বাংলাস্ফিয়ারঃ চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজোর মণ্ডপে হুড়োহুড়ি ও প্রাণহানির ঘটনায় আরও এক ঘোষককে গ্রেফতার করল কলকাতা পুলিশ। ধৃতের নাম কুশল মজুমদার। শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, গিরিশ পার্ক এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেফতার করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে। অভিযোগ, মণ্ডপ ভেঙে পড়ছে বলে মাইকে ঘোষণা করে দর্শনার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছিলেন তিনি। এই নিয়ে ঘটনায় গ্রেফতারের সংখ্যা বেড়ে হল নয়।

এর আগের দিন নদিয়া থেকে ধরা পড়েন পুজো কমিটির কোষাধ্যক্ষ সঞ্জীব রাহা ওরফে সেন্টু। পুলিশের দাবি, ১৭ অক্টোবরের ঘটনার পর থেকেই তিনি আত্মগোপন করেছিলেন। পরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে ব্যবহৃত একাধিক ফোন নম্বরের সূত্র ধরে তাঁর সন্ধান মেলে। মাইকে কেন এমন ঘোষণা করা হয়েছিল এবং কারও নির্দেশে তা করা হয়েছিল কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা।

কুশল পেশায় অ্যাপ-ক্যাব চালক। প্রায় কুড়ি বছর ধরে এই পুজোর সঙ্গে যুক্ত বলে জানিয়েছেন তিনি। গ্রেফতারের আগে প্রকাশিত একটি ফেসবুক ভিডিয়োয় তাঁর দাবি, মাইকে ঘোষণা করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু কোনও অসৎ উদ্দেশ্য ছিল না। নিয়মিত ঘোষককে সামনে না পেয়ে পরিস্থিতির চাপে তাঁকে মাইক ধরতে হয়েছিল। তাঁর অভিযোগ, ঘটনার দায় চাপিয়ে তাঁকে ফাঁসানোর চেষ্টা হচ্ছে।

তাঁর ফেসবুক পাতায় প্রকাশিত হাতে লেখা বিবৃতিতে কুশল দাবি করেছেন, পুজো কমিটির সম্পাদকের ছেলে তাঁকে জানিয়েছিলেন যে মণ্ডপের পিছনের অংশ ভেঙে পড়েছে। সেই খবরের ভিত্তিতেই তিনি দর্শনার্থীদের ঢুকতে নিষেধ করেন। তাঁর আরও দাবি, এক পুলিশকর্মী মাইকে ঘোষণা করতে বলেছিলেন। এই বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। ফলে তাঁর ব্যাখ্যাকে তদন্তে প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে দেখার সুযোগ এখনও নেই।

কুশল আরও অভিযোগ করেছেন, ঘটনার পরে এলাকার কয়েকজন তাঁকে আত্মগোপন করে থাকতে বলেছিলেন। পরে থানায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিলে তাঁকে ২৭ অক্টোবরের আগে সেখানে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে তিনি পুলিশের কাছে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন বলে ভিডিয়োয় জানিয়েছেন। এই অভিযোগও তাঁর নিজের বক্তব্য; নির্দেশদাতাদের ভূমিকা সম্পর্কে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশিত হয়নি।

গত ১৭ অক্টোবর, সপ্তমীর সন্ধ্যায় চোরবাগানের মণ্ডপে বিপুল ভিড়ের মধ্যে বিপর্যয় ঘটে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মৃত্যু হয় ১৯ জনের, আহত হন আরও অনেকে। বৃষ্টির কারণে ভিতরের দর্শনার্থীদের একাংশ বাইরে বেরোতে চাইছিলেন না, অথচ বাইরে অপেক্ষমাণ মানুষ ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করছিলেন। সেই পরিস্থিতিতে মণ্ডপ ভেঙে পড়ার ঘোষণা আতঙ্ক বাড়িয়েছিল বলে পুলিশের প্রাথমিক ধারণা।

তদন্তে সংগৃহীত ভিডিয়ো এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণে বেরোনোর পথের কাছে প্রবল ঠেলাঠেলি ও মানুষের পড়ে যাওয়ার ছবি উঠে এসেছে। মাইকের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ছিল বহির্গমন পথের পাশে, ক্লাবের সদস্য ও বিশেষ অতিথিদের বসার জায়গায়। ফলে ঘোষণার ভাষা, সময় এবং তখনকার ভিড়ের গতিপ্রকৃতির সম্পর্ক তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ঘোষণার পাশাপাশি সামগ্রিক ব্যবস্থাপনাতেও কোথায় ত্রুটি ছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

অন্যদিকে, তদন্তকারী বিশেষ দলের প্রধান, অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অনিন্দিতা রায় সরস্বতী, মণ্ডপ পরিদর্শন করে প্রবেশ ও বেরোনোর পথ অত্যন্ত সরু বলে জানিয়েছেন। আলোর স্বল্পতার কথাও বলেছেন তিনি। ঘটনার সময়ে জরুরি বহির্গমন পথ বন্ধ ছিল বলে পুলিশ তাঁকে জানিয়েছে। বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধানে তাই ঘোষকদের ভূমিকার পাশাপাশি এই ব্যবস্থাগত সমস্যাগুলিও সামনে এসেছে।

আদালতের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে গঠিত বিশেষ তদন্তকারী দলকে তিন মাসের মধ্যে অনুসন্ধানের ফল এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সুপারিশ রাজ্য সরকারের কাছে জমা দিতে হবে।

পুলিশ কমিশনার অজয়কুমার নন্দ জানিয়েছেন, পুলিশ ও আয়োজকদের সমন্বয়ে কোনও ঘাটতি ছিল কি না, বিশেষ তদন্তকারী দলের রিপোর্টে তা স্পষ্ট হবে। চার্জশিটে প্রত্যেক অভিযুক্তের ভূমিকা তুলে ধরা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি। আপাতত গ্রেফতার হওয়া ঘোষকদের বক্তব্য, প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ এবং ঘটনাস্থলের প্রমাণ মিলিয়েই দায় নির্ধারণের তদন্ত এগোচ্ছে।