মণিপুরে গুলির লড়াইয়ে তিন কুকির মৃত্যুর পরদিনই উদ্ধার হল নিখোঁজ আরও দুই কুকি যুবকের দেহ। রবিবার, ১ নভেম্বর, সেনাপতি জেলার পাহাড়ি এলাকায় যৌথ তল্লাশিতে দেহ দু’টি খুঁজে পায় নিরাপত্তাবাহিনী। এই খবর ছড়াতেই নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয় কাংপোকপিতে। পরপর দুই ঘটনায় পাঁচ জনের মৃত্যুতে ফের সামনে এল রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতির সংকট।

নিহত দুই যুবকের নাম পাওগিনলাল হাংসিং ও টিংগিনলুন চংলই। তাঁরা ২৮ অক্টোবর থেকে তাফৌ কুকি গ্রাম থেকে নিখোঁজ ছিলেন। তাঁদের সন্ধানের দাবিতে আগে থেকেই আন্দোলন চলছিল। দেহ উদ্ধারের পরে সেগুলি কাংপোকপিতে নিয়ে যাওয়া হয়।

মণিপুর পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়ার পর থেকেই রাজ্য পুলিশ, সিআরপিএফ এবং অসম রাইফেলস একাধিক তল্লাশি চালায়। রবিবার অভিযানে যোগ দেয় কোবরা ও র‌্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সও। দুই নম্বর জাতীয় সড়কের পূর্ব দিকে সেনাপতি–ফাইবুং সড়ক সংলগ্ন এলাকায় বিস্তৃত তল্লাশির সময় দেহ দু’টি মেলে।

দুই যুবককে নিরাপদে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে কুকি-জো সংগঠন কমিটি অন ট্রাইবাল ইউনিটি বা কোটু কাংপোকপিতে ৪৮ ঘণ্টার সর্বাত্মক বন্‌ধের ডাক দিয়েছিল। রবিবারও বন্‌ধ বহাল ছিল। জীবিত উদ্ধারের দাবিতে চলতে থাকা আন্দোলন দেহ মেলার পরে ক্ষোভ ও প্রতিবাদে আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, নাগা জঙ্গিরা দুই যুবককে অপহরণ করে হত্যা করেছে। তাঁরা দেহ গ্রহণ করতেও অস্বীকার করেন। তবে এই অভিযোগ তদন্তে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এমন কোনও ঘোষণা পুলিশ করেনি। কে বা কারা তাঁদের নিয়ে গিয়েছিল এবং কী পরিস্থিতিতে মৃত্যু হয়েছে, তা এখনও তদন্তাধীন।

কাংপোকপি জেলা হাসপাতালে দেহ আনার পরে বহু মানুষ জড়ো হন। বিক্ষোভের মধ্যে নিরাপত্তাবাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে। পরে দেহ সরানো হয় পুলিশ সুপারের দফতরে। উত্তেজিত জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করা হয়। বিক্ষোভকারীরা দুই নম্বর জাতীয় সড়কও অবরোধ করেন। বন্‌ধে দোকানপাট ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে।

কোটু জানিয়েছে, সরকারের কাছে পেশ করা দাবিগুলি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তারা দেহ গ্রহণ করবে না। এই দাবির মধ্যে রয়েছে উপমুখ্যমন্ত্রী লোসি দিখোকে অপসারণ। সংগঠনের অভিযোগ, তাঁর হস্তক্ষেপে দুই যুবকের নিরাপদ মুক্তি মিলবে বলে আশা করা হয়েছিল।

এর আগের দিন, শনিবার, নোনে জেলার নুংবা থানার অন্তর্গত কেকরু নাগা গ্রামে অজ্ঞাতপরিচয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির গুলির লড়াইয়ে তিন কুকি নিহত হন। তাঁদের নাম থাংলেনসাং সিংসন, থাংখোসেই হাওকিপ এবং লামমিনসাং কিপগেন। ঠিক কী কারণে গুলির লড়াই শুরু হয়েছিল এবং তাতে কারা অংশ নিয়েছিল, তা স্পষ্ট হয়নি।

কুকিদের শীর্ষ সংগঠন কুকি ইনপি মণিপুর এই হত্যাকাণ্ডের নিন্দা করে এনএসসিএন-আইএম এবং জেডইউএফ(কে)-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে। নোনের বিপন্ন কুকি-জো বসতিগুলিকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দিতে প্রশাসন ব্যর্থ হয়েছে বলেও দাবি সংগঠনের। তারা দায় নির্ধারণ ও সাধারণ মানুষের সুরক্ষা চেয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র সংগঠনগুলির বিরুদ্ধে অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই হয়নি; পুলিশও দায়ীদের পরিচয় ঘোষণা করেনি।

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলির পিছনে রয়েছে মণিপুরের দীর্ঘ জাতিগত সংঘাতের পটভূমি। কুকি ও নাগাদের মধ্যে ভূখণ্ডের দাবি ঘিরে বিরোধ পুরনো। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নতুন করে উত্তেজনা ছড়ায়; মে মাসে তিন কুকি ধর্মযাজকের হত্যার পরে পাল্টাপাল্টি অপহরণ ও হত্যার ঘটনা বাড়ে। অন্যদিকে, ২০২৩ সালের মে থেকে চলা মেইতেই–কুকি সংঘাতে তিনশোর বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ঘরছাড়া ষাট হাজারের বেশি মানুষ এখনও অস্থায়ী আশ্রয়ে রয়েছেন।

পুলিশ জানিয়েছে, হত্যায় জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেফতার করতে তল্লাশি চলবে। উত্তেজনার মধ্যে নতুন অশান্তি ঠেকাতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। কিন্তু নিখোঁজ যুবকদের জীবিত ফেরানোর দাবি শেষ পর্যন্ত দেহ উদ্ধারে পরিণত হওয়ায় স্থানীয় ক্ষোভ প্রশমিত হয়নি। তদন্তের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন প্রশাসনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।