কালীপুজোর প্রস্তুতিতে উত্তর কলকাতার জোড়াসাঁকোর শিবকৃষ্ণ দাঁ বাড়ি হয়ে উঠেছে পুরোহিতদের পাঠশালা। বাড়ির উঠোনে শুক্রবার শুরু হয়েছে তিন দিনের প্রশিক্ষণ শিবির। নেতৃত্বে সর্বভারতীয় প্রাচ্যবিদ্যা অ্যাকাডেমির অধ্যক্ষ জয়ন্ত কুশারী। মন্ত্রের শুদ্ধ উচ্চারণ, পুজোর বিধিবিধান এবং পুরোহিতের আচরণ—সবই রয়েছে প্রশিক্ষণের আলোচ্যসূচিতে। উপাসনার সময় কী ধরনের পোশাক ও শৃঙ্খলা মানা প্রয়োজন, সেই শিক্ষাও দেওয়া হচ্ছে।

শিবিরে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে পুজোর সময় মনঃসংযোগ। কুশারী জানিয়েছেন, আচার চলাকালীন পুরোহিতদের মোবাইল ব্যবহার কিংবা ধূমপানের জন্য বিরতি নেওয়া থেকে বিরত থাকতে বলা হচ্ছে। তাঁর ব্যাখ্যায়, দুর্গাপুজোর সঙ্গে কালীপুজোর পদ্ধতিগত পার্থক্য রয়েছে। কালীপুজোয় তান্ত্রিক বিধানের গুরুত্ব বুঝে উপাসনা পরিচালনা করতে হয়।

কুশারীর বক্তব্য অনুযায়ী, নিশাপুজো রাত ন’টা নাগাদ অথবা মহানিশায়, অর্থাৎ মধ্যরাতের কাছাকাছি শুরু হতে পারে। অভিজ্ঞ পুরোহিতের সম্পূর্ণ পুজো করতে সাধারণত চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা লাগে। তুলনায় অনভিজ্ঞ কারও ছয় থেকে সাত ঘণ্টাও লাগতে পারে। তাই প্রস্তুতি ও পদ্ধতিগত দক্ষতার উপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

অবসরপ্রাপ্ত ইঞ্জিনিয়ার শ্রীনিবাস চক্রবর্তী দুর্গাপুজো ও কালীপুজো আয়োজন করেন। তাঁর কাছে এই কর্মশালার আকর্ষণ কুশারীর ব্যাখ্যা দেওয়ার ধরন। আচার শেখার পাশাপাশি তার পিছনের যুক্তি বুঝতে পারার সুযোগই তাঁকে বারবার টেনে আনে।

দাঁ বাড়িতে এই ধরনের প্রশিক্ষণের পুরনো নজিরও রয়েছে। ২০২১ সালের অক্টোবরে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল, কলকাতা ও বিভিন্ন জেলা থেকে পুরোহিতেরা কালীপুজোর মন্ত্র এবং আচারের খুঁটিনাটি শিখতে এখানে এসেছিলেন। সেই তিন দিনের কর্মশালায় যোগ দিয়েছিলেন পঞ্চাশ জন। তাঁরা শহরের বিভিন্ন সর্বজনীন কালীপুজোয় পৌরোহিত্য করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

সেই সময় কুশারী ব্যাখ্যা করেছিলেন, সব পুজোর শ্লোক ও পদ্ধতি এক নয়। দুর্গাপুজোর নিয়ম সরাসরি কালীপুজোয় প্রয়োগ করলে চলবে না। কোন দেবীর উপাসনায় কোন বিধান প্রযোজ্য, তা স্পষ্টভাবে বোঝানোই ছিল প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য। সদ্য পৌরোহিত্য শুরু করা অংশগ্রহণকারীদের মন্ত্রপাঠের দক্ষতা বাড়ানোর ব্যবস্থাও ছিল। শহরে কালীপুজোর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে পুরোহিতের চাহিদা বৃদ্ধির কথাও উঠে এসেছিল ওই প্রতিবেদনে। ফলে কাজের সুযোগের পাশাপাশি সঠিক প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তাও সামনে আসে। সেই সময় অতিমারির কারণে স্বাস্থ্যবিধির বিষয়টিও প্রশিক্ষণে জায়গা পেয়েছিল। অংশগ্রহণকারী প্রায় সব পুরোহিতের টিকাকরণ হয়ে গিয়েছিল বলে জানিয়েছিলেন কুশারী। পুজোয় আসা মানুষকে মাস্ক পরতে এবং শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখতে বলার দায়িত্বও তাঁদের নিতে হবে বলে জানানো হয়েছিল।

জয়ন্ত কুশারীর প্রশিক্ষণ উদ্যোগের আরেকটি দিক দেখা যায় দুর্গাপুজোর কর্মশালায়। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, শোভাবাজার রাজবাড়িতে সেই কর্মশালার চল্লিশতম পর্বের আয়োজনের কথা জানানো হয়েছিল। সেখানে পুরোহিতদের পাশাপাশি পুজোর উদ্যোক্তা ও সাধারণ মানুষের আগ্রহের কথাও জানিয়েছিলেন তিনি। তাঁর পর্যবেক্ষণ ছিল, অনেক ক্ষেত্রে আচার ও মন্ত্রের তাৎপর্য বোঝার আগ্রহ সাধারণ মানুষের মধ্যে পুরোহিতদের চেয়েও বেশি।

সেই প্রশিক্ষণে পুরোহিত এবং ভক্ত—উভয়ের আচরণ, উপাসনাস্থলের পরিচ্ছন্নতা এবং পুজোর অর্থ বোঝার বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়। মহাস্নান, মহাপুজো, বলিদান ও হোমের মতো বিভিন্ন পর্বের আলোচনা এবং মন্ত্রের সঠিক উচ্চারণও ছিল পাঠের অংশ। কুশারী বিভিন্ন অঞ্চলের দুর্গাপুজোর রীতির সূক্ষ্ম পার্থক্যের কথাও বলেছিলেন। তাঁর ব্যাখ্যায়, বাংলার সঙ্গে অন্য অঞ্চলের দক্ষিণা দেওয়ার সময়েও তফাত রয়েছে। বাংলায় নবমীর পুজোর পরে দক্ষিণা দেওয়ার রীতি থাকলেও অন্য দুই ধারায় তা দশমীতে দেওয়া হয় বলে জানান তিনি।

এই পটভূমিতে জোড়াসাঁকোর কালীপুজোর শিবিরকে শুধু মন্ত্র ঝালিয়ে নেওয়ার আয়োজন হিসেবে দেখলে তার উদ্দেশ্যের অনেকটাই বাদ পড়ে। এখানে ধর্মীয় অনুষ্ঠান পরিচালনার দক্ষতার সঙ্গে আচরণ, সময়জ্ঞান এবং রীতির ব্যাখ্যাও গুরুত্ব পাচ্ছে। পুরোহিত ও উদ্যোক্তার শেখার আগ্রহ একই পরিসরে জায়গা করে নিচ্ছে। পুরনো বাড়ির উঠোন সেই সম্মিলিত শিক্ষারই একটি মিলনস্থল। উৎসবের প্রস্তুতির মধ্যে এভাবেই যুক্ত হচ্ছে উপাসনার পদ্ধতি বুঝে নেওয়ার চেষ্টা।