ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর সংক্রান্ত ‘সমস্ত নথিপত্র ও সিদ্ধান্ত’ সংরক্ষণের জন্য নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দেওয়া হোক, অথবা আদালত নিজেই সেগুলি তলব করুক। মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, সুপ্রিম কোর্টে এই আর্জি জানালেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী-সহ আবেদনকারীরা। তাঁদের বক্তব্য, এটি একটি ‘নিরীহ, হস্তক্ষেপহীন’ আবেদন। প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ আশ্বাস দিল, ‘আমরা সব কিছু খতিয়ে দেখব।’
রাহুল গান্ধীর হয়ে আইনজীবী এস. প্রসন্নের সঙ্গে সওয়াল করছেন প্রবীণ আইনজীবী অভিষেক মনু সিঙ্ঘভি। তিনিই আদালতে নথিপত্র সুরক্ষিত রাখার আবেদন জানান। বেঞ্চ মামলার শুনানি দশ দিন পিছিয়ে দেয়।
মূল আবেদনকারী রাকেশ কুমার সিংয়ের আইনজীবী বিকাশ সিং এবং শৈলেন্দ্র মণি ত্রিপাঠীর মতো অন্য আবেদনকারীরা নির্বাচন কমিশনের হলফনামার জবাব দেওয়ার জন্য সময় চাওয়ায় শুনানি পিছিয়ে যায়।
ওই হলফনামায় ঐক্যবদ্ধ অবস্থান তুলে ধরেছে নির্বাচন কমিশন। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এবং দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশী একসুরে জানিয়েছেন, এসআইআর সংক্রান্ত তাঁদের সিদ্ধান্তগুলি আইন মেনেই নেওয়া হয়েছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের কাজকর্মে বাধা দেওয়ার যে কোনও চেষ্টা বেআইনি বলেও দাবি করেছেন তাঁরা।
কমিশনের বক্তব্য, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিকে অপসারণের জন্য যে পদ্ধতি ও কারণগুলি নির্ধারিত রয়েছে, সেগুলি অনুসরণ করা ছাড়া মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণ করা যায় না।
মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিতে রাজধানীর রাজপথে বিক্ষোভ দিয়ে যে আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, তা থেকেই এই আইনি লড়াইয়ের সূত্রপাত। পরে সাধারণ নাগরিক ও সমাজকর্মী থেকে শুরু করে রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে বিরোধী নেতারা—বিভিন্ন পক্ষ সুপ্রিম কোর্টে একাধিক আবেদন দায়ের করেন। সেই আবেদনগুলির জবাবেই হলফনামা দিয়েছে কমিশন।
বিক্ষোভ শুরুর আগে প্রকাশিত সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধের অভিযোগ সামনে এসেছিল। সেই সব প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিপুল আকারের এসআইআর প্রক্রিয়া চলাকালীন পদ্ধতিগত অনিয়ম এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের একতরফা ও কর্তৃত্ববাদী আচরণ নিয়ে অভিযোগ করেছিলেন অন্য দুই নির্বাচন কমিশনার। এসআইআরে ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম বাদ পড়েছে।
আদালতে সিঙ্ঘভি বলেন, ‘হলফনামায় সিদ্ধান্ত, পরামর্শ, সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল কি না—এ সব নিয়ে কথা বলা হয়েছে। অথচ আমাদের দাবি কেবল একটি নিরীহ, হস্তক্ষেপহীন দাবি। নথিগুলি আপনাদের সামনে পেশ করা হোক, অথবা ফাইলগুলি সংরক্ষণ করার নির্দেশ দেওয়া হোক।’
নির্বাচন কমিশনের হয়ে হাজির ছিলেন প্রবীণ আইনজীবী মনিন্দর সিং। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা। আবেদনকারীদের এই আর্জি নিয়ে তাঁরা প্রশ্ন তোলেন।
সিঙ্ঘভির বক্তব্যের জবাবে প্রধান বিচারপতি কান্ত বলেন, ‘আমরা সব কিছু খতিয়ে দেখব।’ মামলাটি ২০২৬ সালের নভেম্বরের মাঝামাঝি শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়।
পৃথক ভাবে, নির্বাচন কমিশনের কাজকর্ম এবং ফর্ম ৬-এ ‘বিকৃতি ঘটানোর’ অভিযোগে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী দোলা সেনের দায়ের করা আবেদনে নোটিস জারি করেছে আদালত। তাঁর হয়ে সওয়াল করেন প্রবীণ আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী।
গুরুস্বামী বলেন, ‘ওরা সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বলেছে, বিহারের এসআইআর নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায় ফর্ম ৬-এ এই রদবদলের অনুমতি দিয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানের ঔদ্ধত্য দেখুন—ফর্ম ৬-এ বিকৃতি ঘটানোকেই তারা ন্যায্য বলে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে।’
তাঁর দাবি, ২৬ অক্টোবর ২০২৬ নির্বাচন কমিশন যে হলফনামা দিয়েছে, তাতে ‘আমরা যে অভিযোগগুলি করছি, তার অনেকগুলিই স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে’।
যদিও হলফনামায় ফর্ম ৬ পরিবর্তন করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে কমিশন। তাদের যুক্তি, ফর্ম ৬-এর সঙ্গে যে অতিরিক্ত ঘোষণাপত্র দেওয়া হয়েছে, সেটি বিধিবদ্ধ ওই ফর্মের ‘অংশ’ নয়।
এসআইআরে যাঁদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, তাঁদের ফর্ম ৬ পূরণ করতে হচ্ছে। পাশাপাশি অতিরিক্ত ঘোষণাপত্রে আগের ভোটার তালিকায় নিজেদের নামের সঙ্গে বাবা-মা এবং দাদু-ঠাকুমা বা দাদু-দিদিমার নামের সংযোগও দেখাতে হচ্ছে—যাকে বলা হচ্ছে ‘ম্যাপিং’।
হলফনামায় আরও জানানো হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দপ্তরের সঙ্গে যুক্ত আধিকারিকেরা বাদ পড়া ভোটারদের পুনরায় তালিকাভুক্তির বিরুদ্ধে আপিল দায়ের করেছেন। আবেদনকারীদের বক্তব্য, পশ্চিমবঙ্গে এই ধরনের আপিলের সংখ্যা ১৬ লক্ষেরও বেশি। বিপুল সংখ্যক ওই আপিলের চাপে আপিল ট্রাইবুনালগুলির কাজ কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়ছে।
বিকাশ সিং বলেন, ‘এই হলফনামা নিয়ে অনেক কিছু বলার আছে।’
দোলা সেনের আবেদনের পক্ষে করা সওয়ালকে মনিন্দর সিং ‘অন্য কোনও উদ্দেশ্যসাধনের জন্য বাগাড়ম্বর’ বলে অভিহিত করেন। তুষার মেহতা বলেন, আদালতকে রাজনৈতিক মঞ্চে পরিণত করা উচিত নয়।
প্রয়োজন হলে নির্বাচন কমিশন অতিরিক্ত হলফনামা দাখিল করতে পারবে বলে জানিয়েছে আদালত।