গানের মঞ্চ থেকে মন্ত্রিসভা, সেখান থেকে পুলিশি হেফাজত। ইন্দ্রনীল সেনের জনজীবনের গতিপথ এখন এই তিন ছবিতে ধরা পড়ছে। দুর্গাপুজোর আগাম মণ্ডপদর্শনের পাস বিক্রিতে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে ২৮ অক্টোবর তাঁকে গ্রেফতার করেছে কলকাতা পুলিশ। পরদিন আদালত জামিনের আবেদন খারিজ করে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছে। একসময়ের ক্ষমতাবান শিল্পী-মন্ত্রী এখন তদন্তের মুখোমুখি।

নব্বইয়ের দশকে বাংলা গানের পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন ইন্দ্রনীল। আধুনিক গান, রবীন্দ্রসংগীত, লোকগান—বিভিন্ন ধারায় তাঁর শ্রোতা তৈরি হয়েছিল। অথচ পড়াশোনার বিষয় ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। নিউ আলিপোর মাল্টিপারপাস স্কুলের পরে চেন্নাইয়ের একটি প্রতিষ্ঠান থেকে ১৯৮৬ সালে বিমান রক্ষণাবেক্ষণ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিপ্লোমা করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত পরিচিতি এনে দেয় সংগীতই।

বাম আমলে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত ইন্দ্রনীল ২০১১ সালের পালাবদলের পরে তৃণমূলের দিকে আসেন। ২০১৬ সালে চন্দননগর থেকে বিধায়ক হয়ে তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের প্রতিমন্ত্রী হন। ২০২১-এ ফের জেতেন; পর্যটনের দায়িত্বও পান। সরকারি অনুষ্ঠানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তাঁকে গান গাইতে দেখা যেত। শিল্পী পরিচয়ের পাশে ক্রমে বড় হয়ে ওঠে প্রশাসনিক ক্ষমতার পরিচয়।

সেই উত্থানে ধাক্কা লাগে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে। চন্দননগরে বিজেপির দীপাঞ্জন কুমার গুহের কাছে ১৩,৪৪১ ভোটে হেরে যান ইন্দ্রনীল। নির্বাচনী হলফনামায় তাঁর ঘোষিত সম্পত্তির পরিমাণ ছিল ১০ কোটি ৮০ লক্ষ টাকা। রাজ্যে সরকার বদলের পরে মাসআর্ট সোসাইটিকে ঘিরে তদন্ত তাঁর সংকট আরও বাড়ায়।

মামলার কেন্দ্রে দুর্গাপুজোর আগে বিশেষ দর্শনের আয়োজন। অভিযোগ, ইউনেসকোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক যোগসূত্র থাকার দাবি করে মাসআর্ট দামি পাস বিক্রি করেছিল। ইন্দ্রনীল ও তাঁর স্ত্রী মধুছন্দা-সহ সংগঠনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হয়। অভিযোগকারীদের বক্তব্য, সর্বসাধারণের উৎসবকে বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত দর্শকদের জন্য বাণিজ্যিক ব্যবস্থায় পরিণত করা হয়েছিল। দামি পাস কিনতে না-পারা মানুষ মণ্ডপে ঢুকতে বাধা পেয়েছিলেন বলেও তাঁদের অভিযোগ। এক্সপ্রেস জানিয়েছে, কলকাতার ২৬টি পুজোমণ্ডপের এই বিশেষ দর্শনের পাসের দাম ছিল ১,৮০০ থেকে ১২,০০০ টাকা। অভিযোগে বলা হয়েছে, চার দিন সাধারণ দর্শকদের প্রবেশ আটকে রেখে ওই আয়োজন চলেছিল।

জুন মাসেই এই মামলায় আগাম জামিন চেয়ে হাই কোর্টে গিয়েছিলেন দম্পতি। অভিযোগকারীরা আরও প্রশ্ন তোলেন, সংগৃহীত অর্থ পুজো কমিটি, শিল্পী ও কারিগরদের সাহায্যে ব্যবহারের দাবি করা হলেও তার হিসাব কোথায়? তাঁদের অভিযোগ, সেই দাবির সমর্থনে আর্থিক বিবরণী, ব্যালান্সশিট বা নিরীক্ষার নথি প্রকাশ করা হয়নি। পুলিশ বিশ্বাসভঙ্গ, প্রতারণা, জালিয়াতি এবং অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের অভিযোগে মামলা করে।

এর পরে তদন্তে নামে ইডিও। ২৮ অক্টোবর সল্টলেকের সিজিও কমপ্লেক্সে কয়েক ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর ইন্দ্রনীলকে লালবাজারে নিয়ে যায় কলকাতা পুলিশ। টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইডির প্রাথমিক হিসাবে অভিযুক্ত আর্থিক অনিয়মের অঙ্ক ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকা হতে পারে। এটি তদন্তকারীদের প্রাথমিক অনুমান; আদালতে প্রমাণিত দুর্নীতির অঙ্ক নয়।

আদালতে সরকারি আইনজীবীর দাবি, আগের সরকারের মন্ত্রী থাকাকালীন এই অনিয়মে সরাসরি যুক্ত ছিলেন ইন্দ্রনীল। তাঁর আইনজীবী অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তিনি নির্দোষ এবং মামলাটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ১৫ অক্টোবর হাই কোর্ট তাঁর আগাম জামিনের আবেদন খারিজ করেছিল। ফলে ভোটে পরাজয়ের পরে আইনি লড়াইও কঠিন হয়েছে প্রাক্তন মন্ত্রীর।

গ্রেফতারিকে সামনে রেখে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকেও অভিযোগের আঙুল তুলেছেন। তাঁর দাবি, ইন্দ্রনীল একা এই অর্থের সুবিধাভোগী ছিলেন না। সেই রাজনৈতিক অভিযোগও আদালতে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে শিল্পী থেকে ক্ষমতাবান প্রশাসক হয়ে ওঠার যে যাত্রা একসময় ইন্দ্রনীলের সাফল্যের কাহিনি ছিল, আজ তার কেন্দ্রে অর্থের হিসাব ও জবাবদিহির প্রশ্ন। জনপ্রিয় কণ্ঠস্বরের খ্যাতি সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে না। উত্তর দিতে হবে নথি, তদন্ত এবং বিচারপ্রক্রিয়াকে।