পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর চলাকালীন ‘যৌক্তিক অসংগতি’র কারণে চিহ্নিত হওয়ার পরে বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের ছাড়পত্র পেয়েছিলেন ১৬ লক্ষের কিছু বেশি ভোটার। কিন্তু তাঁদের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভারতের নির্বাচন কমিশন আপিল করায় তাঁরা ফের প্রশ্নের মুখে পড়েছেন।

এপ্রিলের বিধানসভা নির্বাচনে এই ভোটারদের ভোট দেওয়ার সুযোগ ছিল। কারণ, নির্বাচনের আগে প্রকাশিত সম্পূরক ভোটার তালিকায় তাঁদের নাম ছিল। কিন্তু এই ১৬ লক্ষ ১০ হাজার ভোটারের নাম অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে যে আধিকারিকেরা আপিল করেছিলেন, জনপ্রতিনিধিত্ব আইন অনুযায়ী তাঁদের সেই ক্ষমতা আদৌ ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ওই আইন অনুযায়ী, ভোটার তালিকা সংক্রান্ত স্বীকৃত কর্তৃপক্ষ হলেন মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক বা সিইও, জেলা নির্বাচনী আধিকারিক বা ডিইও, নির্বাচক নিবন্ধন আধিকারিক বা ইআরও এবং সহকারী নির্বাচক নিবন্ধন আধিকারিক বা এইআরও।

২৬ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্টে দাখিল করা হলফনামায় নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ওই আপিলগুলির বিষয়টি আগে কমিশনের নজরে আনা হয়নি। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দপ্তর থেকে ২২ অক্টোবর, ২০২৬ তারিখের একটি চিঠি পাওয়া যায়। তাতে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট আধিকারিকেরা ওই আইনের অধীনে কর্তৃপক্ষ হিসেবে নিজেদের ক্ষমতাবলে আপিলগুলি করেছিলেন। কমিশন আরও জানায়, ‘মাননীয় সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী ওই আধিকারিকদের আপিল করার ক্ষমতা ছিল।’

হলফনামায় কমিশন স্বীকার করেছে, আইন অনুযায়ী ভোটার তালিকার ক্ষেত্রে স্বীকৃত কর্তৃপক্ষ কেবল ‘সিইও/ডিইও/ইআরও/এইআরও’। কিন্তু ভোটারদের নাম অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে আপিলগুলি যে এই ক্ষমতাপ্রাপ্ত আধিকারিকেরাই করেছিলেন, তা স্পষ্ট করে বলা হয়নি। তাঁদের শুধু ‘পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দপ্তরের আধিকারিক’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের ছাড়পত্র পাওয়া ভোটারদের বিরুদ্ধে কেন আপিল করা হল—নির্বাচন কমিশনার এস এস সান্ধু এবং বিবেক জোশী তাঁদের ফাইলের নোটে যে প্রশ্নগুলি তুলেছিলেন, এটি তার অন্যতম। পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলগুলি এই আপিল বাতিল করার পাশাপাশি গোটা ঘটনায় বিচারবিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টে পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর মামলার অন্যতম আবেদনকারী, কংগ্রেস নেতা প্রসেনজিৎ বসুর বক্তব্য, আপিল ট্রাইবুনালে ভোটারদের নাম অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে আবেদনকারী এই ‘মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দপ্তরের আধিকারিকদের’ ওই আইনের অধীনে এমন ক্ষমতা থাকতে পারে না। তাঁর যুক্তি, ২০২৬ সালের এপ্রিলে সুপ্রিম কোর্ট এই ট্রাইবুনালগুলি গঠন করেছিল, অথচ জনপ্রতিনিধিত্ব আইনে কোনও ট্রাইবুনালের কথাই নেই।

বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিককে দেওয়া একটি স্মারকলিপিতে কংগ্রেস দাবি করেছে, নির্বাচন কমিশনের দায়ের করা এই আপিলগুলি জনপ্রতিনিধিত্ব আইন লঙ্ঘন করেছে, তাই সেগুলি বাতিল করতে হবে। কোন তারিখে, কখন এবং কী প্রক্রিয়ায় আপিলগুলি দায়ের হয়েছিল, তা প্রকাশ্যে আনতে তথ্যপ্রযুক্তিগত নিরীক্ষা বা আইটি অডিটেরও দাবি জানিয়েছে দলটি।

সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে এসআইআর চলাকালীন এই আপিল ট্রাইবুনালগুলি গঠিত হয়। শীর্ষ আদালতের নির্দেশে কলকাতা হাই কোর্ট যে তালিকা পাঠিয়েছিল, সেখান থেকে বেছে নেওয়া বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের প্রায় ৬০ লক্ষ ‘সন্দেহজনক ও বিচারাধীন’ বিষয় নিষ্পত্তির দায়িত্ব দেওয়া হয়। ১০ মার্চ সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছিল, ওই আধিকারিকদের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানানোর সুযোগ দিতে একটি পৃথক আপিল কর্তৃপক্ষ গঠন করতে হবে।

প্রায় ৬০ লক্ষ ‘সন্দেহজনক’ বিষয়ের মধ্যে ৭০০ জন বিচারবিভাগীয় আধিকারিক ৩২,৭৭,৩৬০ জন ভোটারকে ছাড়পত্র দেন এবং তাঁদের নাম ভোটার তালিকায় ফিরিয়ে দেন। বাকি ২৭ লক্ষ ২৩ হাজার জনের নাম অন্তর্ভুক্তির দাবি খারিজ হয়। তাঁদের মধ্যে ২২ লক্ষ জন ট্রাইবুনালে আপিল করেন।

নির্বাচন কমিশন ২১ মার্চ পশ্চিমবঙ্গের জন্য আপিল ট্রাইবুনালগুলি গঠন করে। সেগুলি কাজ শুরু করে ১৩ এপ্রিল নাগাদ। ১৬ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দেয়, যাঁদের আপিল মঞ্জুর হবে, তাঁদের নাম সম্পূরক তালিকার মাধ্যমে ভোটার তালিকায় যুক্ত করতে হবে। এর কয়েক দিন পরেই, ২৩ এপ্রিল বিধানসভা নির্বাচন শুরু হয়। জানা গিয়েছে, তত দিনে মাত্র ১৩৬ জনের নাম অন্তর্ভুক্তির ছাড়পত্র মিলেছিল।

একই সময়ে, বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের নির্দেশে ভোটার তালিকায় নাম ফিরে পাওয়া ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে ট্রাইবুনালগুলিতে একযোগে ১৬,১০,৩১১টি আপিল দায়ের করা হয়। ফলে সেখানে বিচারাধীন মোট মামলার সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৮ লক্ষের কিছু বেশি।

দুই দফার বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে ভোট পড়েছিল রেকর্ড ৯২.৪৭ শতাংশ—স্বাধীনতার পর থেকে রাজ্যে সর্বোচ্চ।