বাংলাস্ফিয়ারঃ মহালয়ার সন্ধ্যায় ইডেন গার্ডেন্সের অনুষ্ঠান থেকে রাজ্যে নতুন ১২,৪০০টি দুর্গাপুজোর অনুমোদন দেওয়ার কথা ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শনিবার, ১০ অক্টোবর তিনি জানান, ২০২৫ সালে রাজ্যে প্রায় ৪৫ হাজার পুজোর অনুমতি ছিল। নতুন আবেদনগুলি অনুমোদিত হওয়ায় এ বার সেই সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৫৭,৪০০ হয়েছে। নতুন পুজো কমিটিগুলির জন্য সরকারি অনুদানের ব্যবস্থাও করা হয়েছে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী।
পুজোর অনুমতি প্রসঙ্গে পূর্ববর্তী তৃণমূল সরকারকে আক্রমণ করেন শুভেন্দু। তাঁর অভিযোগ, আগে দুর্গাপুজো আয়োজনের অনুমতি পেতে উদ্যোক্তাদের কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হতে হত। এ বছর কাউকে সেই পথে যেতে হয়েছে বলে তাঁর জানা নেই। নিজের সরকারকে ‘রাষ্ট্রবাদী’ ও ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার বলে উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, বাংলার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং সনাতনী পরম্পরাকে সম্মান জানিয়েই নতুন আবেদনকারীদের ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে।
রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর এটাই প্রথম দুর্গাপুজো। তাই উৎসবের মঞ্চে অনুমোদনের এই পরিসংখ্যান তুলে ধরা রাজনৈতিক ভাবেও তাৎপর্যপূর্ণ। পূর্ববর্তী সরকারের সঙ্গে নিজের প্রশাসনের পার্থক্য বোঝাতে পুজোর অনুমতি এবং ধর্মীয় আচার পালনের প্রসঙ্গ সামনে এনেছেন শুভেন্দু। তাঁর বক্তব্যে উৎসবের আয়োজনের পাশাপাশি সরকারের সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গিও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, রবিবার থেকে পুজো কমিটিগুলিকে এক লক্ষ টাকা করে সরকারি অনুদান দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে। তবে দুশোর বেশি কমিটি সেই অর্থ নিতে চায়নি। তাদের মধ্যে কলকাতার বড় পুজোর উদ্যোক্তারাও রয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই কমিটিগুলি গ্রামের পুজো এবং মহিলাদের পরিচালিত পুজোকে সাহায্য দেওয়ার কথা বলেছে। অনুদান গ্রহণের সিদ্ধান্ত উদ্যোক্তাদের উপরেই ছেড়েছে সরকার।
উৎসবের সূচনার দিন নির্বাচন নিয়েও সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন শুভেন্দু। তিনি জানান, পিতৃপক্ষে পুজোর উদ্বোধন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল রাজ্য মন্ত্রিসভা। সেই সিদ্ধান্ত মেনেই দেবীপক্ষের সূচনায় আয়োজন করা হয়েছে এই অনুষ্ঠানের। দুর্গাপুজোর সাংস্কৃতিক দিকের পাশাপাশি শাস্ত্র, পঞ্জিকা এবং প্রচলিত ধর্মীয় আচারকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন তিনি। ফলে উদ্বোধনের সময়সূচিকেও সরকারের ঘোষিত সাংস্কৃতিক অবস্থানের সঙ্গে যুক্ত করেন মুখ্যমন্ত্রী।
এ দিনের অনুষ্ঠানের আগে রেড রোড থেকে ইডেনের দিকে পদযাত্রায় অংশ নেন শুভেন্দু। তাঁর সঙ্গে ছিলেন মন্ত্রিসভার সদস্য, চলচ্চিত্র ও ক্রীড়াজগতের প্রতিনিধিরা। ইডেনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যপাল আর এন রবি, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার এবং বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। মহালয়ার এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে নতুন সরকারের আমলে দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিক সূচনা হল।
ইডেনের সাংস্কৃতিক পর্বে ছিল ছৌনাচ, বাউলগান এবং ঢাকের বাদ্য। শান, অন্তরা মিত্র, শান্তনু মৈত্র ও কৌশিকী চক্রবর্তীর মতো শিল্পীরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন। আকাশে ড্রোন প্রদর্শনীর মাধ্যমে দুর্গার আগমনকে তুলে ধরা হয়। ক্রিকেটের পরিচিত মাঠ এ দিন হয়ে ওঠে আগমনীর উৎসবস্থল। সঙ্গীত, লোকসংস্কৃতি এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রদর্শনীকে একই অনুষ্ঠানে মিলিয়ে দেওয়াই ছিল আয়োজনের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।
শুভেন্দু জানান, রবিবার থেকে ষষ্ঠী পর্যন্ত তিনি রাজ্যের শতাধিক পুজো উদ্বোধন করবেন। অন্য মন্ত্রী ও বিধায়কেরাও বিভিন্ন পুজোর উদ্বোধনে অংশ নেবেন। কলকাতার বাইরেও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেন তিনি। দুর্গাপুর, বিষ্ণুপুর, শিলিগুড়ি, কোচবিহার, মালদহ, বহরমপুর এবং দিঘায় বিশেষ অনুষ্ঠান হবে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। অর্থাৎ, ইডেনের আয়োজনের পর উৎসবের সরকারি কর্মসূচি চলবে বিভিন্ন জেলাতেও।
উৎসবের মধ্যে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পুলিশের নির্দেশ মেনে চলার আবেদন জানান মুখ্যমন্ত্রী। পাশাপাশি ২৪ অক্টোবরের মধ্যে প্রতিমা বিসর্জন শেষ করার অনুরোধ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, ঘাটগুলিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেরা প্রতিমা, সেরা পুজো, পরিবেশ সচেতনতা এবং শুচিতার মতো বিভিন্ন বিভাগে পুজো কমিটিগুলিকে স্বীকৃতি দেবে তথ্য ও সংস্কৃতি দফতর। নতুন অনুমোদন ও অনুদানের ঘোষণার সঙ্গে এ ভাবেই উদ্বোধন থেকে বিসর্জন পর্যন্ত উৎসব পরিচালনার রূপরেখাও তুলে ধরলেন শুভেন্দু।