বাড়ির সামনে পুলিশ পাহারা। গ্রামে টহল দিচ্ছেন পুলিশকর্মী ও সিভিক ভলান্টিয়াররা। তবু আতঙ্ক কাটছে না পশ্চিম মেদিনীপুরের তিনটি খ্রিস্টান পরিবারের। অভিযোগ, মারধর, শ্লীলতাহানি এবং জোর করে ‘শুদ্ধিকরণ’-এর পরেও হুমকি চলছে। তাঁদের আশঙ্কা, পুলিশ চলে গেলে নিরাপত্তা দেবে কে? ৩০ অক্টোবরের সূত্র অনুযায়ী, অভিযুক্তদের এখনও কেউ গ্রেপ্তার হয়নি। পরিবারগুলির আরও অভিযোগ, গ্রামের অন্য বাসিন্দারা তাঁদের একঘরে করে দিয়েছেন; ফলে চারপাশে পরিচিত মানুষ থাকলেও তাঁরা কার্যত বিচ্ছিন্ন।
ঘটনাস্থল চন্দ্রকোনা থানা এলাকার একটি গ্রাম। অভিযোগ, ১৮ অক্টোবর বিকেলে কয়েকজন নারী-পুরুষ একটি পরিবারের বাড়িতে ঢুকে স্বামী-স্ত্রীকে টেনে বার করে মারধর করে। চল্লিশ বছরের ওই মহিলার পোশাক ছিঁড়ে দেওয়া হয়। প্রকাশ্যে তাঁর গায়ে জল ঢেলে বেল ও তুলসীপাতা চিবোতে বাধ্য করা হয়। হামলাকারীরা এই অপমানজনক আচরণকেই ‘শুদ্ধিকরণ’ বলে দাবি করে। পরিবারের অভিযোগ, নিজেদের বিশ্বাস ছেড়ে অন্য ধর্মের আচার মানতে বাধ্য করাই ছিল হামলাকারীদের উদ্দেশ্য।
আক্রান্তরা জানিয়েছেন, নাবালিকারাও রেহাই পায়নি। এক কিশোরীকে গলা টিপে মারার চেষ্টা এবং আরেকজনকে ধর্ষণের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। খ্রিস্টধর্ম ত্যাগ না করলে বাড়িতে আগুন দিয়ে পরিবারের সদস্যদের পুড়িয়ে মারার ভয় দেখানো হয় বলেও তাঁদের দাবি। একটি বাড়ি থেকে ধর্মীয় গ্রন্থ বাইবেল নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
পরদিন, ১৯ অক্টোবর, ফের আসে ওই দল। অভিযোগ, পুলিশে খবর দেওয়ায় তারা ক্ষুব্ধ ছিল। পরিবারের সদস্যদের পাশের গ্রামের দুর্গামণ্ডপে নিয়ে গিয়ে ইচ্ছার বিরুদ্ধে অঞ্জলি দিতে বাধ্য করা হয়। ২০ অক্টোবর পরিবারের পুরুষদের ফের হুমকি দেওয়া হয়। আতঙ্কে ঘরবন্দি হয়ে পড়েন সকলে। নিরাপত্তার জন্য তিন নাবালিকাকে আত্মীয়ের বাড়িতে পাঠানো হয়। ওই দিনই তেরোজনের নাম উল্লেখ করে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করা হয়।
পরিবারগুলির দাবি, এই নির্যাতনের শুরু গত বছর। স্বেচ্ছায় খ্রিস্টধর্ম গ্রহণের পর থেকেই কয়েকজন আত্মীয় ও প্রতিবেশী তাঁদের ওপর চাপ দিতে থাকেন। গত দুর্গাপুজোর সময়েও হয়রানির অভিযোগ পুলিশকে জানানো হয়েছিল। পুলিশ গ্রামে এলেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে তাঁদের অভিযোগ। নিজেদের বাড়িতে শান্তিতে ধর্মাচরণ করতে চেয়েও তাঁরা বারবার বাধার মুখে পড়েছেন। তাঁরা জানিয়েছেন, ধর্ম বদলানোর সিদ্ধান্ত ছিল সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত; অন্য ধর্মের প্রতি তাঁদের শ্রদ্ধা রয়েছে। কিন্তু সেই ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের জন্যই বারবার জবাবদিহি করতে হচ্ছে, সহ্য করতে হচ্ছে অপমান এবং ভয় দেখানো।
আক্রান্ত ও কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী দ্য ওয়্যারকে জানিয়েছেন, হামলাকারীদের কয়েকজন বজরং দলের সদস্য হিসেবে পরিচয় দিয়েছিল। তাঁদের অভিযোগ, রাজ্যে নতুন সরকার আসার প্রসঙ্গ তুলে খ্রিস্টধর্ম ছাড়ানোর হুমকি দেওয়া হয়। এই পরিচয় ও অভিযোগ তদন্তসাপেক্ষ। স্থানীয় এক প্রাথমিক শিক্ষক জানিয়েছেন, বহু দশক ধরে গ্রামে এই ধরনের হিংসা দেখা যায়নি। কৃষিকাজ এবং তামার গয়না তৈরি এখানকার মানুষের জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
চন্দ্রকোনা থানায় ভারতীয় ন্যায় সংহিতার লুটপাট, খুনের চেষ্টা, অপরাধমূলক ভীতি প্রদর্শন ও নারীর শ্লীলতাহানি সংক্রান্ত ধারায় মামলা হয়েছে। জেলা পুলিশ সুপার পাপিয়া সুলতানা জানিয়েছেন, পরিবারগুলি নিরাপত্তাহীনতার কথা বলায় পুলিশ পিকেট বসানো হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত এবং তদন্ত চলছে। তবে পুলিশি উপস্থিতির মধ্যেও পরিবারগুলির স্বাভাবিক জীবনে ফেরা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে, এক গ্রামবাসী মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, শুধু মৌখিকভাবে সতর্ক করা হয়েছিল। তবে পরিবারগুলির ধর্মান্তরণ এবং হিন্দুদের ধর্মীয় উৎসবের দিনে আমিষ রান্না নিয়ে আপত্তির কথা তিনি স্বীকার করেছেন।
এই পরিস্থিতির সবচেয়ে গভীর ছাপ পড়েছে শিশু-কিশোরীদের মনে। আক্রান্ত এক মায়ের উদ্বেগ, মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী মেয়ে আতঙ্কে টিউশনেও যাচ্ছে না। ছুটির পরে স্কুলে ফিরবে কীভাবে? তাঁর পরিবারের কাছে এখন সবচেয়ে জরুরি নিজের বাড়িতে নিরাপদে থাকা এবং ভয় ছাড়া নিজের ধর্ম পালন করা।
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
মন্তব্য করতে আপনার বাংলাস্ফিয়ার অ্যাকাউন্টে লগইন করুন। সদস্যতা কেনার প্রয়োজন নেই।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।