টাটা সন্সের পর্ষদ ও টাটা ট্রাস্টসের চেয়ারম্যান পদে বহাল থাকবেন তিনি। গোষ্ঠীর নির্ধারিত অবসরনীতির সঙ্গেই এই সিদ্ধান্তের যোগ, সাম্প্রতিক পরিচালনাগত মতপার্থক্যের নয়।

আগামী ১২ নভেম্বর ৭০ বছরে পা দেবেন টাটা ট্রাস্টসের চেয়ারম্যান নোয়েল টাটা। ওই দিনই টাটা গোষ্ঠীর ছয়টি প্রধান সংস্থার পরিচালন পর্ষদ থেকে সরে দাঁড়াবেন তিনি। গোষ্ঠীর অ-নির্বাহী পরিচালকদের জন্য নির্ধারিত অবসরনীতি মেনেই এই সিদ্ধান্ত। ফলে টাটা সন্সের নেতৃত্ব ও পরিচালনা নিয়ে টাটা ট্রাস্টসের সঙ্গে চলতি মতপার্থক্যের জেরে তাঁর এই বিদায়—এমনটা ভাবার কারণ নেই।

নোয়েলের অবসরের পরিকল্পনা অবশ্য আজকের নয়। জুন মাসে ট্রেন্টের বার্ষিক সাধারণ সভায় শেয়ারহোল্ডারদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি সরে দাঁড়ানোর ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন। পরে ভোল্টাসের বার্ষিক সাধারণ সভাতেও একই ঘোষণা করেন। সংস্থার চেয়ারম্যান হিসেবে সেটিই তাঁর শেষ বার্ষিক সাধারণ সভা বলে জানিয়েছিলেন তিনি।

ট্রেন্টের সভায় তাঁর ঘোষণার পরেই ভোল্টাসের চেয়ারম্যান পদ ছাড়ার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিল ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’।

বিরোধ নয়, নিয়মের বিদায়

টাটা গোষ্ঠীর পরিচালনা নিয়ে সাম্প্রতিক টানাপড়েনের আবহে নোয়েলের এই সিদ্ধান্ত নতুন করে আলোচনায় এসেছে। টাটা সন্সের চেয়ারম্যান এন চন্দ্রশেখরনকে তৃতীয়বারের জন্য পাঁচ বছরের মেয়াদে পুনর্নিয়োগের প্রস্তাব ঘিরে আপত্তি জানিয়েছিলেন নোয়েল। টাটা সন্সকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়েও তাঁর বিরোধিতা ছিল। সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি এবং টাটা ট্রাস্টসের মনোনীত পরিচালকদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন তিনি।

তবে এই মতপার্থক্যের সঙ্গে ছয়টি সংস্থার পর্ষদ থেকে নোয়েলের সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তকে এক করে দেখা ঠিক হবে না। টাটা গোষ্ঠীতে অ-নির্বাহী পরিচালকদের অবসরের বয়স ৭০ বছর। সেই নিয়ম মেনেই তাঁর এই পদক্ষেপ। পরিচালনা নিয়ে মতবিরোধের সময়ে তিনি সরে দাঁড়াচ্ছেন বলেই দু’টি ঘটনাকে পরস্পরের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া যায় না।

এমনকি টাটা সন্সের চেয়ারম্যান এন চন্দ্রশেখরনকেও ৭০ বছর বয়সে অবসর নিতে হবে। বর্তমানে তিনি টাটা মোটরস, টাটা স্টিল, ইন্ডিয়ান হোটেলস এবং টিসিএসের মতো গোষ্ঠীর গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলির চেয়ারম্যান।

তবু ক্ষমতার কেন্দ্রে

ছয়টি সংস্থার পর্ষদ ছাড়লেও টাটা গোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় পরিচালনব্যবস্থা থেকে বিদায় নিচ্ছেন না নোয়েল। কারণ, টাটা সন্সের পর্ষদে টাটা ট্রাস্টসের মনোনীত পরিচালকদের ক্ষেত্রে অবসরের নিয়ম আলাদা। তাঁদের বয়স ৭৫ বছর পেরোলে প্রতি বছর মেয়াদ পর্যালোচনা করা হয়। সেই নিয়মের জেরেই ছয়টি সংস্থার দায়িত্ব ছাড়ার পরেও টাটা সন্সের পর্ষদে থাকতে পারবেন নোয়েল।

দীর্ঘদিন টাটা গোষ্ঠীর নেতৃত্ব দেওয়া রতন টাটাও নির্ধারিত অবসরনীতি মেনেছিলেন। ২০১২ সালের ডিসেম্বরে সংশ্লিষ্ট পদের অবসরের বয়সে পৌঁছে টাটা সন্সের চেয়ারম্যান পদ থেকে সরে দাঁড়ান তিনি। তবে টাটা ট্রাস্টসের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যান। ২০২৪ সালের অক্টোবরে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত গোষ্ঠীর বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর প্রভাব বজায় ছিল।

নোয়েলের ক্ষেত্রেও ছবিটা অনেকটা তেমনই। ছয়টি সংস্থার পর্ষদ থেকে সরে দাঁড়ালে গোষ্ঠীর ব্যবসা পরিচালনায় তাঁর আনুষ্ঠানিক ভূমিকা কমবে। কিন্তু টাটা সন্সের পর্ষদ এবং টাটা ট্রাস্টসের চেয়ারম্যান পদে বহাল থাকায় গোষ্ঠীর গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিসরে তাঁর উপস্থিতি বজায় থাকবে।

এ বার উত্তরসূরির পালা

ছয়টি সংস্থায় নোয়েলের উত্তরসূরি কারা হবেন, তা এখনও ঘোষণা করা হয়নি। তাঁর বিদায়ের পর নেতৃত্বের দায়িত্ব কীভাবে ভাগ হবে, তা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির পর্ষদকেই ঠিক করতে হবে। পাশাপাশি ব্যবসায়িক কৌশল ও পরিচালনার ধারাবাহিকতা বজায় রাখাও তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হবে।

আপাতত বিষয়টি স্পষ্ট—নভেম্বরে ছয়টি পর্ষদ থেকে নোয়েল টাটার সরে দাঁড়ানো নির্ধারিত অবসরনীতিরই অংশ। কয়েক মাস আগেই তিনি সেই সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তবে ব্যবসায়িক দায়িত্ব থেকে সরে গেলেও টাটা গোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় পরিচালনব্যবস্থায় তাঁর ভূমিকা শেষ হচ্ছে না।