কয়েক জন প্রত্যক্ষদর্শী তত ক্ষণে সাংবাদিক ও ইউটিউবারদের কাছে বার কয়েক তাঁদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বলে ফেলেছেন। অন্যরা গুটিয়ে গিয়েছেন ক্লান্ত অবিশ্বাসের মধ্যে। এক জন আমাকে বললেন, “আপনারা সত্যিটা বলবেন না।” কথা বললে কিছু বদলাতে পারে—সেই সম্ভাবনাটুকুও যেন তিনি উড়িয়ে দিলেন।

মণ্ডপের প্রবেশপথের দিকে যাওয়ার রাস্তায় একটি তীক্ষ্ণ বাঁকের কাছে স্তূপ হয়ে পড়ে ছিল পরিত্যক্ত জুতো। সম্ভবত পদপিষ্ট হওয়ার ঘটনায় যাঁরা আটকে পড়েছিলেন, জুতোগুলি তাঁদেরই। এক টেলিভিশন সাংবাদিক ক্যামেরার সামনে বলতে বলতে বাংলার একটি জনপ্রিয় জুতোর ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপনের পঙ্‌ক্তি টেনে আনলেন—“পুজোয় চাই নতুন জুতো।” উৎসবের চাওয়া-পাওয়ার নিরীহ প্রকাশ হিসেবে পরিচিত বিজ্ঞাপনী কথাটি সে দিন ভয়াবহ এক নতুন অর্থ পেয়েছিল। উৎসবের একটি রাতের জন্য কেনা জুতো পড়ে ছিল এক মর্মান্তিক বিপর্যয়ের ঘটনাস্থলে।

সে রাতে চোরবাগানে এবং কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে বহু মানুষের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। আহত ও মৃতদের ওই হাসপাতালেই নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কথা বলেছিলাম হতাহতদের আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে, অন্য মণ্ডপ থেকে ফেরা দর্শনার্থীদের সঙ্গে এবং ঠিক কী ঘটেছিল, তা বোঝার চেষ্টা করছিলেন এমন মানুষের সঙ্গে। তাঁদের বিবরণে ফারাক ছিল—প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে যেমন সচরাচর থাকে। কিন্তু প্রায় সব কথোপকথনেই একটি অনুভূতি ফিরে ফিরে এসেছিল: “কলকাতায় এমন হচ্ছে, বিশ্বাস করতে পারছি না।”

খবরটা প্রথম শোনার পরে আমিও মনে মনে প্রায় একই কথা বলেছিলাম। স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া, অনেকটা প্রতিবর্ত ক্রিয়ার মতো। কিন্তু যত ভেবেছি, ততই মনে হয়েছে: এটা বিশ্বাস করতে আমাদের এত অসুবিধা হচ্ছে কেন?

বাইরের কারও চোখে দুর্গাপুজোর কলকাতাকে এমন একটি শহর বলেই মনে হওয়ার কথা, যেখানে যে কোনও মুহূর্তে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায় নামেন, অনেক সময় সারা রাত ধরেই। সরু গলিতে ভিড় আটকে যায়। মণ্ডপগুলিতে জনস্রোত এসে মেশে; সেগুলির জমকালো প্রবেশপথ আর চোখধাঁধানো শিল্পসজ্জা নিজেরাই এখন আলাদা আকর্ষণ। মানুষ ঠেলাঠেলি করেন, পথ ছাড়ার জন্য কথাবার্তা বলেন, অনুনয় করেন, কোনও ভাবে ফাঁক গলে এগিয়ে যান। ভিড় যেন অস্থির, নিরন্তর রূপ বদলানো এক জীবন্ত সত্তা হয়ে ওঠে। ব্যক্তির ইচ্ছার পাশাপাশি সমষ্টির তাড়নাও তার গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করে।

অথচ বছরের পর বছর এই শহর গণ-উৎসবের অসাধারণ আয়োজন চালিয়ে যেতে পেরেছে। নিখুঁত ভাবে নয়, কোনও অঘটন ছাড়াই নয়; কিন্তু এর মধ্যে এমন এক সাংগঠনিক শৃঙ্খলা রয়েছে, যা আপাত বিশৃঙ্খলার আড়ালে প্রায়ই চোখে পড়ে না।

কলকাতার পুজো যাঁরা চেনেন, তাঁরা জানেন, এই উন্মাদনার মধ্যেও একটি পদ্ধতি আছে। ভিড় সামলানোর একটি অলিখিত স্তরবিন্যাস রয়েছে। একই রকম টি-শার্ট পরা তরুণ স্বেচ্ছাসেবকেরা নিয়ন্ত্রণের প্রথম সারিতে থাকেন। বাঁশি বাজিয়ে, ইশারা করে তাঁরা মানুষকে পথ দেখান, প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করেন এবং কোথাও ভিড় আটকে যাওয়া ঠেকানোর চেষ্টা করেন। পুলিশকর্মীরা—কিছু দর্শনার্থী যাঁদের স্নেহ করে ‘পুলিশকাকু’ বলেন—জনস্রোতের গতিবিধির দিকে নজর রাখেন। কখন গেট বন্ধ করতে হবে বা প্রবেশে বিধিনিষেধ আরোপ করতে হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেন। তাঁদের পিছনে থাকেন উদ্যোক্তারা। শুধু চোখধাঁধানো আয়োজন করাই তাঁদের দায়িত্ব নয়; উত্তেজনা প্রশমিত করা, বিবাদ মেটানো এবং উৎসবের গোটা ব্যবস্থাকে সচল রাখার ভারও তাঁদের।

পেশাদার দক্ষতায় তৈরি ভিড়ের নিরাপত্তা-পরিকল্পনার বিকল্প এই ব্যবস্থা হতে পারে না। কিন্তু এটি একটি চেনা ব্যবস্থা, যা বহু বছরের অভিজ্ঞতা, স্থানীয় পরিস্থিতি সম্পর্কে জ্ঞান এবং সম্মিলিত চেষ্টায় গড়ে উঠেছে। এই ব্যবস্থা কার্যকর থাকার শর্ত হল, প্রত্যেকে নিজের ভূমিকা জানবেন, বিপদের লক্ষণ চিনতে পারবেন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আগেই ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা তাঁদের থাকবে।

চোরবাগানে যে সব বিবরণ শুনেছিলাম, তা এক উদ্বেগজনক সম্ভাবনার দিকে ইঙ্গিত করছিল: সবচেয়ে জরুরি মুহূর্তেই হয়তো এই ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল, অথবা যথেষ্ট কার্যকর ভাবে কাজ করছিল না।

শুধু অতিরিক্ত মানুষের উপস্থিতি দিয়ে পদপিষ্ট হওয়ার ঘটনার ব্যাখ্যা খুব কমই মেলে। ভিড়ের ঘনত্ব, বেরোনোর পথের সীমাবদ্ধতা, হঠাৎ মানুষের চলাচল, দুর্বল যোগাযোগ এবং সমন্বয়ের অভাব—সব মিলিয়ে জমাট ভিড় পরিণত হতে পারে ভয়াবহ বিপর্যয়ে। আসল প্রশ্ন শুধু কত মানুষ জড়ো হয়েছিলেন, তা নয়। যাঁদের উপর দায়িত্ব ছিল, তাঁরা ঝুঁকিগুলি বুঝেছিলেন কি না এবং সেই ঝুঁকি সামলানোর উপায় তাঁদের হাতে ছিল কি না—সেটাই নির্ণায়ক প্রশ্ন।