সরকারি তদন্তে উঠে এসেছে, খংবাল সুনুলোক পাহাড়ে মেইতেই সম্প্রদায়ের কিছু মানুষ নিয়মিত গাছ কেটে কাঠ নিয়ে যাচ্ছিলেন বলে স্থানীয় জঙ্গিগোষ্ঠীগুলির কাছে অভিযোগ জানিয়েছিলেন এলাকার গ্রামবাসীরা। সেই গাছ কাটাকে কেন্দ্র করেই মেইতেইদের হত্যার ঘটনার সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা।

মেইতেইদের হত্যায় কুকি ন্যাশনাল ফ্রন্টের নেহলুন গোষ্ঠীর জড়িত থাকার সন্দেহ করছেন আধিকারিকেরা। তবে সংগঠনটি কোনও ভূমিকা থাকার কথা অস্বীকার করেছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত এক আধিকারিক বলেন, “মনে হচ্ছে, প্রথমে উদ্দেশ্য ছিল মেইতেইদের ভয় দেখানো, অথবা খুব বেশি হলে তাঁদের আটক করে মুক্তির বিনিময়ে টাকা আদায় করা। কিন্তু পরিস্থিতি ভয়াবহ দিকে মোড় নেয় এবং মানুষ খুন হন।”

কুকি সংগঠনগুলির সূত্রে ঘটনাটিকে দুর্ভাগ্যজনক এবং অত্যন্ত অনুপযুক্ত সময়ে ঘটে যাওয়া ঘটনা বলে বর্ণনা করা হয়েছে। তাদের বক্তব্য, গত ন’মাস ধরে নাগাদের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে রয়েছে কুকিরা। এর মধ্যেই মেইতেইদের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতের চেষ্টা চলছিল।

হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে তিন জন গ্রামরক্ষী স্বেচ্ছাসেবককে গ্রেফতার করেছে মণিপুর পুলিশ। পরে তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মাটির নীচে লুকিয়ে রাখা আটটি অস্ত্র উদ্ধার করেন তদন্তকারীরা। অন্য এক আধিকারিক বলেন, “এই বন্দুকগুলির মধ্যে একটি থেকে সম্প্রতি গুলি চালানো হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডে ওই বন্দুকটিই ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, তা জানতে ফরেনসিক পরীক্ষা চলছে।”

এই তদন্তের জেরে ‘সাসপেনশন অব অপারেশনস’ বা অভিযান স্থগিত রাখার চুক্তির আওতায় থাকা কুকি জঙ্গিশিবিরগুলিও নতুন করে নজরদারির মুখে পড়েছে। গত ২০ অক্টোবর হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থলের কাছেই সেমল গ্রামের সিনাই শিবিরে আচমকা তল্লাশি চালায় নিরাপত্তাবাহিনী। সেখানে “গুরুতর অসংগতি” ধরা পড়ে বলে জানা গিয়েছে।

ওই চুক্তির মেয়াদ গত মাসে শেষ হয়েছে। এখনও তা নবীকরণ করা হয়নি। চুক্তি অনুযায়ী, সিনাই শিবিরে কুকি ন্যাশনাল আর্মি বা কেএনএ এবং কুকি লিবারেশন আর্মি বা কেএলএ-র মোট ১৫৯ জন নথিভুক্ত সদস্যের থাকার কথা। কিন্তু নিরাপত্তাবাহিনীর দাবি, শিবিরে পাওয়া যায় মাত্র ১৮ জনকে। তাঁদের মধ্যে মাত্র এক জনই ছিলেন যথাযথভাবে নথিভুক্ত সদস্য।

আধিকারিকদের বক্তব্য, বাকি ১৭ জন ভুয়ো পরিচয় ব্যবহার করে নথিভুক্ত কুকি জঙ্গিদের জায়গায় নিজেদের উপস্থিত দেখাচ্ছিলেন। তাঁদের মধ্যে আট জন কেএনএ এবং ন’জন কেএলএ সদস্যের পরিচয় নিয়েছিলেন। ওই ১৭ জনকেই গ্রেফতার করা হয়েছে। আদালত তাঁদের পুলিশ হেফাজতে পাঠিয়েছে।

এক আধিকারিক বলেন, “অনুপস্থিত সদস্যদের বিষয়ে জঙ্গিগোষ্ঠীগুলিকে প্রশ্ন করা হয় এবং পরবর্তী দু’দিনের মধ্যে তাঁদের হাজির করতে বলা হয়। তারা তা করতে না পারায় নিরাপত্তাবাহিনী শিবিরটির নিয়ন্ত্রণ নেয়।”

শিবির থেকে ২৪টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৩৮টি ম্যাগাজিনও বাজেয়াপ্ত করেন নিরাপত্তাকর্মীরা। মণিপুর পুলিশের এক আধিকারিক জানান, কয়েকটি ম্যাগাজিন ও কিছু গোলাবারুদের হদিস পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে।

গত ২৫ অক্টোবর মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রী ইয়ুমনাম খেমচাঁদ সিংহ ওই শিবির পরিদর্শন করেন।

সূত্রের বক্তব্য, কুকি শিবিরগুলিতে এ ধরনের আকস্মিক পরিদর্শন নতুন নয়। চলতি বছরের মে মাসে কুকি জঙ্গিগোষ্ঠীগুলির হাতে অপহৃত ছয় নাগাকে হত্যার ঘটনার পর থেকেই এই তল্লাশি চলছে। এক পুলিশ আধিকারিক বলেন, “তার পর থেকে তিন-চারটি শিবিরে এ ধরনের পরীক্ষা হয়েছে।”

সেই পরিদর্শনগুলিতেও নথিভুক্ত জঙ্গিদের মাত্র ৩০ থেকে ৪০ শতাংশকে শিবিরে পাওয়া গিয়েছিল বলে সূত্রের খবর। অনুপস্থিতির ব্যাখ্যায় জঙ্গিগোষ্ঠীগুলি নিরাপত্তাবাহিনীকে জানিয়েছিল, তাদের কিছু সদস্য মারা গিয়েছেন, অন্যরা চলে গিয়েছেন।

সূত্র জানিয়েছে, এখন সংগঠনগুলিকে শিবিরে থাকা প্রত্যেকের পরিচয় যাচাই করাতে এবং নথিভুক্ত সদস্যদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। তা না হলে শিবিরে বসবাসকারী জঙ্গিদের জন্য নির্ধারিত ভাতা আটকে দিতে পারে সরকার।