২০২৫ সালের ডিসেম্বরে অডিয়ো ও ভিডিয়ো রেকর্ডিং প্রকাশ করে অঙ্কিতা ভাণ্ডারী হত্যাকাণ্ডে এক ‘ভিআইপি’র জড়িত থাকার অভিযোগ তুলেছিলেন উর্মিলা সানাওয়ার। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সিবিআইয়ের সামনে হাজিরা দেওয়ার ঠিক আগের দিনই তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
বিজেপি নেতা দুষ্যন্ত কুমার গৌতমকে সিকিমের রাজ্যপাল নিয়োগ করার পরে ফের আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরের অঙ্কিতা ভাণ্ডারী হত্যাকাণ্ড। নিজের প্রকাশ করা রেকর্ডিংগুলিতে যে ‘ভিআইপি’র কথা বলা হয়েছে, তিনি গৌতমই—দাবি সানাওয়ারের।
এর আগে ভোটের বছরে বিরোধীদের চাপের মুখে এই ঘটনায় সিবিআই তদন্তে সম্মতি দেয় বিজেপি সরকার। যদিও অঙ্কিতাকে হত্যার দায়ে ইতিমধ্যেই তিন জন দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সেই রিসর্টের মালিকও, যেখানে খুন হওয়ার মাত্র কয়েক দিন আগে রিসেপশনিস্টের কাজে যোগ দিয়েছিলেন অঙ্কিতা।
কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করা সানাওয়ারের বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকায় রয়েছে তোলাবাজি, প্রাণনাশের হুমকি, ‘আপত্তিকর’ ছবি ছড়ানো, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে মন্তব্য এবং রেকর্ডিং ছড়িয়ে মানহানি। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে রেকর্ডিংগুলি প্রকাশ করার পরপরই এ নিয়ে এফআইআর দায়ের হয়।
প্রাক্তন বিজেপি বিধায়ক সুরেশ রাঠৌরের মেয়ে দীপিকা রাঠৌরের অভিযোগের ভিত্তিতে রবিবার সানাওয়ারকে গ্রেফতার করা হয়। সানাওয়ারের দাবি, রেকর্ডিংগুলিতে যে ব্যক্তির সঙ্গে তিনি ‘ভিআইপি’ সম্পর্কে আলোচনা করছিলেন, তিনি সুরেশ রাঠৌর। সানাওয়ার আরও দাবি করেছেন, রাঠৌরের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়েছে। রাঠৌরের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগও তুলেছেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, তাঁর ‘আপত্তিকর’ ভিডিয়ো প্রকাশ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন রাঠৌর।
সানাওয়ারের সঙ্গে বিয়ের কথা অস্বীকার করেছেন রাঠৌর। যৌন হেনস্থার অভিযোগও খারিজ করেছেন তিনি। উল্টে তাঁর অভিযোগ, সানাওয়ার তাঁকে ব্ল্যাকমেল করার চেষ্টা করছেন।
আটটি এফআইআরের বিবরণ:
২৫ অক্টোবর, ২০২৬
দেহরাদূনের মোতি বাজারের বাসিন্দা সাগরের অভিযোগের ভিত্তিতে দেহরাদূনের কোতোয়ালি নগর থানায় একটি এফআইআর দায়ের হয়। অভিযোগ, দেহরাদূনের সিবিআই আদালতের বাইরে গৌতম, বিজেপির সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক বি এল সন্তোষ, প্রাক্তন জেলা পঞ্চায়েত সদস্য আরতি গৌর এবং অন্য কয়েক জনের বিরুদ্ধে মানহানিকর মন্তব্য করেছেন সানাওয়ার।
সাগরের অভিযোগ, ওই মন্তব্যগুলি আপত্তিকর, অশালীন এবং মানহানিকর। সমাজমাধ্যমে সেগুলি ছড়িয়ে পড়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সুনাম ক্ষুণ্ণ হয়েছে এবং জনশান্তি বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
নারীর শালীনতার অবমাননা, ইচ্ছাকৃত অপমান, নির্দিষ্ট ধরনের মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর বক্তব্য এবং ফৌজদারি মানহানি সংক্রান্ত ভারতীয় ন্যায় সংহিতার বিভিন্ন ধারায় এফআইআর দায়ের করা হয়।
২৪ অক্টোবর, ২০২৬
২৪ অক্টোবর রাতে হরিদ্বারের রানিপুর থানায় সানাওয়ারের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন দীপিকা রাঠৌর। তাঁর অভিযোগ, তাঁকে এবং তাঁর পরিবারকে নিয়ে সমাজমাধ্যমে অশ্লীল, আপত্তিকর ও মানহানিকর মন্তব্য করেছেন সানাওয়ার।
দীপিকার আরও অভিযোগ, হোয়াটসঅ্যাপে ফোন করে পাঁচ কোটি টাকা দাবি করেছেন সানাওয়ার। পাশাপাশি রবিদাস ধামের সম্পত্তি নিজের নামে হস্তান্তরের দাবিও জানিয়েছেন। তা না হলে রাঠৌর পরিবারের সদস্যদের খুন করা এবং অনলাইনে আরও ছবি ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন বলে অভিযোগ।
মৃত্যু বা গুরুতর আঘাতের ভয় দেখিয়ে তোলাবাজি, নারীর শালীনতার অবমাননা বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপের উদ্দেশ্যে কাজ এবং ফৌজদারি মানহানি সংক্রান্ত ভারতীয় ন্যায় সংহিতার বিভিন্ন ধারায় এফআইআর দায়ের হয়। নারীর অশালীন উপস্থাপন নিষিদ্ধকরণ আইনের ধারাও যুক্ত করা হয়।
এই এফআইআরের সূত্রে ২৫ অক্টোবর সাহারানপুরের গোবিন্দনগরের বাড়ি থেকে সানাওয়ারকে গ্রেফতার করে হরিদ্বার পুলিশ। তাঁকে বিচারবিভাগীয় হেফাজতে পাঠানো হয়।
পুলিশি পদক্ষেপের সময় নিয়ে প্রশ্ন তোলেন কংগ্রেস নেতারা। অঙ্কিতা হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নার্কো অ্যানালিসিস ও পলিগ্রাফ পরীক্ষায় সম্মতি দিয়েছিলেন সানাওয়ার। সিবিআইয়ের সামনে তাঁর হাজিরা দেওয়ার কথা ছিল গ্রেফতারের পরের দিনই।
৫ জানুয়ারি, ২০২৬
দেহরাদূনের ডালানওয়ালা থানায় রাঠৌর, সানাওয়ার এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত কয়েক জন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন গৌতম। তাঁর অভিযোগ, তাঁর সুনাম নষ্ট করতে এবং অঙ্কিতার হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাঁকে জড়াতে সাজানো অডিয়ো ও ভিডিয়ো ক্লিপ ছড়ানো হয়েছে।
তথ্যপ্রযুক্তি আইনের বিভিন্ন ধারার পাশাপাশি মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর বক্তব্য, ফৌজদারি মানহানি এবং ষড়যন্ত্র সংক্রান্ত ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ধারায় এফআইআর দায়ের হয়।
সানাওয়ারের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া এফআইআরগুলি বাতিলের আবেদন নিয়ে ২০২৬ সালের ৩ জুন দেওয়া আদেশে গৌতমের অভিযোগের ভিত্তিতে দায়ের হওয়া এফআইআরটি বাতিল করেনি উত্তরাখণ্ড হাই কোর্ট। তবে রেকর্ডিংগুলি জাল—এমন সিদ্ধান্তও দেয়নি আদালত। আদালত জানায়, রেকর্ডিংগুলির সত্যতা এবং প্রমাণ হিসেবে সেগুলির মূল্য তদন্তসাপেক্ষ। আদালতের শুনানিতে কণ্ঠস্বরের নমুনা ও মোবাইল ফোন ফরেন্সিক পরীক্ষায় পাঠানোর প্রসঙ্গও উঠে আসে।
২৬ ডিসেম্বর, ২০২৫
হরিদ্বারের বাসিন্দা সঞ্চিত কুমার ঝাবরেড়া থানায় সানাওয়ার ও রাঠৌরের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন। তাঁর অভিযোগ, সমাজমাধ্যমে অডিয়ো ক্লিপ ছড়িয়ে গৌতম সম্পর্কে মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর বক্তব্য প্রচার করেছেন তাঁরা। এর ফলে বিজেপি নেতার সুনাম ক্ষুণ্ণ হয়েছে এবং রবিদাস সম্প্রদায়ের মানুষের অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে।
২০২৬ সালের ৩ জুন এই এফআইআর বাতিল করে হাই কোর্ট। আদালতের পর্যবেক্ষণ, অভিযোগগুলি গৌতমের ২০২৬ সালের ৫ জানুয়ারি দায়ের করা অভিযোগের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। তা ছাড়া, অভিযোগকারী সরাসরি ভুক্তভোগী বা ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ নন।
২৪ ডিসেম্বর, ২০২৫
সন্ত শিরোমণি গুরু রবিদাস আখড়ার একজন পদাধিকারী হিসেবে পরিচিত ডা. ধর্মেন্দ্র কুমার হরিদ্বারের বাহাদরাবাদ থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। সানাওয়ারের প্রকাশ করা অডিয়ো ক্লিপগুলি নিয়েই তাঁর অভিযোগ। ওই ক্লিপগুলিতে গৌতমের বক্তব্য রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছিল।
কুমারের অভিযোগ, এই দাবিগুলি মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর। গৌতমের সুনাম নষ্ট করা এবং রবিদাস সম্প্রদায়ের অনুগামীদের অনুভূতিতে আঘাত করার উদ্দেশ্যেই এগুলি প্রচার করা হয়েছে। গৌতম ওই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত।
সঞ্চিত কুমারের দায়ের করা এফআইআরটি বাতিলের ক্ষেত্রে যে ধরনের কারণ দেখানো হয়েছিল, একই ধরনের যুক্তিতে ২০২৬ সালের ৩ জুন এই এফআইআরটিও বাতিল করে হাই কোর্ট।
২৪ ডিসেম্বর, ২০২৫
যমকেশ্বর বিধানসভা কেন্দ্রের আমরোলি এলাকার জেলা পঞ্চায়েত সদস্য আরতি গৌর নেহরু কলোনি থানায় একটি এফআইআর দায়ের করেন। তাঁর অভিযোগ, সানাওয়ারের রেকর্ডিং প্রকাশের জেরে তাঁকে হয়রানি করা হচ্ছে এবং অঙ্কিতা ভাণ্ডারী হত্যাকাণ্ডে মিথ্যা ভাবে জড়ানো হচ্ছে।
এই এফআইআরকে চ্যালেঞ্জ করে উত্তরাখণ্ড হাই কোর্টে আবেদন করা হয়। ২০২৬ সালের ৩ জুনের আদেশে এফআইআরটি বাতিল করতে অস্বীকার করে আদালত।
মার্চ, ২০২৫
সানাওয়ার এবং আরও এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন দীপিকা রাঠৌর। ওই ব্যক্তির পরিচয় স্বাধীন ভাবে যাচাই করা যায়নি। দীপিকার অভিযোগ, তাঁর আপত্তিকর ছবি অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং তাঁর কাছ থেকে টাকা আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছে।
মে, ২০২৫
ভগবান বাল্মীকিকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য পোস্ট করার অভিযোগে সানাওয়ারের বিরুদ্ধে একটি এফআইআর দায়ের হয়। অভিযোগ, ওই মন্তব্যে বাল্মীকি সম্প্রদায়ের মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লেগেছে। অভিযোগকারীর নাম উল্লেখ করা হয়নি।