সুপ্রিম কোর্টের তাগিদের পরদিনই ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআরের সময়সূচি বদলাল নির্বাচন কমিশন। দিল্লিতে নাম তোলার দাবি ও আপত্তি জানানোর মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি নাগাল্যান্ড, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলঙ্গানা, মহারাষ্ট্র ও হরিয়ানায় বন্ধ হয়ে যাওয়া আবেদন গ্রহণের পর্ব ফের চালু হচ্ছে। খসড়া তালিকায় নাম না থাকা ভোটারদের সামনে এর ফলে নিজেদের দাবি জানানোর নতুন সুযোগ তৈরি হল।
বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, সংশ্লিষ্ট মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকদের পৃথক চিঠিতে সংশোধিত সময়সূচি জানিয়েছে কমিশন। পাঁচ রাজ্যে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশিত হবে ৩০ নভেম্বর। দিল্লির চূড়ান্ত তালিকা বেরোবে ২২ ডিসেম্বর। কমিশনের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকদের কাছ থেকে সময় বাড়ানোর অনুরোধ আসার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
দিল্লিতে দাবি ও আপত্তি জানানোর শেষ দিন ছিল ৩০ অক্টোবর। তা পিছিয়ে হয়েছে ২৫ নভেম্বর। অর্থাৎ ভোটাররা অতিরিক্ত ২৬ দিন পাচ্ছেন। আবেদন যাচাই, নোটিস এবং দাবি-আপত্তি নিষ্পত্তির সময়সীমাও ৩০ নভেম্বর থেকে বাড়িয়ে ১৫ ডিসেম্বর করা হয়েছে। আগে রাজধানীর চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের কথা ছিল ৪ ডিসেম্বর; এখন তা পিছোচ্ছে ১৮ দিন।
মহারাষ্ট্রে আবেদন জানানোর পর্ব শেষ হয়েছিল ২৬ অক্টোবর। নতুন সময়সূচিতে সেখানে ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত দাবি ও আপত্তি জমা দেওয়া যাবে। নোটিস দেওয়া এবং আবেদন নিষ্পত্তির কাজ চলবে ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত। দিল্লি ও মহারাষ্ট্র, দুই জায়গাতেই খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশিত হয়েছিল ৩১ আগস্ট।
অন্য চার রাজ্যেও আবেদন জানানোর পুরনো সময়সীমা ইতিমধ্যে পেরিয়ে গিয়েছিল। হরিয়ানায় সেই পর্ব শেষ হয় ৩০ সেপ্টেম্বর, তেলঙ্গানায় ৭ অক্টোবর, নাগাল্যান্ডে ২০ অক্টোবর এবং অন্ধ্রপ্রদেশে ২২ অক্টোবর। নতুন সূচিতে অন্ধ্রপ্রদেশ ও হরিয়ানায় ২০ নভেম্বর, নাগাল্যান্ডে ২৫ নভেম্বর এবং তেলঙ্গানায় ২৬ নভেম্বর পর্যন্ত দাবি ও আপত্তি জানানোর সুযোগ মিলবে।
এই সিদ্ধান্তের তাৎপর্য বাড়িয়েছে বুধবারের সুপ্রিম কোর্টের শুনানি। দিল্লির এসআইআর নিয়ে মামলায় প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ কমিশনকে সময় বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করতে বলে। আদালতের বক্তব্যের মর্ম ছিল, দিল্লিতে সামনে কোনও নির্বাচন নেই; ফলে একটি কঠোর শেষ তারিখ ধরে আবেদন গ্রহণ বন্ধ করার তাড়া কোথায়? কমিশনকে ফর্ম গ্রহণ চালিয়ে যেতে এবং প্রয়োজনীয় নথি যাচাই করতে বলা হয়।
আদালত অবশ্য নিজে মেয়াদ বাড়ানোর আনুষ্ঠানিক আদেশ দেয়নি। কমিশন নিজের দায়িত্বে ব্যবস্থা নেবে, সেই প্রত্যাশা জানিয়েছিল। প্রধান বিচারপতি মনে করিয়ে দেন, দিল্লির মতো শহরে জীবিকার প্রয়োজনে বহু মানুষ বারবার বাসস্থান বদলান। তাঁদের প্রত্যেকেই ভোটার তালিকার কাজের জন্য প্রশাসনের কাছে ছুটবেন, এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। বরং প্রশাসনকে তাঁদের কাছে পৌঁছতে হবে। কমিশনের আইনজীবী সময় বাড়ানোর আশ্বাস দিয়েছিলেন।
দিল্লির পরিসংখ্যান সমস্যার ব্যাপ্তি বুঝিয়ে দেয়। ৩০ জুন এসআইআর শুরুর সময় রাজধানীর তালিকায় প্রায় ১ কোটি ৪৫ লক্ষ ভোটার ছিলেন। ৩১ আগস্টের খসড়ায় থাকেন প্রায় ৯৭ লক্ষ ৫৩ হাজার। বাদ পড়েন প্রায় ৪৭ লক্ষ ৫৭ হাজার। কমিশন তাঁদের অনুপস্থিত, স্থানান্তরিত, মৃত অথবা একাধিক জায়গায় নাম থাকা ভোটার হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কিন্তু খসড়া থেকে বাদ পড়া মানেই প্রত্যেক ব্যক্তি ভোটার হওয়ার অযোগ্য, এমন সিদ্ধান্ত টানা যায় না।
বাদ পড়ার এই বিপুল সংখ্যার তুলনায় নাম অন্তর্ভুক্তির আবেদন অনেক কম। দিল্লির মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত খসড়া প্রকাশের পর প্রায় ২ লক্ষ ৬৭ হাজার ফর্ম ৬ জমা পড়েছিল। এক লক্ষের বেশি বিশেষ শিবির আয়োজন করেও সেখানে পাওয়া যায় মাত্র ২৭,৫১০টি আবেদন। অর্থাৎ সুযোগ ঘোষণার পাশাপাশি মানুষের কাছে সেই সুযোগ কার্যকরভাবে পৌঁছনোর প্রশ্নও সামনে এসেছে।
তবে এই আবেদনগুলিকে সরাসরি বাদ পড়া ভোটারদের ফিরে আসার হিসাব হিসেবে ধরা ঠিক হবে না। ফর্ম ৬ জমা দিয়েছেন নতুন ভোটাররাও। আবার আবেদন জমা পড়া এবং তা মঞ্জুর হওয়া এক বিষয় নয়। ফলে কতজন পুরনো ভোটার শেষ পর্যন্ত তালিকায় ফিরলেন, তার আলাদা হিসাব প্রকাশ প্রয়োজন।
এসআইআরের প্রক্রিয়ায় নিবন্ধিত ভোটারদের গণনাপত্র জমা দিতে হয়েছিল। যাঁরা তা জমা দিতে পারেননি, তাঁদের নাম খসড়ায় রাখা হয়নি। পরে নাম ফেরানোর জন্য ফর্ম ৬ জমা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। নাম বাদ দেওয়ার আপত্তির জন্য ব্যবহৃত হয় ফর্ম ৭। এই দাবি-আপত্তির পর্যায় তাই খসড়া তালিকার ভুল সংশোধনের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ; শুধু দফতরের আনুষ্ঠানিক কাজ নয়।
তবে আগে থেকেই তালিকাভুক্ত কোনও ভোটারকে নতুন ভোটারের মতো ফর্ম ৬ পূরণ করতে বলা নিয়েও আদালত প্রশ্ন তুলেছে। দিল্লির মধ্যেই ঠিকানা বদলালে ফর্ম ৮ ব্যবহারের প্রসঙ্গ ওঠে। একই শুনানিতে বেঞ্চ জানায়, তথাকথিত ‘যৌক্তিক অসংগতি’ দেখিয়ে নাম বাদ দেওয়ার বৈধতা এখনও চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়নি। বিহারের এসআইআর সংক্রান্ত রায়কে এই প্রশ্নের নিষ্পত্তি হিসেবে দেখানো যাবে না।
কমিশন সংশোধিত সময়সূচি ব্যাপকভাবে প্রচারের নির্দেশ দিয়েছে। যেখানে নির্দেশে বলা আছে, সেখানে রাজনৈতিক দলগুলিকেও লিখিতভাবে পরিবর্তনের কথা জানাতে হবে। দিল্লি ও মহারাষ্ট্রে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞপ্তি সরকারি গেজেটে প্রকাশের নির্দেশও রয়েছে। ফলে সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত কেবল কমিশনের চিঠিতে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; স্থানীয় স্তরে ভোটারদের সেই খবর জানানোও এই ব্যবস্থার অংশ।
সময় বাড়ায় আপাতত স্বস্তি মিলবে। কিন্তু আসল পরীক্ষা হবে চূড়ান্ত তালিকায়: যোগ্য ভোটারদের দাবি কতটা নিষ্পত্তি হল, ভুলভাবে বাদ পড়া কতজনের নাম ফিরল এবং কতজন সুযোগের খবরই পেলেন না। গণতন্ত্রে ভোটার তালিকা সংশোধনের সাফল্য শুধু কাজ শেষ হওয়ার তারিখ দিয়ে মাপা যায় না। কোনও যোগ্য নাগরিক যাতে প্রশাসনিক ভুল বা প্রক্রিয়ার জটিলতায় ভোটাধিকার হারিয়ে না ফেলেন, সেই নিশ্চয়তাই সবচেয়ে
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
মন্তব্য করতে আপনার বাংলাস্ফিয়ার অ্যাকাউন্টে লগইন করুন। সদস্যতা কেনার প্রয়োজন নেই।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।