রতিনিধি রয়েছেন। স্কুলশিক্ষামন্ত্রী দীপক বর্মণ, সেচমন্ত্রী অরূপকুমার দাস এবং প্রতিমন্ত্রী অমিয় কিস্কু স্কুলশিক্ষক। তবে মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষিত ব্যতিক্রম অনুযায়ী, আগে থেকে কর্মরত শিক্ষকদের রাজনৈতিক অধিকার বজায় থাকছে। ফলে তাঁদের অবস্থান এবং ভবিষ্যতে নিযুক্ত শিক্ষকদের অবস্থান এক হবে না।
একই বৈঠকে আরও প্রায় ১,২০০ পদ সৃষ্টির অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, সাম্প্রতিক কয়েকটি বৈঠক মিলিয়ে প্রায় ৬০ হাজার পদ তৈরির পথ খুলেছে। রাজ্যের নতুন শিল্পনীতিও চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে; ৫ নভেম্বর নবান্ন সভাঘরে তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করার কথা। তবে শিক্ষক নিয়োগে রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ঘোষণাই শিক্ষা ও প্রশাসনিক মহলে বিশেষ বিতর্ক তৈরি করেছে।
এখন নজর থাকবে সংশোধিত নিয়োগবিধির ভাষার দিকে। সক্রিয় রাজনীতি বলতে ঠিক কোন কাজগুলি বোঝানো হবে, বিধিভঙ্গের অভিযোগ কীভাবে বিচার করা হবে এবং পুরনো বিধানের সঙ্গে নতুন শর্তের সামঞ্জস্য কীভাবে রাখা হবে—এসবই বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। মন্ত্রিসভার ঘোষণায় নীতিগত অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে; তার পূর্ণ প্রশাসনিক ও আইনি রূপ বোঝা যাবে বিস্তারিত বিধি সামনে এলে।
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
মন্তব্য করতে আপনার বাংলাস্ফিয়ার অ্যাকাউন্টে লগইন করুন। সদস্যতা কেনার প্রয়োজন নেই।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।