হাই কোর্টে বিচারপ্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার আর্জি নিয়ে বিচারপ্রার্থীদের সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হওয়ার প্রবণতা ক্রমশ বাড়ছে। রবিবার, ১ নভেম্বর, ২০২৬, কেরল হাই কোর্টে এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে এই প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেন দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত।
তিনি বলেন, ‘‘আমরা দেখছি, হাই কোর্টে বিচারাধীন মামলা জরুরি ভিত্তিতে তালিকাভুক্ত করা বা দ্রুত শুনানির নির্দেশ চেয়ে বিচারপ্রার্থীদের সুপ্রিম কোর্টে আসার প্রবণতা ক্রমশ বাড়ছে।’’
দেশের হাই কোর্টগুলিতে যখন ৬৫ লক্ষ ৫৪ হাজার ৭৮৮টি মামলা বিচারাধীন, তখন প্রধান বিচারপতির এই মন্তব্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সুপ্রিম কোর্টেও বিচারাধীন মামলার সংখ্যা উদ্বেগজনক ভাবে নজিরবিহীন এক লক্ষের সীমার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে। সেখানে জমে থাকা মামলার সংখ্যা প্রায় ৯৭ হাজার ২০১। প্রধান বিচারপতি-সহ সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির সংখ্যা ৩৪ থেকে বাড়িয়ে ৩৮ করা হলেও মামলার জট ক্রমাগত বাড়ার প্রবণতা থামেনি। অন্যদিকে, ২০২৬ সালের ৬ অক্টোবরের হিসাব অনুযায়ী, দেশের ২৫টি হাই কোর্টে বিচারপতির মোট অনুমোদিত পদ ১,১২২টি হলেও তার মধ্যে ২৯২টি শূন্য।
হাই কোর্টে বিচারাধীন মামলার দ্রুত শুনানি চেয়ে এত ঘন ঘন সুপ্রিম কোর্টে আবেদন আসা নিয়ে নিজের উদ্বেগের কথা জানান প্রধান বিচারপতি।
তিনি বলেন, ‘‘সুপ্রিম কোর্ট বরাবরই হাই কোর্টগুলির প্রাতিষ্ঠানিক স্বশাসনকে সম্মান করে এসেছে। কোন বেঞ্চে কোন ধরনের মামলা শোনা হবে, সেই রোস্টার নিজেরা নির্ধারণ করার ক্ষমতাও এর অন্তর্ভুক্ত। …তবু এই ধরনের আবেদন যে হারে আসছে, তা আমাদের ভাবতে বাধ্য করছে—বিচারপ্রার্থীদের প্রয়োজনের প্রতি আমাদের প্রক্রিয়াগুলিকে আরও সাড়া দেওয়ার উপযোগী করে তোলার সুযোগ কি রয়েছে?’’
প্রধান বিচারপতি স্পষ্ট করেন, তাঁর প্রশ্নগুলিকে হাই কোর্ট নামক প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা হিসেবে দেখা উচিত নয়। এগুলি আসলে বিচারব্যবস্থার সম্মিলিত দায়িত্বের কথাই তুলে ধরছে। সংবিধানের ২২৬ অনুচ্ছেদের অধীনে আইনি অধিকার রক্ষায় হাই কোর্টগুলির ক্ষমতার পরিধি, ৩২ অনুচ্ছেদের অধীনে সুপ্রিম কোর্টের ক্ষমতার চেয়েও বিস্তৃত।
তিনি বলেন, ‘‘আমাদের নিজেদের প্রশ্ন করতে হবে: জরুরি মামলাগুলিকে কি আরও কার্যকর ভাবে চিহ্নিত করা যায়? শুনানির জন্য মামলা তালিকাভুক্ত করার প্রক্রিয়াকে কি আরও স্বচ্ছ করা যায়, যাতে কখন শুনানি হতে পারে, সে সম্পর্কে আগাম স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়? যে সব মামলায় বিলম্বের ফলে অপূরণীয় ক্ষতি হতে পারে, সেগুলিকে অগ্রাধিকার দিতে কি প্রযুক্তি সাহায্য করতে পারে? আর আমরা কি নিশ্চিত করতে পারি যে, সময়মতো বিচার পাওয়ার সুযোগ কোনও বিচারপ্রার্থীর দেশের রাজধানীতে আসার সামর্থ্যের উপর নির্ভর করবে না?’’
প্রধান বিচারপতির মতে, বিচারবিভাগের স্বাধীনতা ও দক্ষতা পরস্পরের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে যুক্ত; তারা একে অন্যের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। আদালত সময়মতো ও কার্যকর ভাবে কাজ করলে তার স্বাধীনতার প্রতি মানুষের আস্থা আরও দৃঢ় হয়।
তিনি বলেন, ‘‘ন্যায়বিচার ও অবিচারের ফারাক চূড়ান্ত রায়ে নয়; ফারাক হল, আদালতের হস্তক্ষেপ যখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তখন আদালত হস্তক্ষেপ করছে কি না।’’
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
মন্তব্য করতে আপনার বাংলাস্ফিয়ার অ্যাকাউন্টে লগইন করুন। সদস্যতা কেনার প্রয়োজন নেই।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।