দশকের পর দশক ধরে অন্যেরা তাঁর জীবনের গল্প বলেছেন। এ বার নিজের কথা বলার পালা তাঁর। মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬, এ কথা জানালেন কংগ্রেস সংসদীয় দলের চেয়ারপার্সন সোনিয়া গান্ধী। হাসিমুখে যোগ করলেন, আগামী মাসে তাঁর আত্মকথা প্রকাশিত হলে কিছু ‘তামাশা’ তো হবেই।

গত সপ্তাহে সমাজমাধ্যম এক্সে যোগ দেওয়ার পরে নিজের দ্বিতীয় পোস্টে আসন্ন আত্মকথা ‘বিলংগিং: আ জার্নি অব লাভ’-এর আরও একটি ঝলক তুলে ধরেছেন সোনিয়া। বইটি প্রকাশিত হবে ১০ নভেম্বর।

প্রাক্তন কংগ্রেস সভাপতি তাঁর পোস্টে লিখেছেন, “এই বই বেরোলে কিছু তামাশা তো হবেই। দশকের পর দশক ধরে অন্যেরাই তো আমার ‘গল্প’ বলে এসেছেন। এ বার আমার পালা।”

এক মিনিট ২৮ সেকেন্ডের ভিডিওটিতে দেখা যাচ্ছে, নিজের আত্মকথার পাতা ওল্টাচ্ছেন সোনিয়া। যেন নিজের মনেই বলে উঠছেন, “জানি না, পুরো গল্পটা বলা উচিত কি না।”

“আমার স্বামীকে যখন প্রধানমন্ত্রী হতে বলা হয়েছিল, আমি যার একেবারেই বিরুদ্ধে ছিলাম…” বলতে বলতে থেমে যান তিনি।

সোনিয়া জানান, তাঁর মনে হয়েছে, তাঁকে নিয়ে অনেক কিছু লেখা হয়েছে, যার অনেকটাই পুরোপুরি সঠিক নয়। সেসব হয় “মনগড়া, নয়তো অতিরঞ্জিত”। তাই এ বার তিনি নিজের গল্প নিজেই লিখতে চেয়েছেন। ঘটনা এবং পরিস্থিতি যেমন ছিল, ঠিক তেমনভাবেই তুলে ধরতে চেয়েছেন।

ভিডিওতে তাঁর বক্তব্য, “মানুষের মতামত আলাদা আলাদা। আমাকে নিয়ে কারও কারও ধারণা হয়তো বদলাবে। কারও ধারণা হয়তো আরও খারাপ হবে। কিন্তু ব্যাপারটা তো এমনই। বই লিখলে বা জনজীবনে থাকলে এমনটাই হয়। তোমরা এখানে যাকে ‘তামাশা’ বলো, কিছুটা তা হবেই।”

ভিডিওতে তাঁর কথার ফাঁকে ফাঁকে উঠে এসেছে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলির দৃশ্য—রাজীবের সঙ্গে বিয়ে থেকে রাজীবের হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত। দেখা গিয়েছে সর্বভারতীয় কংগ্রেস কমিটির বৈঠকে সোনিয়ার উপস্থিতির ঝলকও। ছিল রাজীব এবং দুই সন্তান রাহুল ও প্রিয়ঙ্কার সঙ্গে তাঁর ছবিও।

২৩ অক্টোবর এক্সে নিজের প্রথম পোস্টে প্রয়াত স্বামী তথা প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীকে অত্যন্ত সুদর্শন ও কোমল স্বভাবের মানুষ বলে বর্ণনা করেছিলেন সোনিয়া। এই সমাজমাধ্যমে আত্মপ্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে তিনি ভাগ করে নিয়েছিলেন তাঁদের একসঙ্গে কাটানো জীবনের স্মৃতি।

এর আগে বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, আসন্ন বই নিয়ে কয়েকটি পোস্টের মাধ্যমে ইনস্টাগ্রামেও আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। বইটিকে তাঁর ভাষায়, “ভালবাসা, কর্তব্য, হারানোর বেদনা এবং নিজের বলে অনুভব করা যায়, এমন একটি জায়গা খুঁজে পাওয়ার গল্প।”

সোনিয়ার সরাসরি সমাজমাধ্যমে আসা এই প্রথম। এত দিন নিজের ভিডিও বিবৃতি, অন্যান্য বার্তা কিংবা জনসমক্ষে প্রকাশ করতে চাওয়া চিঠিপত্র জানাতে তিনি কংগ্রেসের এক্স হ্যান্ডল ব্যবহার করতেন।

গত মাসে হার্পারকলিন্স ইন্ডিয়া ঘোষণা করেছিল, ১০ নভেম্বর ভারতে প্রকাশিত হবে সোনিয়ার ৫৪৪ পাতার আত্মকথা ‘বিলংগিং: আ জার্নি অব লাভ’। লেখকের প্রতিনিধিদের সঙ্গে পেঙ্গুইন র‌্যান্ডম হাউস ইন্ডিয়ার আলোচনায় ‘অচলাবস্থা’ তৈরি হওয়ার পরে দেশে বইটির প্রকাশ নিয়ে যে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছিল, এই ঘোষণায় তার অবসান ঘটে।

হার্পারকলিন্সের ঘোষণার আগে বইটির প্রকাশ নিয়ে বিতর্কে জড়িয়েছিল পেঙ্গুইন র‌্যান্ডম হাউস ইন্ডিয়া। প্রথমে তারা আত্মকথাটি প্রকাশ করতে আগ্রহী ছিল। কিন্তু পরে জানায়, ভারতে বইটির প্রকাশক হচ্ছে না তারা।

পাণ্ডুলিপিতে সম্পাদনাগত পরিবর্তন নিয়ে প্রকাশক ও লেখকের প্রতিনিধিদের মধ্যে মতভেদের খবর প্রকাশ্যে আসার পরেই বিতর্কের সূত্রপাত হয়।

কংগ্রেসের একাধিক নেতা সরকারি চাপ এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্ন তোলেন। তাঁদের কয়েকজনের অভিযোগ ছিল, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ এবং মোদীর শাসনকালে ভারতের ভূখণ্ডে চিনের দখলদারি সংক্রান্ত অংশগুলি বাদ দেওয়ার জন্য পেঙ্গুইন ইন্ডিয়ার উপরে চাপ দেওয়া হয়েছিল।

পেঙ্গুইন র‌্যান্ডম হাউস ইন্ডিয়া অবশ্য জানায়, বইটি প্রকাশ করতে তারা “সত্যিই আগ্রহী” ছিল। বহু চেষ্টায় বইটির প্রকাশস্বত্ব পেয়েছিল বলেও উল্লেখ করে তারা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত “একটি নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে অচলাবস্থা” তৈরি হওয়ায় সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

বাইরে থেকে কোনও রকম চাপ ছিল না বলে স্পষ্ট জানায় প্রকাশনা সংস্থাটি। তবে ঠিক কী নিয়ে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল, তা জানাতে অস্বীকার করে তারা। এর কারণ হিসেবে গোপনীয়তার শর্ত এবং লেখকের সঙ্গে তাদের চুক্তির কথা উল্লেখ করা হয়।

‘বিলংগিং’ শুরু হয়েছে যুদ্ধোত্তর ইতালির ভেনেতো অঞ্চলে সোনিয়ার শৈশবের বর্ণনা দিয়ে। সেখান থেকে তাঁর যাত্রা পৌঁছেছে কেমব্রিজে, যেখানে ১৯৬৫ সালে রাজীব গান্ধীর সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়।

আত্মকথায় রয়েছে রাজীবের সঙ্গে তাঁর বিয়ে, শাশুড়ি তথা প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে পরিচয় এবং ভারতে নতুন জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা। হিন্দি শেখা, শাড়ি পরা, ভারতীয় খাবার ও সংস্কৃতির সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে ওঠার অভিজ্ঞতাও উঠে এসেছে বইটিতে।

গান্ধী পরিবারের জীবন আমূল বদলে দেওয়া বড় বড় বিপর্যয়ের কথাও রয়েছে সেখানে—বিমান দুর্ঘটনায় সঞ্জয় গান্ধীর মৃত্যু, ১৯৮৪ সালে ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকাণ্ড এবং ১৯৯১ সালে রাজীব গান্ধীর হত্যাকাণ্ড।

পাশাপাশি, ২০০৪ সালের নির্বাচনে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন জোটের জয়কে ঘিরে রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহও বিশদে উঠে এসেছে আত্মকথায়। সেই নির্বাচনের পরে প্রধানমন্ত্রী হতে অস্বীকার করেছিলেন সোনিয়া। পরিবর্তে তিনি দল ও জোটের নেতৃত্ব দেন। সেই জোটই পরবর্তী এক দশক ভারত শাসন করে।