প্রাক্তন মন্ত্রী ও সঙ্গীতশিল্পী ইন্দ্রনীল সেনের গ্রেফতার ঘিরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের দুই নেতার প্রতিক্রিয়ায় স্পষ্ট ফারাক দেখা গেল। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এই ঘটনাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগে বিজেপির বিরুদ্ধে আক্রমণের হাতিয়ার করেছেন। অন্যদিকে, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রশ্ন তুলেছেন ইন্দ্রনীলের নিজের আচরণ, ক্ষমতার ব্যবহার এবং দলীয় সহকর্মীদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে। একই গ্রেফতারকে কেন্দ্র করে একদিকে বিরোধীদের নিশানা করার অভিযোগ, অন্যদিকে দলের ভিতরে আত্মসমালোচনার সুর সামনে এসেছে।

ইন্দ্রনীলের পাশে দাঁড়িয়ে অভিষেকের অভিযোগ, যাঁরা বিবেক বিক্রি না করে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন, তাঁদেরই জেলে পাঠানো হচ্ছে। অথচ গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত কেউ বিজেপির পতাকা হাতে নিলে তাঁর সব অপরাধ ক্ষমা হয়ে যাচ্ছে। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর, দুর্নীতির তদন্তের নামে বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের বেছে বেছে আক্রমণ করা হচ্ছে।

কল্যাণের প্রতিক্রিয়া ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। শ্রীরামপুরের সাংসদ বলেন, “শেষ ৫ বছরে ও কোনও কথাই শুনতো না।” তাঁর দাবি, ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে ইন্দ্রনীলের একাধিক আচরণ তাঁদের আঘাত দিয়েছে। এক বিশিষ্ট গায়িকাকে অনুষ্ঠান থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনাও উল্লেখ করেন তিনি। কল্যাণ জানান, বিষয়টি জানার পরে মমতার সঙ্গে কথা বলে ওই শিল্পীকে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করেছিলেন।

দলের দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে কল্যাণের বক্তব্য, সমস্ত দায় শুধু পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের উপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না; অন্যদের ভূমিকাও রয়েছে। তাঁর মতে, মন্ত্রী থেকে পঞ্চায়েত, পুরসভা কিংবা জেলা পরিষদে যাঁরা ক্ষমতা পেয়েছিলেন, অভিযোগ মূলত তাঁদের বিরুদ্ধেই উঠছে। এর ফলে কষ্ট পাচ্ছেন সেই অসংখ্য কর্মী, যাঁরা সততার সঙ্গে রাজনীতি করেছেন এবং মমতাকে দেখে দলকে ভালোবেসেছেন।

কল্যাণ আরও জানান, নব্বইয়ের দশকে তিনি ইন্দ্রনীলের গানের অনুরাগী ছিলেন। কিন্তু প্রথমে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এবং পরে মমতার বিশেষ ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠার ঘটনায় তাঁর মনোভাব বদলায়। কোনও রাজনৈতিক দলেরই পাঁচ থেকে দশ বছরের বেশি ক্ষমতায় থাকা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ইন্দ্রনীলকে বুধবার, ২৮ অক্টোবর, গ্রেফতার করে কলকাতা পুলিশ। তার আগে সল্টলেকের সিজিও কমপ্লেক্সে ইডির দফতরে তাঁকে প্রায় চার ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সেখান থেকে পুলিশ তাঁকে লালবাজারে নিয়ে যায়। বৃহস্পতিবার আদালত তাঁর জামিনের আবেদন খারিজ করে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত পুলিশি হেফাজতের নির্দেশ দেয়। প্রাক্তন মন্ত্রীর আইনজীবীর দাবি, অভিযোগ মিথ্যা এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

মামলার কেন্দ্রে রয়েছে দুর্গাপুজোর আগাম দর্শন এবং বিশেষ প্রবেশাধিকার দেওয়ার পাস বিক্রিতে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ। তদন্তকারীদের দাবি, মাসআর্ট সোসাইটি ইউনেস্কোর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক রয়েছে বলে প্রচার করে দর্শকদের কাছ থেকে টাকা তুলেছিল। ইন্দ্রনীল ও তাঁর স্ত্রী মধুছন্দার সঙ্গে ওই সংস্থার যোগ রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

জয়দীপ মুখোপাধ্যায়ের অভিযোগের ভিত্তিতে বৌবাজার থানায় মামলা হয়। অভিযোগ, ইউনেস্কোর নাম ও পরিচিতি ব্যবহার করে পুজো দেখার জন্য উচ্চমূল্যের পাস বিক্রি করা হলেও সংস্থাটির সঙ্গে ইউনেস্কোর এমন কোনও বাণিজ্যিক চুক্তি ছিল না। কলকাতা পুলিশের পাশাপাশি ইডিও অর্থের লেনদেন খতিয়ে দেখছে। ইন্দ্রনীল এবং তাঁর স্ত্রী আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

অন্যদিকে, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্য, দীর্ঘদিন তদন্তের পরে তথ্যপ্রমাণ পেয়েই পুলিশ ব্যবস্থা নিয়েছে। তিনি মমতার সঙ্গে ইন্দ্রনীলের ঘনিষ্ঠতার প্রসঙ্গ তুলে আরও বড় নামের দিকে তদন্ত এগোতে পারে বলে দাবি করেছেন। তবে তাঁর রাজনৈতিক অভিযোগ এবং তদন্তে প্রমাণিত তথ্য এক বিষয় নয়; মামলায় অভিযোগের বিচার এখনও বাকি।

আপাতত এই ঘটনায় মমতা শিবিরের প্রতিক্রিয়ার দুটি পৃথক ধারা স্পষ্ট। অভিষেক সামনে রাখছেন বিজেপির বিরুদ্ধে প্রতিহিংসার অভিযোগ। কল্যাণ সামনে আনছেন ক্ষমতাবান নেতাদের আচরণ এবং দলের সাধারণ কর্মীদের ক্ষোভের কথা। ফলে এই মুহূর্তে রাজ্যে ইন্দ্রনীলের গ্রেফতারকে ঘিরে বিতর্কে তদন্তের পাশাপাশি তৃণমূলের অতীত শাসন ও অভ্যন্তরীণ দায়বদ্ধতার প্রশ্নও উঠে এসেছে।