মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে বিরোধীদের ‘জনতার অভিশংসন’ কর্মসূচির সভাপতিত্ব করবেন লোকসভার প্রাক্তন স্পিকার মীরা কুমার। শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর বিকেল সাড়ে তিনটে থেকে নয়াদিল্লির ১০, রাজাজি মার্গে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়্গের বাসভবনে এই প্রতীকী প্রতিবাদের আয়োজন করেছে ‘ইন্ডিয়া’ জোট। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর ঘিরে অনিয়ম এবং ‘ভোট চুরি’র অভিযোগকে সামনে রেখেই নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে চাপ বাড়াতে চাইছে বিরোধী শিবির।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে প্রস্তাব উত্থাপন করবেন খাড়্গে। আলোচনা পরিচালনা করবেন মীরা কুমার। সব শেষে বক্তব্য রাখবেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। তার পরে প্রস্তাবটি ভোটাভুটির মাধ্যমে গ্রহণ করার কথা। সংসদীয় বিতর্কের আদলে সাজানো প্রায় তিন ঘণ্টার এই কর্মসূচিতে ২১টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি-সহ অন্তত ৩০ জন বক্তার অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

মীরা কুমার ২০০৯ সালের জুন থেকে ২০১৪ সালের জুন পর্যন্ত লোকসভার স্পিকার ছিলেন। সংসদ পরিচালনার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন প্রাক্তন স্পিকারকে সামনে রেখে অনুষ্ঠানটিকে সংসদীয় আলোচনার আদল দিতে চাইছেন আয়োজকেরা। তবে তাঁর উপস্থিতিতেও এই সভার আইনি চরিত্র বদলাবে না। মূল গুরুত্ব থাকবে প্রকাশ্য বিতর্কে, অভিযোগ তুলে ধরায় এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে বিরোধীদের রাজনৈতিক অবস্থান প্রকাশের মধ্যে।

বৃহস্পতিবার খাড়্গের বাড়িতে বিরোধী নেতাদের বৈঠকে কর্মসূচির রূপরেখা চূড়ান্ত হয়। উপস্থিত ছিলেন প্রিয়ঙ্কা গান্ধী বঢরা, জয়রাম রমেশ, কে সি বেণুগোপাল, তৃণমূলের ডেরেক ও’ব্রায়েন, সমাজবাদী পার্টির হরেন্দ্র মালিক, ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার মহুয়া মাজি এবং সিপিএমের জন ব্রিটাস। হরেন্দ্র মালিক জানিয়েছেন, প্রতিটি দলের পক্ষ থেকে একজন বক্তব্য রাখবেন। দলের নেতা নিজে বলতে পারেন, অথবা অন্য কাউকে প্রতিনিধি মনোনীত করতে পারেন।

আয়োজকদের পরিকল্পনায় রাজনৈতিক নেতাদের পাশাপাশি নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদেরও বক্তব্য রাখার সুযোগ থাকবে। এসআইআর প্রক্রিয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে অভিযোগ জানানো মানুষও নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরবেন। ফলে কমিশনের বিরুদ্ধে দলীয় অভিযোগের সঙ্গে সাধারণ ভোটারদের সমস্যাকে একই মঞ্চে আনার চেষ্টা হচ্ছে। বিজু জনতা দলকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, যদিও তাদের যোগদান নিশ্চিত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।

কংগ্রেসের অভিযোগ, অন্য জায়গায় এই কর্মসূচি করার অনুমতি না মেলায় শেষ পর্যন্ত খাড়্গের বাসভবন বেছে নিতে হয়েছে। জয়রাম রমেশ জানিয়েছেন, সেখানেই প্রকাশ্যে কমিশনারের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হবে। তাঁর অভিযোগ, জ্ঞানেশ কুমার সংবিধানের বিধান ও মর্ম লঙ্ঘন করেছেন, নির্বাচনী গণতন্ত্রের ভিত্তি দুর্বল করেছেন এবং সুপ্রিম কোর্টকে বিভ্রান্ত করেছেন। এগুলি বিরোধী নেতৃত্বের উত্থাপিত অভিযোগ; প্রতিষ্ঠিত বিচারিক সিদ্ধান্ত হিসেবে সেগুলি দেখার সুযোগ নেই।

এই কর্মসূচির নাম ‘অভিশংসন’ হলেও এর মাধ্যমে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে পদ থেকে সরানো যাবে না। এটি একটি রাজনৈতিক ও প্রতীকী উদ্যোগ। সংবিধানের ৩২৪(৫) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিকে অপসারণের যে পদ্ধতি ও ভিত্তি, মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের ক্ষেত্রেও সেই সুরক্ষা প্রযোজ্য। কাজেই খাড়্গের বাড়ির সভায় প্রস্তাব গৃহীত হলেও তার কোনও সরাসরি সাংবিধানিক অপসারণক্ষমতা থাকবে না।

বিরোধীদের লক্ষ্য অবশ্য জনমতের সামনে কমিশনের জবাবদিহির প্রশ্নটি জোরালো করা। কংগ্রেস নেতা গৌরব গগৈ বলেছেন, এসআইআর এবং কথিত ভোট চুরি সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলি আলোচনায় আনতে চান তাঁরা। মানুষের দুর্ভোগ তুলে ধরার পাশাপাশি গণতন্ত্র রক্ষায় বিরোধীরা ঐক্যবদ্ধ, সেই বার্তাও দেওয়া হবে। বৈঠকের পরে পবন খেরা জানিয়েছেন, অনুষ্ঠান কীভাবে এগোবে, তার বিভিন্ন দিক নিয়ে নেতারা আলোচনা করেছেন।

এই প্রতিবাদের পরবর্তী ধাপ ১ নভেম্বর দিল্লিতে বিরোধীদের সমাবেশ। খাড়্গে জানিয়েছেন, নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে তাঁদের আন্দোলন চলবে এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ সমাবেশে আসবেন। তাঁর বক্তব্য, গণতন্ত্রে লড়াই না করলে জনসাধারণকে সচেতন করা যায় না। সেই বৃহত্তর আন্দোলনের প্রস্তুতিপর্ব হিসেবেই মীরা কুমারের সভাপতিত্বে এই প্রকাশ্য কর্মসূচিকে দেখছে বিরোধী শিবির।