ইনস্টাগ্রামে তাঁর অ্যাকাউন্টই নেই। অথচ সেখানকার একটি আপত্তিকর মন্তব্যের জন্য ভোর পাঁচটায় বাড়িতে হাজির পুলিশ। মোবাইল কেড়ে নিয়ে, পরিবারের কাউকে জানানোর সুযোগ না দিয়ে, রাতের পোশাকেই তাঁকে তুলে দেওয়া হল ভাড়া করা গাড়িতে। চেন্নাইয়ের অর্থনীতিবিদ এ কালাইয়ারাসনের অভিযোগ, অন্য কেউ তাঁর ছবি ব্যবহার করেছিল; কিন্তু অপরাধীর মতো আচরণ করা হল তাঁর সঙ্গেই।
মাদ্রাজ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের এই সহযোগী অধ্যাপকের বাড়ি চেন্নাইয়ের আদিয়ারে। রাজ্য পুলিশের ডিজিকে দেওয়া অভিযোগে তিনি জানিয়েছেন, ২৮ অক্টোবর সকালে সাধারণ পোশাকের তিন পুলিশকর্মী তাঁকে পাম্মালের শঙ্কর নগর থানায় নিয়ে যাওয়ার কথা বলেন। অভিযোগ, পল্লাভরমের টিভিকে বিধায়ক জে কামাচ্চির বিরুদ্ধে ইনস্টাগ্রামে অশালীন মন্তব্য করেছেন তিনি। কালাইয়ারাসনের দাবি, পুলিশ কোনও অভিযোগপত্র, এফআইআর বা জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতিসংক্রান্ত নথি দেখায়নি। তাঁর ব্যাখ্যাও শোনেনি।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে পুলিশের যাচাইয়ের বিস্ময়কর পদ্ধতি। সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টের নাম ছিল বিজয়া মণিকন্দন, ব্যবহারকারীর পরিচয় ‘@youvijayamani’। প্রোফাইলে ছিল কালাইয়ারাসনের ছবি। পুলিশ গুগলে সেই ছবি দিয়ে অনুসন্ধান করে তাঁর পরিচয় উদ্ধার করে। কিন্তু ছবির মানুষটিই অ্যাকাউন্টটি চালান কি না, তা যাচাই করেনি। বিধায়কের দপ্তর থেকে অনলাইন কটূক্তির অভিযোগ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার চাপ বাড়ছিল বলে পুলিশসূত্র জানিয়েছে। সেই তৎপরতার মধ্যেই ঘটে এই ঘটনা।
গাড়ি গিন্ডি পেরোনোর পরে বারবার অনুরোধ করে কয়েক মিনিটের জন্য ফোন ব্যবহারের সুযোগ পান অধ্যাপক। বন্ধুদের খবর দেন। তাঁরা পুলিশের শীর্ষমহলে যোগাযোগ করেন। এর পরে সংশ্লিষ্ট পুলিশদলকে খুঁজে বার করে গাড়ি থামানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। পল্লাভরমের কাছে রাস্তার ধারে প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট অপেক্ষা করানো হয় কালাইয়ারাসনকে। চলতে থাকে ফোনালাপ। বাড়ি থেকে তুলে আনার পরে শুরু হয় পরিচয় ও অভিযোগের প্রাথমিক যাচাই।
ফেরার পথে পুলিশ তাঁকে বিতর্কিত মন্তব্যের স্ক্রিনশট দেখায়। কালাইয়ারাসনের সন্দেহ, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট থেকে তাঁর ছবিটি নেওয়া হয়েছে; সেখানে তিনি গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বাড়ি ফিরেও রেহাই মেলেনি সঙ্গে সঙ্গে। ওই অ্যাকাউন্টের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নেই, লিখিতভাবে জানাতে হয়। তার পরে ফোন ফেরত পান। সকাল পৌনে আটটা নাগাদ শেষ হয় প্রায় তিন ঘণ্টার এই অভিজ্ঞতা।
কালাইয়ারাসন ‘দ্য দ্রাবিড়িয়ান মডেল’ বইয়ের সহলেখক এবং তামিলনাড়ুর অর্থনৈতিক সমীক্ষাতেও অবদান রেখেছেন। সম্প্রতি টেলিভিশনের সাক্ষাৎকারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে সরব হয়েছিলেন। সেই সমালোচনার কারণেই তাঁকে নিশানা করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিন। মুখ্যমন্ত্রী বিজয় ও পুলিশের প্রকাশ্য ক্ষমাপ্রার্থনাও দাবি করেছেন তিনি।
তবে মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে বক্তব্য অথবা তাঁর গবেষণার সঙ্গে পুলিশি পদক্ষেপের যোগ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এক প্রবীণ পুলিশকর্তা বলেছেন, স্থানীয় পুলিশ বা টিভিকে নেতারা ঘটনার আগে অধ্যাপকের কাজকর্ম সম্পর্কে জানতেনই না। অন্য এক কর্তা স্বীকার করেছেন, তাঁদের পুলিশকর্মীদের ভুল হয়েছিল।
রাজ্যের আইনমন্ত্রী সিটিআর নির্মল কুমারও ঘটনাকে ভুল ও ভুল-বোঝাবুঝি বলেছেন। তাঁর বক্তব্য, বিষয়টি সংশোধন করা হয়েছে। শঙ্কর নগর পুলিশের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নেওয়া হয়েছিল অধ্যাপককে; সংশ্লিষ্টতা নেই বোঝার পর ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। হয়রানির অভিযোগ তারা অস্বীকার করেছে। পরে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গেও দেখা করেন কালাইয়ারাসন।
কিন্তু বাড়ি পৌঁছে দেওয়াতেই তাঁর অভিযোগের নিষ্পত্তি হচ্ছে না। ডিজিকে তিনি বলেছেন, ছবি অপব্যবহারের ঘটনায় আসলে তিনিই ক্ষতিগ্রস্ত। অথচ নিজের নির্দোষিতা বোঝানোর যুক্তিসংগত সুযোগটুকুও পাননি। বেআইনি আটকের অভিযোগ এবং ভুয়ো অ্যাকাউন্ট তৈরির ঘটনায় ব্যবস্থা চেয়েছেন তিনি। তাঁর উদ্বেগ, এমন অভিজ্ঞতা মানুষকে প্রকাশ্য বিতর্ক ও বিদ্যাচর্চা থেকে সরিয়ে দিতে পারে। প্রশ্নটিও স্পষ্ট: প্রোফাইলে কারও ছবি থাকলেই কি তাঁকে ভোরে তুলে নিয়ে যাওয়ার যথেষ্ট ভিত্তি তৈরি হয়?
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
মন্তব্য করতে আপনার বাংলাস্ফিয়ার অ্যাকাউন্টে লগইন করুন। সদস্যতা কেনার প্রয়োজন নেই।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।