বাংলাস্ফিয়ার: দুর্গাপুজোর আগে খাবার ও পুজোর কেনাকাটায় দোকানমালিকের ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে এনে বিতর্কে হিন্দু জাগরণ মঞ্চ। উত্তরবঙ্গের প্রধান বাণিজ্যিক শহর শিলিগুড়ির বিভিন্ন এলাকায় সংগঠনের পোস্টারে হিন্দুদের মালিকানাধীন দোকান থেকে বিরিয়ানি ও পুজোর সামগ্রী কেনার আহ্বান জানানো হয়েছে। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের সহযোগী এই সংগঠনের প্রচার ঘিরে রাজনৈতিক মহল এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন।

পোস্টারের বক্তব্য, বিরিয়ানি খাওয়ায় আপত্তি নেই, তবে তা কিনতে হবে হিন্দুদের দোকান থেকে। একইভাবে পুজোর সামগ্রী কেনার ক্ষেত্রেও হিন্দু ব্যবসায়ীদের বেছে নিতে বলা হয়েছে। উৎসবের আগে এমন প্রচারের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই সংগঠনের তরফে দাবি করা হয়েছে, কাউকে কোনও নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে না; এটি হিন্দু সমাজের কাছে একটি আবেদন।

প্রচারে যুক্ত হিন্দু জাগরণ মঞ্চের সদস্য অভিষেক দাসের বক্তব্য, হিন্দুদের পরিচালিত ব্যবসাকে সমর্থন করলে স্থানীয় অর্থনীতিতেও তার প্রভাব পড়বে। তাঁর যুক্তি, এই বার্তাকে বাধ্যতামূলক বিধান হিসেবে দেখা উচিত নয়। তবে সমালোচকদের আপত্তি মূলত দোকান বাছাইয়ের মাপকাঠি নিয়ে: খাবারের গুণমান বা ক্রেতার পছন্দের জায়গায় এখানে ব্যবসায়ীর ধর্মীয় পরিচয়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সিপিএমের প্রবীণ নেতা, রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী অশোক ভট্টাচার্য এই প্রচারের বিরুদ্ধে পুলিশি পদক্ষেপ দাবি করেছেন। তাঁর মতে, ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক দেশে এমন পোস্টার দেওয়া অপরাধ। প্রশাসনের কাছে তাঁর দাবি, পোস্টার সরানোর পাশাপাশি এই সাম্প্রদায়িক প্রচারের পিছনে থাকা ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করতে হবে। শিলিগুড়ির প্রাক্তন মেয়রের এই বক্তব্যে বিষয়টি ঘিরে রাজনৈতিক বিরোধ আরও স্পষ্ট হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের বক্তব্য, বাঙালি দীর্ঘদিন ধরেই বিরিয়ানি খেয়ে এসেছে; যিনি রান্না করছেন, তাঁর ধর্ম জানতে চাওয়া খাদ্যসংস্কৃতির অংশ ছিল না। তাঁদের প্রশ্ন, পছন্দের দোকান থেকে খাবার কেনার স্বাভাবিক অভ্যাসে এখন ধর্মের পরিচয় টেনে আনা হবে কেন? এই প্রচার বাংলার সামাজিক সহাবস্থান ও মুক্তচিন্তার পরম্পরার বিরোধী বলেও তাঁরা মনে করেন।

সমালোচকেরা দুর্গাপুজোর প্রস্তুতিতে মুসলিম কারিগরদের অবদানের কথাও মনে করিয়েছেন। শোলার সাজসহ বিভিন্ন পুজোসামগ্রী তৈরির সঙ্গে বহু মুসলিম শিল্পী যুক্ত। ফলে পুজোর বাজারকে ধর্মের ভিত্তিতে আলাদা করার আহ্বান উৎসবের সঙ্গে যুক্ত সেই পারস্পরিক নির্ভরতার প্রশ্নও সামনে আনছে। বাম দলগুলির বক্তব্য, সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকার রয়েছে; জীবিকা নির্ধারণের মাপকাঠি ধর্ম হতে পারে না।

বঙ্গবার্তার প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিলিগুড়ির প্রাক্তন মেয়র গৌতম দেবও পোস্টারগুলির নিন্দা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের সঙ্গে এই ধরনের প্রচার সঙ্গতিপূর্ণ নয়। সাধারণ মানুষই এর বিচার করবেন বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। অশোক ভট্টাচার্যও শহরে বিভিন্ন ভাষাভাষী ও সম্প্রদায়ের মানুষের একসঙ্গে ব্যবসা করার ঐতিহ্যের কথা তুলে ধরে এই প্রচারের বিরোধিতা করেছেন।

একই প্রতিবেদনে অভিষেক দাসের আরও বক্তব্য পাওয়া যায়। তিনি দাবি করেছেন, তাঁদের প্রচারে মাদক বর্জন ও অনলাইন প্রতারণা সম্পর্কে সচেতনতার বিষয়ও রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, সেখান থেকে নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের দোকানসংক্রান্ত বার্তাটিকে আলাদা করে তুলে বিতর্ক তৈরি করা হচ্ছে। তবে কেনাকাটার ক্ষেত্রে ধর্মকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বক্তব্য নিয়ে আপত্তি তাতে দূর হয়নি।

অন্যদিকে, বিজেপির এক নেতার দাবি, হিন্দু জাগরণ মঞ্চ স্বতন্ত্র সংগঠন এবং এই প্রচারের সঙ্গে দলের কোনও সম্পর্ক নেই। ফলে প্রচার থেকে দূরত্বের বক্তব্যও এসেছে। পোস্টার নিয়ে আপত্তি জানানো বাসিন্দাদের মূল বক্তব্য, কে কোথা থেকে খাবার ও সামগ্রী কিনবেন, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা ক্রেতারই থাকা উচিত।

সব মিলিয়ে, পুজোর মুখে শিলিগুড়ির বিতর্ক এখন কেনাকাটার স্বাধীনতা, ব্যবসায়ীদের জীবিকা এবং সামাজিক সম্প্রীতির প্রশ্নে কেন্দ্রীভূত। উৎসবের বাজার ঘিরে এই পরিস্থিতিতে, সংগঠন নিজেদের অবস্থানকে আবেদন বললেও বিরোধীরা ধর্মের ভিত্তিতে বাজার ভাগ করার প্রচেষ্টা হিসেবেই দেখছেন। উৎসবের আনন্দের মধ্যে এই বিভাজনমূলক বার্তার জায়গা কতটা, সেই প্রশ্নই শহরের জনপরিসরে নতুনভাবে সামনে  এল।