বাংলাস্ফিয়ারঃ কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীনের দুর্গাপুজোয় পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যুর ঘটনার প্রধান কারণ মানুষের ভুল বলে মন্তব্য করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর নিহতদের দুই পরিবারের সঙ্গে দেখা করার পরে তিনি জানান, তদন্ত কমিটির সুপারিশ কার্যকর করবে রাজ্য সরকার। বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিটের রিপোর্ট বিধানসভায় পেশ করার পাশাপাশি সাংবাদিকদের দেওয়া হবে এবং সাধারণ মানুষের জন্যও প্রকাশ করা হবে।

এ দিন মানিকতলার বাগমারিতে শুভম সোনকর এবং শ্যামপুকুরে মিঠু মণ্ডলের বাড়িতে যান মুখ্যমন্ত্রী। শোকাহত পরিজনদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের সব রকম সাহায্যের আশ্বাস দেন। প্রতিবেশীদেরও পরিবারগুলির পাশে থাকার অনুরোধ জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য, এই কঠিন সময়ে স্বজনহারা মানুষ যেন নিজেদের একা মনে না করেন, সে জন্য মানসিক ও দৈনন্দিন সহায়তা প্রয়োজন।

শুভেন্দু জানান, তদন্তের দায়িত্বপ্রাপ্ত অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে পুলিশ সহযোগিতা করবে এবং সাক্ষীদের বক্তব্য গ্রহণ করা হবে। তিন মাসের মধ্যে রিপোর্ট জমা দেওয়ার কথা। মানুষের ভুলকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করলেও ঘটনার বিস্তারিত কারণ নির্ধারণের দায়িত্ব তদন্তকারীদের ওপরই রেখেছেন তিনি। ফলে মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যকে সিটের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য করার অবকাশ নেই।

চোরবাগানের বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধানে ছয় সদস্যের সিট গঠন করেছে রাজ্য সরকার। নেতৃত্বে রয়েছেন কলকাতা হাই কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অনিন্দিতা রায় সরস্বতী। দলে প্রশাসনের পদস্থ আধিকারিক, উচ্চপদস্থ পুলিশকর্তা এবং জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর প্রতিনিধিও রয়েছেন। কীভাবে ভিড়ের চাপ প্রাণঘাতী পরিস্থিতিতে পরিণত হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখবে এই দল। এই তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার ধারাবাহিকতা পুনর্গঠন করার দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে কমিটিকে।

তদন্তের আওতায় রয়েছে অতিরিক্ত জনসমাগম, প্রতিকূল আবহাওয়া, প্রবেশ ও প্রস্থানের ব্যবস্থাপনা, মণ্ডপের কাঠামোগত ত্রুটি এবং ভিড় নিয়ন্ত্রণে সম্ভাব্য ব্যর্থতা। প্রথমে কোথায় ও কখন ভিড়ের চাপ তৈরি হয়েছিল, দর্শনার্থীদের চলাচল কীভাবে বাধাগ্রস্ত হয়েছিল এবং মণ্ডপের নিরাপদ ধারণক্ষমতার তুলনায় কত বেশি মানুষ ঢুকেছিলেন, সেই প্রশ্নগুলির উত্তরও খোঁজার কথা তদন্তকারীদের।

নিহত ও আহতদের পরিবারকে দেওয়া সাহায্য, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও পরীক্ষা করবে সিট। ঘোষিত আর্থিক সহায়তা যথেষ্ট কি না, সেটিও বিবেচনার বিষয়। বিচারপতি সরস্বতী জানিয়েছেন, তিন মাস সময় অল্প হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তদন্ত শেষ করার চেষ্টা করতে হবে। কেন এই বিপর্যয় ঘটল এবং কার দায় ছিল, তা চিহ্নিত করাই লক্ষ্য।

এ দিকে আগামী বছরের দুর্গাপুজোর নিরাপত্তা প্রস্তুতি এখন থেকেই শুরু করতে চান মুখ্যমন্ত্রী। সোমবার, ২৬ অক্টোবর মিলনমেলায় প্রায় আট হাজার পুজো কমিটির প্রতিনিধির সঙ্গে তাঁর বৈঠক হওয়ার কথা। শুভেন্দু জানিয়েছেন, ওই আয়োজন কেবল বিজয়ার শুভেচ্ছা বিনিময়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না। চোরবাগানের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে দর্শনার্থীদের নিরাপত্তাকে পরিকল্পনার শুরু থেকেই গুরুত্ব দিতে বলবেন তিনি।

মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, তদন্তকারী দল নিরাপত্তা বিষয়ে যে সুপারিশ করবে, পুজো কমিটিগুলিকে তা অনুসরণ করতে হবে। ২০২৭ সালের আয়োজনের প্রস্তুতি যথেষ্ট আগে শুরু করার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। তদন্তে যাঁদের দায় প্রতিষ্ঠিত হবে, তাঁদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন শুভেন্দু। অপরাধ প্রমাণিত হলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

গত ১৭ অক্টোবর, মহাসপ্তমীর সন্ধ্যায় বৃষ্টির মধ্যে চোরবাগানের মণ্ডপে ভিড়ের চাপে ১৯ জনের মৃত্যু হয়, আহত হন অন্তত ২৫ জন। কয়েক মিনিটের মধ্যে এতগুলি প্রাণহানিকে অত্যন্ত বেদনাদায়ক বলেছেন মুখ্যমন্ত্রী।

চোরবাগানের ঘটনার পরে আগামী বছরের পুজোয় হাসপাতালের প্রস্তুতিতেও বদলের কথা জানিয়েছে সরকার। স্বাস্থ্যমন্ত্রী শরদ্বত মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন, পুজোর সময় স্বাস্থ্যকর্মীদের টানা ছুটি নেওয়ার প্রথা চলবে না। চিকিৎসক ও নার্সদের প্রয়োজন অনুযায়ী উপস্থিত থাকতে হবে। অন্যান্য কর্মীদের জন্য সপ্তমী থেকে দশমী পর্যন্ত দায়িত্বের তালিকা তৈরি হবে। উৎসবের ভিড়ে দুর্ঘটনা ঘটলে চিকিৎসা পরিষেবা সচল রাখাই এই প্রস্তুতির উদ্দেশ্য।