কলকাতার সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে পুলিশ মোতায়েনের বিতর্ক আরও তীব্র হল। আন্দোলনকারী পড়ুয়াদের অভিযোগ, নিরাপত্তার নামে তাঁদের দৈনন্দিন চলাফেরা, কথাবার্তা এবং ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি ও ভিডিয়ো তোলা হচ্ছে। ছাত্রীদেরও গোপনে ক্যামেরাবন্দি করা হয়েছে বলে দাবি তাঁদের। কর্তৃপক্ষ অবশ্য জানিয়েছেন, ক্যাম্পাসের আবাসিকদের সুরক্ষা এবং প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি রক্ষার জন্যই নিরাপত্তার ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, পড়ুয়ারা এক বিবৃতিতে জানান, বুধবার মধ্যরাতে এক নিরাপত্তারক্ষীকে পকেটে মোবাইল লুকিয়ে ভিডিয়ো করতে ধরে ফেলেন তাঁরা। অভিযোগ, প্রথমে ফোন দেখাতে অস্বীকার করেন ওই রক্ষী। পরে নিরাপত্তা বিভাগের এক তত্ত্বাবধায়কের উপস্থিতিতে ফোনটি দেন। পড়ুয়াদের দাবি, সেখানে তাঁদের ফোনে কথা বলা ও নিজেদের মধ্যে আলাপ করার ভিডিয়ো পাওয়া যায়। উপাচার্যের নিরাপত্তার জন্য মোতায়েন পুলিশও তাঁর দফতর ছাড়ার পরে পড়ুয়াদের ছবি তুলছে বলে অভিযোগ।

রেজিস্ট্রার দীপক কুমারের বক্তব্য, পড়ুয়া, শিক্ষক, কর্মী এবং ক্যাম্পাসের অন্য আবাসিকদের নিরাপত্তার স্বার্থেই পুলিশ রাখা হয়েছে। উপাচার্যের দফতরে ভাঙচুর, শারীরিক নিগ্রহ ও ভয় দেখানোর অভিযোগের পাশাপাশি তিনি ২৭ অক্টোবরের মশাল মিছিলের উল্লেখ করেছেন। কর্তৃপক্ষের দাবি, ওই মিছিলে ক্যাম্পাসে আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল।

ছবি ও ভিডিয়ো তোলার নির্দেশ দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে রেজিস্ট্রার জানিয়েছেন, প্রকাশ্য জায়গায় যাতায়াতের রেকর্ড রাখতে নিরাপত্তাকর্মীদের বলা হয়েছে, যাতে নতুন করে ক্ষয়ক্ষতি বা কারও ক্ষতি ঠেকানো যায়। তাঁর দাবি, পড়ুয়াদের বাধায় সিসিটিভি বসানো সম্ভব হয়নি। ক্যাম্পাস ছাড়ার নির্দেশ সত্ত্বেও সেখানে অবস্থান চালিয়ে যাওয়াকে তিনি বেআইনি দখল বলে বর্ণনা করেছেন। পুলিশ মোতায়েনের প্রয়োজনীয়তা নিয়মিত পর্যালোচনা করা হবে বলেও জানিয়েছেন।

ছাত্র সংসদ এই যুক্তি মানতে নারাজ। তাদের বক্তব্য, শান্তিপূর্ণ মশাল মিছিলকে বিপদের কারণ হিসেবে দেখিয়ে প্রতিবাদকে অপরাধের চেহারা দেওয়া হচ্ছে। সংসদের দাবি, মঙ্গলবারের মিছিল সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টার মধ্যেই শেষ হয়েছিল; অথচ গভীর রাতে ক্যাম্পাসে পুলিশ আনা হয়। পড়ুয়াদের প্রশ্ন, আগে তাঁদের উপর হামলার অভিযোগ উঠেছিল যখন, তখন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন একই তৎপরতা দেখায়নি কেন?

আন্দোলনকারীদের মতে, চলচ্চিত্র শিক্ষার প্রতিষ্ঠানে স্বাধীন চিন্তা, সৃজনশীল পরীক্ষা এবং রাজনৈতিক বিতর্কের সুযোগ থাকা জরুরি। সারাক্ষণ পুলিশি উপস্থিতি ও নজরদারি সেই পরিবেশ নষ্ট করছে। সম্মতি ছাড়া ছবি তোলা তাঁদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, মর্যাদা ও নিরাপত্তার পক্ষে উদ্বেগজনক বলেও জানিয়েছেন তাঁরা। তাঁদের আশঙ্কা, প্রশাসনের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করলেই নজরদারির মুখে পড়তে হবে—এমন ধারণা তৈরি হলে গণতান্ত্রিক কার্যকলাপে অংশ নেওয়াও কঠিন হয়ে উঠবে।

বৃহস্পতিবার উপাচার্য সন্তোষ অজমেরাকে চিঠি দিয়ে ছাত্র সংসদ ক্যাম্পাসের ভিতর থেকে পুলিশ প্রত্যাহারের জন্য ৪৮ ঘণ্টা সময় দিয়েছে। পুলিশ ডাকার নথি প্রকাশ, অতিথি চলচ্চিত্রকারদের প্রবেশে বাধার ব্যাখ্যা এবং শান্তিপূর্ণ জমায়েতের জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না—এমন লিখিত আশ্বাসও চাওয়া হয়েছে। দাবি না মানলে আইনি পদক্ষেপের কথা জানিয়েছে সংসদ।

পুলিশ সরানোর দাবি তুলেছেন শিক্ষকদের একাংশও। তাঁরা আলোচনার মাধ্যমে অচলাবস্থা কাটানো এবং হস্টেলের পরিষেবা পুরোপুরি চালু করার পক্ষে সওয়াল করেছেন। উপাচার্য জানিয়েছেন, শিক্ষকেরা পড়ুয়াদের সঙ্গে কথা বলছেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে বাইরের চলচ্চিত্র উৎসবে এসআরএফটিআইয়ের প্রতিনিধিত্ব স্থগিত রাখার প্রস্তাবও এসেছে তাঁদের তরফে।

এই সংঘাতের সূত্রপাত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে। ২৭ সেপ্টেম্বর এবং ৪ অক্টোবর আরএসএস-ঘনিষ্ঠ সংগঠনের সদস্যদের বিরুদ্ধে পড়ুয়াদের উপর হামলার অভিযোগ ওঠে। তার পর থেকেই নিরাপত্তার দাবি এবং প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে আন্দোলন চলছে। ১২ অক্টোবর থেকে উপাচার্যের দফতরের বাইরে অবস্থান করছেন পড়ুয়ারা। তাঁদের বক্তব্য, হামলার জবাবদিহি চেয়ে শুরু হওয়া আন্দোলনের মুখে এখন তাঁদেরই নজরদারির বিষয় করে তোলা হচ্ছে।