বাংলাস্ফিয়ারঃ ২০২১ সালে একটি প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ায় ছয় এসএসসি চাকরিপ্রার্থীর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া ফৌজদারি মামলা খারিজ করল কলকাতা হাই কোর্ট। আদালত জানিয়েছে, এফআইআরে উল্লিখিত অভিযোগ থেকে কোনও অপরাধের আবশ্যিক উপাদানই প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
৭ অক্টোবরের আদেশে আদালত বলেছে, “এফআইআরটি পড়লেই বোঝা যায়, যে-সব ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে, তার কোনওটির ক্ষেত্রেই অপরাধের প্রয়োজনীয় উপাদান উঠে আসেনি। আবেদনকারীদের বিরুদ্ধে প্রাথমিক ভাবেও কোনও অপরাধের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এ থেকে অনিবার্য ভাবে এই সিদ্ধান্তেই পৌঁছতে হয় যে, প্রতিবাদ করার জন্যই আবেদনকারীদের শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। ফলে এই মামলা হয়রানিমূলক ও ভিত্তিহীন।”
আদালত আরও বলেছে, “এই ক্ষেত্রেও আবেদনকারীরা কোনও রোগ বহন করছিলেন বা কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত ছিলেন বলে বিশ্বাস করার কোনও কারণ ছিল কি না, এফআইআরে তার উল্লেখ নেই।”
স্কুল সার্ভিস কমিশনের অনিয়মপূর্ণ নিয়োগপদ্ধতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ জানাতে ২০২১ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ শুরু করেন আবেদনকারীরা। তাঁদের বক্তব্য, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের শিক্ষামন্ত্রীর সামনে নিজেদের অভিযোগ তুলে ধরতে চেয়েছিলেন তাঁরা। সেই উদ্দেশ্যে অনাহার, বেকারত্ব এবং বেআইনি নিয়োগের প্রতিবাদ জানাতে মন্ত্রীর বাড়ির সামনে যান।
কিন্তু পুলিশ তাঁদের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করে। তাতে অভিযোগ করা হয়, চাকরিপ্রার্থীরা কোভিডবিধি লঙ্ঘন করেছিলেন এবং সরে যেতে বলা হলেও জমায়েত ভাঙেননি। সাধারণ মানুষের চলাচলে বাধা দেওয়ার চেষ্টা এবং সরকারি কর্মীদের দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার অভিযোগও আনা হয়।
আবেদনকারীদের আইনজীবী অর্কপ্রতিম চৌধুরী, পূজা রাজভর এবং স্বস্তিক বটব্যাল আদালতে জানান, তাঁদের মক্কেলরা শান্তিপূর্ণ ভাবে একত্র হয়ে নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশের সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগ করছিলেন। সংবিধানের ১৯(১)(ক) অনুচ্ছেদে বাক্স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকার এবং ১৯(১)(খ) অনুচ্ছেদে নিরস্ত্র অবস্থায় শান্তিপূর্ণ ভাবে সমবেত হওয়ার অধিকার স্বীকৃত রয়েছে।
আইনজীবীরা আরও জানান, আবেদনকারীদের বিরুদ্ধে এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পুলিশকে রাজ্য সরকার ক্ষমতা দেয়নি। শান্তিপূর্ণ জমায়েত ও প্রতিবাদের বিরুদ্ধে এমন ব্যবস্থা নেওয়ার অনুমোদন দিয়ে ২০২১ সালে কোনও বিজ্ঞপ্তি বা নোটিসও জারি করা হয়নি।
রাজ্যের পক্ষে আইনজীবী গৌতম মিশ্র আবেদনটির বিরোধিতা করেন। তাঁর যুক্তি, আবেদনটি বিচারযোগ্য নয় এবং তা খারিজ করা উচিত।
আদালত অবশ্য জানায়, এফআইআরে উল্লিখিত সমস্ত অভিযোগ সম্পূর্ণ সত্য বলে ধরে নিলেও ওই জমায়েতকে বেআইনি সমাবেশ হিসেবে গণ্য করার প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ হয় না। কী অভিন্ন উদ্দেশ্যে ওই সমাবেশ গঠিত হয়েছিল, এফআইআরে তার উল্লেখ নেই। ভারতীয় দণ্ডবিধির ১৪১ ধারায় উল্লিখিত পাঁচটি উদ্দেশ্যের কোনও একটি সমাবেশের অভিন্ন উদ্দেশ্য না হলে তাকে বেআইনি সমাবেশ বলা যায় না।
হাই কোর্টের পর্যবেক্ষণ, কেবল প্রতিবাদ করা এবং স্লোগান দেওয়াকে ১৪১ ধারার আওতায় বেআইনি অভিন্ন উদ্দেশ্য হিসেবে গণ্য করা যায় না। ফলে এফআইআরে যে আচরণের বিবরণ দেওয়া হয়েছে, তার ভিত্তিতে ১৪৩ ধারাও প্রযোজ্য হয় না। এই যুক্তিতেই ছয় চাকরিপ্রার্থীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা খারিজ করে আদালত।