গোহত্যার বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারির পাশাপাশি হিন্দু শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দেওয়ার আশ্বাস দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জে সরকারি অনুষ্ঠান ও জনসভায় তাঁর ঘোষণা, বাংলাদেশ থেকে আসা যোগ্য শরণার্থীদের সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন বা সিএএ অনুযায়ী নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। অন্যদিকে, যাঁদের তিনি অনুপ্রবেশকারী বলে চিহ্নিত করছেন, তাঁদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর কথা বলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। একই সফরে রায়গঞ্জে এইমস প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব কেন্দ্রকে পাঠানোর কথাও জানান তিনি।
গোরক্ষার প্রসঙ্গে শুভেন্দু বলেন, গোমাতার গায়ে হাত দেওয়া বা ক্ষতি করা চলবে না। এমন ঘটনা ঘটলে ‘আমার চেয়ে খারাপ কেউ হবে না’ বলে সতর্ক করেন তিনি। সীমান্তবর্তী জেলায় প্রশাসনিক কর্মসূচির মঞ্চ থেকেই গোহত্যা ও সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে তাঁর সরকারের কঠোর অবস্থান তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী।
সিএএ নিয়ে শুভেন্দুর বক্তব্য, উত্তর দিনাজপুরে প্রায় ন’হাজার আবেদন জমা পড়েছে। তাঁর দাবি, আবেদনকারীদের বাংলাদেশে হিন্দু হওয়ার কারণে জামাতের লোকজন ঘরছাড়া করেছে। এই আবেদনের শুনানি আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে শেষ করতে জেলাশাসককে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। নাগরিকত্বের আবেদন নিষ্পত্তিতে প্রশাসনিক তৎপরতা বাড়ানোর কথাও বলেন। ফলে ঘোষিত সময়সীমাটি মূলত শুনানি শেষ করার জন্য।
মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ যোগ্য আবেদনকারীদের নাগরিকত্বের শংসাপত্র দেওয়ার দায়িত্ব তাঁকে দিয়েছেন। যাঁরা সিএএ-র শর্ত পূরণ করেন, অথচ এখনও আবেদন করেননি, তাঁদের দ্রুত আবেদন জানানোর আহ্বান জানান শুভেন্দু। তফসিলি জাতিভুক্ত যোগ্য ব্যক্তিদের জাতিগত শংসাপত্র দেওয়া এবং আগামী জানুয়ারিতে প্রকাশিতব্য ভোটার তালিকায় যোগ্যদের নাম অন্তর্ভুক্ত করার কথাও বলেন তিনি।
শরণার্থী ও অনুপ্রবেশকারীর মধ্যে পার্থক্য টেনে শুভেন্দু বলেন, জীবন ও ধর্ম রক্ষার জন্য বাংলাদেশ ছেড়ে আসা মানুষদের অনুপ্রবেশকারী বলা যায় না। উত্তর দিনাজপুরের সংশোধনাগারে বন্দি বাংলাদেশি হিন্দু শরণার্থীদের মুক্তির জন্য দ্রুত আইনি পদক্ষেপ করার নির্দেশ দেন তিনি। সভায় উপস্থিত আইনমন্ত্রী বিরাজ বিশ্বাসকে বিষয়টি দেখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, এই মানুষদের নাগরিকত্ব পাওয়ার যোগ্যতা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে হবে।
অন্যদিকে, অনুপ্রবেশকারীদের প্রথমে নির্দিষ্ট আটককেন্দ্রে রেখে পরে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর কথা বলেন তিনি। সীমান্তে পুলিশ ও বিএসএফের মধ্যে সমন্বয় এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সহযোগিতার উপর জোর দেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, সীমান্ত এলাকায় বেআইনি মাদ্রাসা গড়ে উঠতে দেওয়া হবে না; দেশবিরোধী কার্যকলাপও বরদাস্ত করবে না সরকার।
বিচ্ছিন্নতাবাদী কার্যকলাপের অভিযোগ তুলে শুভেন্দু বলেন, সীমান্তে এই ধরনের গোষ্ঠীর প্রভাব বাড়তে দেওয়া যাবে না। বক্তব্যে তিনি ‘টুকড়ে টুকড়ে গ্যাং’-এর মতো রাজনৈতিক অভিধাও ব্যবহার করেন। নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব এবং ধর্মীয় পরিচয়—এই তিন বিষয়ই রায়গঞ্জের বক্তৃতায় বারবার উঠে আসে।
স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর ক্ষেত্রে রায়গঞ্জে সর্বভারতীয় আয়ুর্বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান বা এইমস গড়ার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে প্রস্তাব পাঠানোর কথা জানিয়েছেন শুভেন্দু। রাজ্যে কল্যাণীর এইমস ইতিমধ্যেই চালু রয়েছে। রায়গঞ্জের ক্ষেত্রে তাঁর ঘোষণা প্রস্তাব পাঠানোর; প্রকল্প অনুমোদন বা নির্মাণ শুরুর ঘোষণা নয়। পাশাপাশি জলপাইগুড়িতে পূর্ণাঙ্গ ক্যানসার হাসপাতাল তৈরির পরিকল্পনাও তুলে ধরেন তিনি।
শিক্ষাক্ষেত্রে হেমতাবাদের কলেজে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে কলা বিভাগ চালু এবং কালিয়াগঞ্জে মহিলা কলেজের পরিকল্পনার কথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী। রায়গঞ্জের সঙ্গে বারসইয়ের সড়ক যোগাযোগ এবং কিশনগঞ্জ বাইপাসের বিস্তারিত প্রকল্প রিপোর্ট তৈরির বিষয়ও তাঁর বক্তব্যে ছিল। আদিবাসী ও ‘সনাতনী’দের জমি দখলের অভিযোগ খতিয়ে দেখে জমি উদ্ধারের নির্দেশ দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।
এ ছাড়া আগামী দু’বছরে রাজ্যের পুরনো মঠ-মন্দির সংস্কার ও তীর্থপর্যটনের পরিকাঠামো উন্নয়নে এক হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের কথা ঘোষণা করেন শুভেন্দু। নাগরিকত্বের শুনানির নির্দিষ্ট সময়সীমার সঙ্গে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও যোগাযোগের একাধিক পরিকল্পনা মিলিয়ে রায়গঞ্জ সফরে প্রশাসনিক কর্মসূচি তুলে ধরেন তিনি।
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
মন্তব্য করতে আপনার বাংলাস্ফিয়ার অ্যাকাউন্টে লগইন করুন। সদস্যতা কেনার প্রয়োজন নেই।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।