বাংলাস্ফিয়ারঃ দেবী দুর্গার মাথার ঘন কালো চুল তৈরি হয় মুসলিম কারিগরদের হাতে। হাওড়ার জগৎবল্লভপুরের পার্বতীপুরে এই কাজ বহু পরিবারের জীবিকা, আবার বাংলার সম্প্রীতিরও এক পরিচিত ছবি। পাটের আঁশকে প্রতিমার চুলে রূপ দেওয়ার কাজে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে যুক্ত রয়েছেন তাঁরা। তবে উৎসবের সাজে তাঁদের অবদান যতখানি, পরিশ্রমের আর্থিক মূল্য ততটা মিলছে না।
পার্বতীপুরের তৈরি চুল পৌঁছয় কলকাতার কুমোরটুলি এবং বিভিন্ন এলাকার প্রতিমাশিল্পীদের কাছে। মাটির প্রতিমার সাজ সম্পূর্ণ করতে এই চুলের প্রয়োজন হয়। মুসলিম পরিবারগুলির পাশাপাশি হিন্দু কারিগরেরাও কাজ করেন এই শিল্পে। ধর্মীয় পরিচয় এখানে পেশাগত সহযোগিতার বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। বরং একই কাজকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে দীর্ঘদিনের পারস্পরিক নির্ভরতা।
কাজটি সময়সাপেক্ষ। পাট বাছাই, রং করা, শুকোনো, জট ছাড়ানো এবং প্রয়োজনমতো সাজানো—প্রতিটি ধাপেই লাগে যত্ন ও অভিজ্ঞতা। সাধারণ পাটের আঁশ কারিগরের হাতে ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে দেবীর কেশরাশি। প্রতিমার আকার ও সাজের সঙ্গে মিলিয়ে সেই চুল ব্যবহার করেন মৃৎশিল্পীরা। মণ্ডপে দর্শনার্থীরা চূড়ান্ত সৌন্দর্য দেখেন; তার পিছনের শ্রম অনেকটাই আড়ালে থাকে।
এই উৎপাদনে পরিবারের মহিলাদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পাট পরিষ্কার করা, আঁচড়ানো, আলাদা করা এবং কাঠিতে জড়ানোর মতো কাজে তাঁরা অংশ নেন। সাহাপিডিয়ার একটি আলোকচিত্রভিত্তিক বিবরণে ঘরোয়া কর্মশালা ও উঠোনজুড়ে এই কাজের ছবি উঠে এসেছে। অর্থাৎ, প্রতিমার চুল তৈরির সঙ্গে একটি পরিবারের একাধিক সদস্যের শ্রম জড়িয়ে থাকে।
কিন্তু ব্যস্ততা বাড়লেই যে আয় সমান অনুপাতে বাড়ে, তা নয়। কাঁচামালের দাম এবং উৎপাদনের খরচ বৃদ্ধির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ২০২২ সালে প্রকাশিত লাইফগেটের প্রতিবেদনে কারিগরেরা জানিয়েছিলেন, প্রতিমাশিল্পীরা বাজেটের সীমাবদ্ধতার কথা বলে বাড়তি দাম দিতে চান না। ফলে বেশি পরিশ্রম করেও লাভের অঙ্ক সন্তোষজনক হয় না। বিকল্প জীবিকার অভাব পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে।
কাজের পরিবেশও সহজ নয়। বড় পাত্রে পাট রং করার সময় চুল্লির তাপ ও ধোঁয়া সহ্য করতে হয়। শুকনো আঁশ আঁচড়ানোর সময় ওড়ে ধুলো। সাহাপিডিয়ার বিবরণে যথাযথ সুরক্ষাসামগ্রীর অভাব এবং রাসায়নিক বর্জ্য নিষ্কাশনের সমস্যাও উঠে এসেছে। ফলে রোজগারের অনিশ্চয়তার পাশাপাশি কাজের পরিবেশের ঝুঁকিও বহন করতে হয় কারিগরদের।
আবহাওয়ার উপর নির্ভরতা এই শিল্পের আরেক দুর্বলতা। রং করা আঁশ ভালোভাবে শুকোতে রোদ প্রয়োজন। টানা বৃষ্টিতে কাজ আটকে যায়, সময়মতো মাল পাঠানো কঠিন হয়। ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানিয়েছিলেন, মূলধনের অভাবে ছোট উৎপাদকেরা আগাম বেশি মাল তৈরি রাখতে পারেন না। তাই উৎসবের মুখে বৃষ্টি হলে তাঁদের ক্ষতি বেশি হয়।
এর সঙ্গে রয়েছে যন্ত্রে তৈরি চুলের প্রতিযোগিতা। তুলনায় সস্তা পণ্য বাজারে এলে হাতে কাজ করা কারিগরদের উপর চাপ বাড়ে। আবার এই ব্যবসার বড় অংশ উৎসবনির্ভর। দুর্গাপুজো ছাড়াও অন্য দেবদেবীর প্রতিমার জন্য চুলের চাহিদা থাকলেও বছরের সব সময়ে কাজের পরিমাণ এক থাকে না। তাই কয়েক মাসের ব্যস্ততা দিয়ে সারা বছরের নিশ্চিন্ত জীবিকা নিশ্চিত করা কঠিন।
পার্বতীপুরের কাহিনি তাই সম্প্রীতির পাশাপাশি শ্রমের মূল্যের প্রশ্নও সামনে আনে। প্রতিমাশিল্পী ও চুল তৈরির কারিগর—উভয়ের কাজ মিলিয়েই সম্পূর্ণ হয় দেবীমূর্তি। অথচ উৎসবের আলোয় যাঁদের হাতের কাজ দৃশ্যমান, তাঁদের সংসারের টানাপড়েন ততটা চোখে পড়ে না। এই ব্যবধান বুঝতে হলে কারিগরদের আয় ও উৎপাদনের বাস্তব সমস্যাগুলিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার প্রশ্নে ন্যায্য দাম, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং আবহাওয়ার বাধা কাটানোর ব্যবস্থা জরুরি। মুসলিম কারিগরের হাতে দেবীর কেশসজ্জা বাংলার সহাবস্থানের সুন্দর নিদর্শন। সেই সৌন্দর্যের স্বীকৃতি তখনই অর্থবহ হবে, যখন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত পরিবারগুলির জীবিকাও মর্যাদা পাবে। কারণ এই শিল্পের ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত নির্ভর করছে সেই মানুষগুলির উপর, যাঁরা প্রতিদিন পাটের আঁশে দেবীর রূপ ফুটিয়ে তোলেন।