এমন এক প্রজন্মের সঙ্গে কী ভাবে সংযোগ গড়ে তোলা যায়, যাদের রাজনৈতিক ভাষা এবং সংগঠিত হওয়ার পদ্ধতি তৈরি হচ্ছে চিরাচরিত কাঠামোর বাইরে—তা নিয়ে ভাবছে সঙ্ঘ পরিবার। এই প্রেক্ষাপটেই ইন্দোরে বসছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের তিন দিনের বৈঠক। আলোচনায় গুরুত্ব পাবে তরুণদের বিক্ষোভ এবং সমাজমাধ্যমের ছুড়ে দেওয়া নতুন চ্যালেঞ্জ।
বৈঠক সম্পর্কে আরএসএসের ঘোষণায় বলা হয়েছে, নতুন মাধ্যমগুলিতে প্রচারিত বিষয়বস্তু, মাদকাসক্তি, ‘ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বাইরের হস্তক্ষেপ’ এবং বিশ্বপরিস্থিতি-সহ সমসাময়িক নানা প্রশ্নে ‘বিস্তারিত আলোচনা’ হবে।
সঙ্ঘের শতবর্ষ উদ্যাপনের কর্মসূচিগুলিও পর্যালোচনা করা হবে। পাশাপাশি, বিজয়াদশমীর ভাষণে সঙ্ঘপ্রধান মোহন ভাগবত যে বিষয়গুলি তুলেছিলেন, সেগুলি নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপের অগ্রগতিও খতিয়ে দেখা হবে।
‘শুনতে হবে, কথা বলতে হবে, যোগাযোগ রাখতে হবে’
তরুণদের উদ্বেগ ও ক্ষোভের মোকাবিলায় তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ ও কথোপকথন চালিয়ে যাওয়ার পথ নিতে চায় সঙ্ঘ।
সঙ্ঘের এক প্রবীণ পদাধিকারী বলেন, “ইতিহাস সাক্ষী, সব দেশেই সময়ে সময়ে তরুণদের মধ্যে এমন বিক্ষোভ দেখা দেয়। আমাদের পক্ষে সবচেয়ে ভাল যা করা সম্ভব, তা হল তাঁদের কথা শোনা, নিজেদের মতামত তাঁদের জানানো এবং তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা। তাঁদের কোনও কিছু বোঝানোর জন্য জোর করে চেষ্টা করে লাভ নেই। ভাল দিক হল, আরএসএস বরাবরই তরুণদের সঙ্গে যুক্ত থেকেছে। ঐতিহাসিক ভাবে আমাদের শাখাগুলিতে তরুণদের অংশগ্রহণই বেশি। এখনও আমাদের ৮৮ হাজারের বেশি শাখায় যাঁরা আসেন, তাঁদের ৬০ শতাংশই তরুণ। কাজটা ইতিমধ্যেই চলছে।”
অগস্টে সঙ্ঘের অখিল ভারতীয় সমন্বয় বৈঠকেও তরুণদের উদ্বেগের নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। তার মধ্যে ছিল পরীক্ষা ব্যবস্থার সমস্যাও।
নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো বিষয় নিয়ে প্রশ্নের জবাবে সঙ্ঘ ব্যবস্থার ত্রুটি স্বীকার করেছিল। জোর দিয়েছিল এই কথায় যে, তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে যোগাযোগ মানে কেবল তাঁদের উপদেশ দেওয়া নয়; তাঁদের সঙ্গে কথা বলা এবং তাঁদের উদ্বেগ বোঝাও জরুরি।
তরুণদের কাছে পৌঁছনোর উদ্যোগ সঙ্ঘের শতবর্ষের কর্মসূচিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চলতি মাসের গোড়ায় বিজয়াদশমীর ভাষণে ভাগবত জানান, শতবর্ষ উপলক্ষে আয়োজিত যুব সম্মেলনগুলিতে ৩৯ লক্ষ ২৫ হাজার তরুণ অংশ নিয়েছেন।
সিজেপি আন্দোলনের সময় ভাগবতের বক্তব্য
তরুণদের বর্তমান বিক্ষোভের প্রতি সঙ্ঘের দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষ ভাবে চোখে পড়েছিল এ বছরের গোড়ার দিকে পরীক্ষা ব্যবস্থায় অনিয়মের বিরুদ্ধে ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপির নেতৃত্বে আন্দোলনের সময়।
৬ অগস্ট মুম্বইয়ে জেন জ়ি ও জেন আলফা প্রজন্মের প্রায় দু’হাজার পড়ুয়ার সঙ্গে কথা বলেন ভাগবত। সেই আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, জেন জ়ি যে অভিযোগগুলি তুলছে, সেগুলি ‘যথার্থ’। প্রতিবাদকে গণতান্ত্রিক কথোপকথনের একটি বৈধ মাধ্যম বলেও বর্ণনা করেন তিনি। তাঁর কথায়, “প্রতিবাদও সংলাপের একটি পথ। গণতন্ত্রে প্রতিবাদ হল ঐকমত্য গড়ে তোলার একটি উপায়।” আন্দোলনে অংশ নেওয়া তরুণদের ‘দেশবিরোধী’ তকমা দেওয়া উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে বিজয়াদশমীর ভাষণে ভাগবত যথার্থ ক্ষোভ এবং সেই ক্ষোভকে কাজে লাগানোর চেষ্টার মধ্যে একটি পার্থক্য টানেন। তিনি বলেন, ব্যবস্থার সমস্যা ও ত্রুটির কারণে ‘স্বাভাবিক ভাবেই’ আন্দোলন হতে পারে। কিন্তু তাঁর সতর্কবার্তা ছিল, ভারতে অস্থিরতা তৈরি করতে চায় এমন শক্তি এই আন্দোলনগুলিকে ব্যবহার করতে পারে।
এসআইআর-বিরোধী আন্দোলনের নাম না করে তিনি বলেন, ‘বহিরাগত শক্তি’ বিভেদ বাড়াচ্ছে, মানুষের মধ্যে বঞ্চিত ও নিপীড়িত হওয়ার অনুভূতি উসকে দিচ্ছে, প্রতিষ্ঠানগুলির প্রতি বিশ্বাস দুর্বল করছে এবং ‘বিরোধ, তীব্র অসন্তোষ, বিচ্ছিন্নতাবাদ, বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা’ তৈরি করছে।
বিদেশি ভূমিকার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে সঙ্ঘের ওই পদাধিকারী বলেন, “কোনও দেশে জনবিক্ষোভ হলেই কিছু বিদেশি শক্তি তার সুযোগ নিতে চায়। চলতি আন্দোলনগুলির ক্ষেত্রে তা ইতিমধ্যেই প্রমাণিত হয়েছে। মেটা তো ক্ষমাও চেয়েছে।”
কিন্তু এসআইআর আন্দোলনে বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রমাণ করে, এমন কোনও স্বীকারোক্তি মেটা করেছে বলে প্রকাশ্যে প্রতিষ্ঠিত তথ্য নেই। অগস্টে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর একটি পোস্ট ফেসবুকে সাময়িক বিধিনিষেধের মুখে পড়ার পরে মেটা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে ক্ষমা চেয়েছিল। সংস্থাটি ঘটনাটিকে ‘পরিচালনগত ত্রুটি’ বলে ব্যাখ্যা করেছিল।
আরও সম্প্রতি, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারীদের সামনে কী ভাবে বিষয়বস্তু সুপারিশ করে, তা নিয়ে মেটার কাছে উদ্বেগ জানিয়েছে সরকার। ১০ অক্টোবরের একটি নির্দেশিকায় কেন্দ্রীয় বৈদ্যুতিন ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রক মেটাকে বলেছে, তাদের সুপারিশব্যবস্থা যেন ব্যবহারকারীদের সামনে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ভাবে ‘একটিমাত্র বা সীমিত কয়েকটি বয়ান’ তুলে না ধরে। বিভ্রান্তিকর কিংবা প্রসঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন করে উপস্থাপিত বিষয়বস্তুর উপর আরও নজরদারির কথাও বলা হয়েছে।
সমাজমাধ্যমের নতুন চ্যালেঞ্জ
‘নতুন মাধ্যমগুলিতে প্রচারিত বিষয়বস্তু’ নিয়ে প্রস্তাবিত আলোচনা আর একটি কারণেও তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণদের আন্দোলন সঙ্ঘ পরিবারের সামনে রাজনৈতিক যোগাযোগের নতুন একটি সমস্যা স্পষ্ট করে দিয়েছে।
ফেসবুক, এক্স এবং হোয়াটসঅ্যাপকে ঘিরে বিজেপি রাজনৈতিক প্রচারের এক শক্তিশালী ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল। কিন্তু ইনস্টাগ্রাম ও স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিওর রাজনৈতিক ভাষা আয়ত্ত করা তাদের পক্ষে তুলনায় কঠিন হয়ে উঠেছে। সিজেপির জন্মই হয়েছিল সমাজমাধ্যমে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের একটি প্রবণতা হিসেবে। হাস্যরস, প্রচলিত কর্তৃত্বকে তোয়াক্কা না করা মনোভাব এবং জনপ্রিয় সংস্কৃতির নানা অনুষঙ্গ ব্যবহার করে চাকরি ও পরীক্ষা ব্যবস্থার অনিয়ম নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল তারা। পরে সেই ক্ষোভ নেমে আসে রাস্তায়।
বিক্ষোভের পরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং বিজেপিকে আরও বেশি করে মোবাইলের পর্দার উপযোগী লম্বালম্বি ভিডিও, অনানুষ্ঠানিক উপস্থাপনা এবং তরুণদের পছন্দের ধরন নিয়ে পরীক্ষা করতে দেখা যায়। সংসদের বাদল অধিবেশনে এনডিএর তরুণ সাংসদেরাও ‘ডেলুলু’, ‘ফোমো’ এবং ‘ক্লক্ড ইট’-এর মতো অভিব্যক্তি ব্যবহার করেন।
কিন্তু সমস্যাটি শুধু এক মঞ্চ থেকে অন্য মঞ্চে রাজনৈতিক বার্তা সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার নয়। ইনস্টাগ্রাম ও একই ধরনের মাধ্যমগুলিতে হাস্যরস, শ্লেষ, স্বতঃস্ফূর্ততা এবং স্বতন্ত্র নির্মাতাদের তৈরি বিষয়বস্তু বেশি গুরুত্ব পায়। এই ভাষা বিজেপির কেন্দ্রীয় ভাবে নিয়ন্ত্রিত, পরিপাটি প্রচারবার্তার থেকে অনেকটাই আলাদা। সমাজমাধ্যমের আগের পরিসরে সেই প্রচারপদ্ধতি সফল ভাবে ব্যবহার করেছিল দলটি।
এসআইআর-বিরোধী আন্দোলনেও প্রতিবাদ এবং পুলিশি পদক্ষেপকে ঘিরে মিম, ভিডিও, ব্যঙ্গরচনা, এমনকি অনলাইন গেম তৈরি হয়েছে।
এদিকে, আগামী ২৯ নভেম্বর দিল্লির রোহিণীতে ‘রাষ্ট্র বন্দনম’ নামে শতবর্ষের একটি বড় অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিচ্ছে সঙ্ঘ। সেক্টর ২৩-এর ওই সমাবেশে ভাগবতের ভাষণ দেওয়ার কথা। সঙ্ঘ সূত্রের অনুমান, এক লক্ষের বেশি স্বয়ংসেবক ও আমন্ত্রিত ব্যক্তি সেখানে অংশ নেবেন।
সঙ্ঘের এক পদাধিকারী বলেন, “শতবর্ষ উদ্যাপনের পাশাপাশি এটি শক্তিপ্রদর্শনও হবে—এমন একটা সময়ে, যখন বিরোধীরা সরকারের বিরুদ্ধে অস্থিরতায় ইন্ধন দিচ্ছে।”
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
মন্তব্য করতে আপনার বাংলাস্ফিয়ার অ্যাকাউন্টে লগইন করুন। সদস্যতা কেনার প্রয়োজন নেই।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।