ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা দিতে গিয়ে কি সংবাদমাধ্যমের দরজাই বন্ধ হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হবে? কেন্দ্রের তথ্য সুরক্ষা আইন নিয়ে এমনই আশঙ্কা জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে ডিজিটাল নিউজ পাবলিশার্স অ্যাসোসিয়েশন বা ডিএনপিএ। সংগঠনের আবেদনের ভিত্তিতে মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, কেন্দ্রকে নোটিস দিয়েছে শীর্ষ আদালত। মামলাটি নাগরিকের গোপনীয়তার অধিকার এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার সম্পর্ক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছে।

প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন তিন বিচারপতির বেঞ্চের সামনে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে ডিজিটাল পার্সোনাল ডেটা প্রোটেকশন আইন, ২০২৩ এবং সংশ্লিষ্ট ২০২৫ সালের বিধির একাধিক সংস্থান। বিতর্কিত বিধানগুলির উপর স্থগিতাদেশ চাওয়ার আবেদনেও কেন্দ্রের জবাব তলব করা হয়েছে। পরবর্তী শুনানি ১৭ নভেম্বর। নোটিস জারিকে অবশ্য আইন স্থগিত হওয়ার সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা যাবে না।

প্রকাশকদের পক্ষে প্রবীণ আইনজীবী মাধবী দিওয়ানের বক্তব্য, যাঁকে নিয়ে খবর লেখা হবে, তাঁর সম্মতির উপর সংবাদ প্রকাশ নির্ভর করলে খবরের ধারণাটাই বদলে যাবে। সংবাদকক্ষের স্বাভাবিক কাজকর্ম অচল হয়ে পড়তে পারে। তাঁর যুক্তি, প্রতিটি ক্ষেত্রে আগাম অনুমতির বাধ্যবাধকতা কার্যত প্রকাশের আগেই নিয়ন্ত্রণ চাপানোর সমান। সংবাদ সংগ্রহের স্বাধীনতা এভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ইচ্ছার অধীন হতে পারে না।

সংগঠনের আশঙ্কার কেন্দ্রে রয়েছে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা। কোনও ব্যক্তির কার্যকলাপ নিয়ে তদন্ত শুরু করার আগে তাঁকেই জানিয়ে সম্মতি চাইতে হলে তিনি প্রমাণ নষ্ট করার কিংবা সাক্ষীদের ভয় দেখানোর সুযোগ পেতে পারেন। অনলাইন কেনাকাটা বা সামাজিক মাধ্যমে পরিষেবা গ্রহণের সময় ব্যবহারকারীর সম্মতি নেওয়া এবং জনস্বার্থে কোনও অনিয়মের অনুসন্ধান করা একই ধরনের কাজ নয়—আবেদনে এই পার্থক্য তুলে ধরা হয়েছে।

আরও উদ্বেগ রয়েছে সাংবাদিকদের গোপন সূত্র নিয়ে। প্রকাশকদের অভিযোগ, সরকারের তথ্য তলবের ক্ষমতার প্রয়োগে সংবাদদাতার পরিচয় প্রকাশের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি ব্যক্তিগত তথ্য মুছে ফেলার বাধ্যবাধকতা প্রকাশিত প্রতিবেদন সরানোর চাপও আনতে পারে। তাঁদের মতে, এতে শুধু সংবাদপ্রতিষ্ঠান নয়, জনস্বার্থে তথ্য দেওয়া মানুষও নিরাপত্তাহীনতায় পড়বেন। গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংবাদমাধ্যমের কাছে পৌঁছনোর পথও সংকুচিত হতে পারে।

আইনের মূল কাঠামোয় ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহারের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্মতি অথবা নির্দিষ্ট অনুমোদিত ভিত্তি প্রয়োজন। প্রকাশকদের আপত্তি, সাংবাদিকতার জন্য স্পষ্ট ছাড় রাখা হয়নি। অথচ আগের খসড়াগুলিতে এমন ব্যতিক্রম ছিল। সংবাদসংগ্রহকে পৃথক ক্ষেত্র হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়ায় সাধারণ তথ্য প্রক্রিয়াকরণের নিয়ম সরাসরি সংবাদকক্ষের উপর চাপবে বলে তাঁদের আশঙ্কা।

ডিএনপিএ দেশের ২১টি সংবাদপ্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব করে। সদস্যদের মধ্যে রয়েছে মুকেশ আম্বানির নেটওয়ার্ক১৮, গৌতম আদানির এনডিটিভি, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এবং টাইমস ইন্টারনেট। সংগঠনের বক্তব্য, সরকারের সঙ্গে আলোচনায় সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার আশ্বাস মিললেও আইনে লিখিত ছাড়ের অনুপস্থিতি উদ্বেগ দূর করেনি। বিতর্কিত বিধানগুলির বড় অংশ ২০২৭ সালের মে মাসে কার্যকর হওয়ার কথা।

তবে আদালত সংবাদমাধ্যমের উদ্বেগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষার প্রয়োজনও সামনে এনেছে। প্রধান বিচারপতি বলেছেন, নাগরিকের গোপনীয়তা এবং সংবাদমাধ্যমের অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য প্রয়োজন। সাংবাদিকতার নামে অধিকার অপব্যবহার ঠেকাতে কী রক্ষাকবচ রাখা যায়, সে বিষয়ে প্রকাশকদেরই প্রস্তাব দিতে বলেছেন তিনি। সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের অভিজ্ঞ হিসেবে তাঁদের মতামত গুরুত্বপূর্ণ বলে জানিয়েছে বেঞ্চ।

আবেদনে সংবিধানের ১৯(১)(ক) অনুচ্ছেদে সুরক্ষিত বাক্‌স্বাধীনতার কথাও বলা হয়েছে। প্রকাশকদের দাবি, সাংবাদিকতার বিশেষ প্রয়োজন উপেক্ষা করলে তথ্য জানার মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হবে এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব পালনের সুযোগও বাধাগ্রস্ত হবে।

মামলায় তথ্য জানার অধিকার আইনের সংশোধন নিয়েও আপত্তি তোলা হয়েছে। ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশে ছাড়ের পরিসর বাড়লে জনস্বার্থের তথ্য পাওয়ার সুযোগ কমতে পারে বলে প্রকাশকদের আশঙ্কা। ফলে বিতর্কটি কেবল সংবাদ প্রকাশের অনুমতি নিয়ে সীমাবদ্ধ নেই; তথ্য সংগ্রহ, সূত্রের সুরক্ষা এবং নাগরিকের জানার অধিকারও এর সঙ্গে যুক্ত। আগামী শুনানিতে কেন্দ্রের অবস্থান এবং সাংবাদিকতার জন্য সুরক্ষার দাবিই নজরে থাকবে।