কলকাতার সত্যজিৎ রায় ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউটে চলমান ছাত্র আন্দোলনের মধ্যে অভিভাবকদের উদ্বেগের যথাযথ সুরাহার আশ্বাস দিলেন রেজিস্ট্রার দীপক কুমার। শুক্রবার তিনি জানান, কয়েকজন পড়ুয়ার অভিভাবকের ইমেল বৃহস্পতিবার প্রতিষ্ঠানের কাছে পৌঁছেছে। সেখানে উত্থাপিত বিষয়গুলি যথাসময়ে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে কী পদক্ষেপ করা হবে, কিংবা কবে আলোচনা হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট ঘোষণা করা হয়নি।
এদিকে উপাচার্য সন্তোষ আজমেরার দপ্তরের বাইরে পড়ুয়াদের অবস্থান চলছেই। ক্যাম্পাসে দু’দফা হিংসার অভিযোগের তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তার দাবিতে ১২ অক্টোবর থেকে এই অবস্থান শুরু হয়েছে। তার আগে ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে পঠনপাঠন বয়কট করছেন আন্দোলনকারীরা।
উপাচার্যকে পাঠানো চিঠিতে ৩০ জন অভিভাবক হস্টেল খালি করার নির্দেশ ও পড়ুয়াদের বহিষ্কারের বিরোধিতা করেছেন। সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়েও তাঁরা উদ্বেগ জানিয়েছেন।
বিক্ষোভের সূত্রপাত ২৭ সেপ্টেম্বর, প্রতিষ্ঠানের ভিতরে পড়ুয়াদের সঙ্গে অখিল ভারতীয় গ্রাহক পঞ্চায়েতের সদস্যদের সংঘর্ষের পরে। ৪ অক্টোবর বঙ্গীয় হিন্দু জাগরণ মঞ্চের মিছিলের সময় ছাত্রছাত্রীদের লক্ষ্য করে পাথর ও ইট ছোড়ার অভিযোগ ওঠে। দ্বিতীয় ঘটনার পরে আন্দোলন আরও তীব্র হয়। সেপ্টেম্বরের ঘটনার তদন্তে রাজ্য সরকার বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করেছে। প্রতিষ্ঠানও নিজস্ব তথ্যানুসন্ধান শুরু করেছে।
কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, বাইরের শক্তির মদতে পড়ুয়াদের একাংশ আন্দোলনকে রাজনৈতিক চেহারা দিয়ে শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত করছেন। ছাত্রদের পাল্টা অভিযোগ, হামলার জবাবদিহি নিশ্চিত করার পরিবর্তে তাঁদের বিরুদ্ধেই শাস্তিমূলক পদক্ষেপ করা হচ্ছে।
এর আগে অভিভাবকদের কাছে ইমেল পাঠিয়ে আন্দোলনরত সন্তানদের বাড়ি নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়েছিল কর্তৃপক্ষ। নিয়মিত শিক্ষাক্রম ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত স্থগিত রাখার কথা জানিয়ে এই আবেদন করা হয়। ছাত্র সংসদের প্রতিনিধি সুদীপ চক্রবর্তী সেই পদক্ষেপকে আন্দোলন প্রত্যাহারের জন্য চাপ তৈরির চেষ্টা বলে অভিযোগ করেন। তাঁর বক্তব্য, বহু পড়ুয়ার বাড়ি পশ্চিমবঙ্গের বাইরে; তা সত্ত্বেও তাঁরা নিরাপত্তা ও দায়বদ্ধতার দাবিতে ক্যাম্পাসে থেকে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। হস্টেল ছাড়ার নির্দেশও তাঁরা মানেননি।
হস্টেল ও মেস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ক্যাম্পাসে থেকে যাওয়া ছাত্রছাত্রীদের দৈনন্দিন সমস্যাও বেড়েছে। আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন, পানীয় জলের সরবরাহে সমস্যা হচ্ছে, প্রশাসনিক ভবনের শৌচাগার ব্যবহারের সুযোগও সীমিত হয়েছে। বাইরে থেকে খাবার কিনে ভাগ করে খেতে হচ্ছে অনেককে; কেউ ঘরে রান্না করছেন। তাঁদের দাবি, খাবার সরবরাহকারীকে ভিতরে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না বলে মূল ফটক পর্যন্ত যেতে হয়, যেখানে নিরাপত্তা নিয়ে তাঁদের উদ্বেগ রয়েছে। উৎসবের মরসুমে দূরের বাড়িতে ফেরার টিকিটের বাড়তি খরচও সমস্যার কারণ বলে জানিয়েছেন পড়ুয়ারা।
ছয় ছাত্রকে দু’টি সেমেস্টারের জন্য বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েও বিরোধ রয়েছে। শাস্তিপ্রাপ্ত পড়ুয়াদের দাবি, সিদ্ধান্তের যথাযথ কারণ এবং তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ জানানো হয়নি। তাঁরা প্রশাসনের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করেছেন এবং সংশ্লিষ্ট বৈঠকের কার্যবিবরণী চেয়েছেন। আন্দোলনের সমর্থনে সরব হয়েছেন অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ। চলচ্চিত্র পরিচালক পায়েল কাপাডিয়াও পড়ুয়াদের সঙ্গে অনলাইন আলোচনায় অংশ নিয়েছেন।
অন্যদিকে, ২৭ অক্টোবর রাতে ক্যাম্পাসে পুলিশ প্রবেশ করায় নতুন বিতর্ক তৈরি হয়। সেদিন পড়ুয়ারা মশাল মিছিল করেছিলেন। কর্তৃপক্ষের দাবি, অনুমতি ছাড়া আবাসিক এলাকা দিয়ে মিছিল এবং স্লোগানের ফলে আতঙ্ক ছড়িয়েছিল। ছাত্র সংসদের বক্তব্য, শান্তিপূর্ণ মিছিল সন্ধ্যাতেই শেষ হয়ে যায়, অথচ পুলিশ আসে অনেক পরে। পুলিশ মোতায়েনের লিখিত ব্যাখ্যা চাইতে গেলে উপাচার্য কথা বলতে চাননি বলেও অভিযোগ তাদের। ক্যাম্পাসে থাকা পুলিশকর্মীদের অধিকাংশের পরিচয়চিহ্ন ছিল না বলে অভিযোগ তুলে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আন্দোলনকারীরা।
নজরদারি নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন পড়ুয়ারা। তাঁদের অভিযোগ, এক নিরাপত্তারক্ষী মোবাইল লুকিয়ে ছাত্রছাত্রীদের ভিডিও তুলছিলেন; পুলিশকর্মীরাও ছবি ও ভিডিও সংগ্রহ করছেন। কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, ক্ষয়ক্ষতি ঠেকাতে এবং বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রকাশ্য স্থানের গতিবিধি নথিবদ্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পড়ুয়াদের বাধায় সিসিটিভি বসানো যায়নি বলেও দাবি প্রশাসনের। রেজিস্ট্রার জানিয়েছেন, পুলিশ মোতায়েনের প্রয়োজনীয়তা পর্যায়ক্রমে পর্যালোচনা করা হবে। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, সম্মতি ছাড়া এই নজরদারি তাঁদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, মর্যাদা ও নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলছে। তাঁরা অবিলম্বে এমন নজরদারি বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।
পড়ুয়ারা বলছেন, তাঁরা সকলেই ক্লাসে ফিরতে চান। কিন্তু তার আগে নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া জরুরি। কয়েকজন এখনও হুমকি পাচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেছেন। আন্দোলন, বাড়তি খরচ এবং অনিশ্চয়তার কারণে মানসিক চাপও বাড়ছে তাঁদের। নিরাপত্তার দাবির সঙ্গে তাই স্বাভাবিক শিক্ষাজীবনে ফেরার প্রশ্নটিও জড়িয়ে রয়েছে। অভিভাবকদের উদ্বেগের পটভূমিতেও রয়েছে দীর্ঘদিনের এই অচলাবস্থা। আপাতত কাটেনি সেই অনিশ্চয়তা।
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
মন্তব্য করতে আপনার বাংলাস্ফিয়ার অ্যাকাউন্টে লগইন করুন। সদস্যতা কেনার প্রয়োজন নেই।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।