মহাদেব অনলাইন বুক বেটিং অ্যাপের অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা সৌরভ চন্দ্রকরকে ওমান থেকে প্রত্যর্পণের মাধ্যমে ভারতে ফিরিয়ে আনল সিবিআই। রবিবার, ১ নভেম্বর, ২০২৬ কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার মুখপাত্র এই খবর জানিয়েছেন। অন্য কেন্দ্রীয় সংস্থা এবং ওমানের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে এই প্রত্যর্পণ সম্পন্ন হয়েছে। বিদেশ থেকে পরিচালিত বেআইনি অনলাইন বাজির কারবারের তদন্তে এটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।

সিবিআইয়ের একটি বিশেষ দল ওমানের রাজধানী মাসকটে গিয়ে চন্দ্রকরকে নিজেদের হেফাজতে ভারতে নিয়ে আসে। তাঁর স্বাস্থ্যপরীক্ষার পর আদালত থেকে ট্রানজিট রিমান্ড নিয়ে ছত্তীসগঢ়ের রায়পুরে নিয়ে যাওয়ার কথা। সোমবার, ২ নভেম্বর, রায়পুরের বিশেষ সিবিআই আদালতে তাঁকে হাজির করা হবে। তাঁর বিরুদ্ধে সিবিআইয়ের দু’টি মামলায় ইতিমধ্যেই চার্জশিট জমা পড়েছে। এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের একটি পৃথক মামলাতেও আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল হয়েছে।

তদন্তকারী সংস্থা জানিয়েছে, ইন্টারপোলের রেড কর্নার নোটিসের ভিত্তিতে চন্দ্রকরের অবস্থান শনাক্ত করে তাঁকে আটক করে রয়্যাল ওমান পুলিশ। এর পর সিবিআই এবং ইডি নিজেদের তদন্তে সংগৃহীত প্রমাণ-সহ আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ প্রস্তাব পাঠায়। ভারত সরকারের বিভিন্ন সংস্থা, ইন্টারপোলের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো এবং ওমানের কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া এগোয়। ওমান প্রত্যর্পণের অনুমোদন দেওয়ার পর তাঁকে আনতে সেখানে বিশেষ দল পাঠানো হয়।

ছত্তীসগঢ় সরকারের অনুরোধে মহাদেব অনলাইন বুক সংক্রান্ত মামলাগুলির তদন্তভার নিয়েছিল সিবিআই। সংস্থার দাবি, ভারতের অন্যতম বৃহৎ বেআইনি অনলাইন বেটিং চক্র হয়ে উঠেছিল এই নেটওয়ার্ক। এর নিয়ন্ত্রণ ছিল দেশের বাইরে। অথচ গ্রাহক সংগ্রহ থেকে বাজির টাকা তোলা—কারবারের বিভিন্ন স্তর ছড়িয়ে ছিল ভারতের নানা প্রান্তে। ফলে তদন্তে দেশীয় লেনদেনের পাশাপাশি বিদেশে অর্থ সরানোর বিষয়টিও উঠে আসে।

সিবিআইয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, ক্রিকেট, ফুটবল, তাস এবং অন্য বিভিন্ন খেলা বা ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাজি ধরার ব্যবস্থা করত মহাদেব অনলাইন বুক। দেশজুড়ে ফ্র্যাঞ্চাইজি হিসেবে চলা ‘প্যানেল’ ও ‘শাখা’র মাধ্যমে এই ব্যবসা বিস্তার করা হয়েছিল। ওই শাখাগুলিই ব্যবহারকারীদের নাম নথিভুক্ত করত এবং তাঁদের কাছ থেকে বাজির টাকা সংগ্রহ করত। বিদেশে বসে পরিচালিত চক্রটির সঙ্গে দেশের ভিতরের এই নেটওয়ার্ক যুক্ত ছিল।

তদন্তকারীদের অভিযোগ, বাজি থেকে পাওয়া টাকা অসংখ্য ‘মিউল’ ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ঘোরানো হত। অর্থাৎ অন্যের নামে থাকা বা অন্যকে দিয়ে পরিচালিত হিসাব ব্যবহার করা হত অর্থ সরানোর কাজে। একাধিক দফায় লেনদেনের মাধ্যমে টাকার গতিপথ জটিল করা হত। এর পরে হাওয়ালা চ্যানেল ব্যবহার করে সেই অর্থ বিদেশে পাঠানো হত বলে সিবিআইয়ের দাবি।

শুধু অর্থ পাচারের অভিযোগেই তদন্ত সীমাবদ্ধ নেই। সিবিআই জানিয়েছে, বেআইনি কারবার যাতে নির্বিঘ্নে চলতে পারে, সে জন্য আয়ের একটি অংশ সরকারি কর্মীদের দেওয়া হত। তদন্তকারী সংস্থা এই অর্থকে ‘প্রোটেকশন মানি’ বা সুরক্ষার বিনিময়ে দেওয়া টাকা বলে বর্ণনা করেছে। অর্থাৎ বাজির নেটওয়ার্কের পাশাপাশি তাকে আড়াল করার জন্য ঘুষ দেওয়ার অভিযোগও এই মামলার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

সিবিআই দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৮৮, ভারতীয় দণ্ডবিধির অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, প্রতারণা ও জালিয়াতি সংক্রান্ত বিধান এবং ছত্তীসগঢ়ের জুয়া নিষিদ্ধকরণ আইনে চার্জশিট দিয়েছে। সেই চার্জশিটগুলিতে চন্দ্রকর অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত। অন্যদিকে, অর্থ পাচারের দিকটি আলাদাভাবে তদন্ত করছে ইডি। এই মামলার সূত্রে দেশের ভিতরে এবং বিদেশে একাধিক সম্পত্তি ইতিমধ্যেই তদন্তকারী সংস্থাটি আইনি প্রক্রিয়ায় আটক করেছে।

প্রত্যর্পণে সহযোগিতার জন্য ওমান সরকার ও রয়্যাল ওমান পুলিশকে ধন্যবাদ জানিয়েছে সিবিআই। সংস্থার বক্তব্য, বিদেশে বসে ভারতীয় নাগরিকদের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক নেটওয়ার্ক চালানোর অভিযোগে অভিযুক্ত পলাতকদের ফিরিয়ে এনে দেশের বিচারপ্রক্রিয়ার মুখোমুখি করার প্রচেষ্টায় এটি উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ। সিবিআই এই সাফল্যকে আন্তঃদেশীয় সংগঠিত অপরাধ দমনে দুই দেশের সহযোগিতার নিদর্শন হিসেবেও দেখছে। চন্দ্রকরকে ফিরিয়ে আনার পরে এখন রায়পুরের আদালতেই তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলির পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া এগোবে।