বেতনের সঙ্গে অনুমোদনহীন ভাতা যোগ করে বিপুল অঙ্কের টাকা তোলা, সরকারি পোর্টালের লগইন পরিচয়পত্রের অপব্যবহার এবং অস্তিত্বহীন শিক্ষকের নামে অর্থ মেটানোর অভিযোগ উঠে এল বিহার সরকারের অভ্যন্তরীণ অডিটে। নওয়াদা, পটনা ও ভাগলপুরের তিনটি ঘটনায় এই অনিয়মের সন্ধান মিলেছে। অভিযোগপত্র ও প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লিখিত অঙ্ক অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলিতে মোট প্রায় ১ কোটি ৮৫ লক্ষ টাকা অনিয়মিতভাবে মেটানোর অভিযোগ রয়েছে। এর জেরে পুলিশি তদন্ত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা শুরু হয়েছে। প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, অন্তত চারজন আধিকারিক ও কর্মীকে সাসপেন্ড করা হয়েছে।

বিহারের শিক্ষামন্ত্রী মিথিলেশ তিওয়ারি জানিয়েছেন, রাজ্যের ৩৮টি জেলাতেই অডিট চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, “নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে অভ্যন্তরীণ অডিট শেষ করতে আধিকারিকদের নির্দেশ দিয়েছি। মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা বা এইচআরএমএসে তথ্যের কারসাজি আটকাতে বিশেষজ্ঞদেরও কাজে লাগানো হচ্ছে। এই তিনটি ঘটনার অনুসন্ধানে যে তথ্য উঠে এসেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অনলাইনে অর্থ মেটানোর আরও উন্নত ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কেও তা আমাদের সতর্ক করেছে। দুর্নীতিগ্রস্ত শিক্ষক ও আধিকারিকদের বিরুদ্ধে অভিযান চলবে।”

প্রথম ঘটনা: নওয়াদা

নওয়াদায় আর্থিক লেনদেন ও পোর্টালের অভ্যন্তরীণ অডিটে প্রাথমিক বিদ্যালয় স্তরে অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে।

২০২৬ সালের ১৩ অক্টোবর নওয়াদা টাউন থানায় একটি এফআইআর দায়ের করা হয়। ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ৩১৬(২) ও ৩১৬(৫) ধারায় অপরাধমূলক বিশ্বাসভঙ্গ এবং ৩৩৬(৩), ৩৩৮ ও ৩৪০(২) ধারায় জালিয়াতির অভিযোগ আনা হয়েছে। পাশাপাশি, ২০১৮ সালে সংশোধিত দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৮৮-এর ১৩ ধারায় সরকারি কর্মীর অপরাধমূলক অসদাচরণের অভিযোগও যুক্ত করা হয়েছে।

নওয়াদার জেলা শিক্ষা আধিকারিকের দায়ের করা অভিযোগে অভিযুক্ত হিসেবে নাম রয়েছে রাজৌলির বেলাডিহের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষিকা, পোর্টালে ‘মেকার’ হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত এক করণিক এবং ‘চেকার’ হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত এক প্রধান করণিকের।

এফআইআরে বলা হয়েছে, রাজৌলির ব্লক শিক্ষা আধিকারিক অনুমোদিত বেতনপত্র অনুযায়ী, ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে ওই শিক্ষিকার মোট মাসিক বেতন ছিল ৪৬,৭৭২ টাকা। কিন্তু অভিযোগ, মেকার ও চেকার ‘অন্যান্য ভাতা’ খাতে অনুমোদনহীনভাবে ৪,৫২,২২২ টাকা যুক্ত করে এপ্রিলের প্রাপ্য অর্থ বাড়িয়ে ৪,৯১,৭৭২ টাকা করেন।

২০২৫ সালের মে মাসেও ব্লক শিক্ষা আধিকারিক ওই শিক্ষিকার বেতন হিসেবে ৪৬,৭৭২ টাকা অনুমোদন করেছিলেন। কিন্তু এফআইআর অনুযায়ী, অনুমোদনহীন ভাতা যোগ করে তাঁকে দেওয়া হয় ৩,৪৯,৫০০ টাকা।

এফআইআরে আরও বলা হয়েছে, নওয়াদার স্টেট ব্যাঙ্কের সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট পরীক্ষা করে দেখা যায়, সমগ্র শিক্ষা তহবিল থেকেও ওই শিক্ষিকাকে ২,৮৬,০০০ টাকা দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগপত্রে স্পষ্ট বলা হয়েছে, সমগ্র শিক্ষা তহবিলের অর্থ এভাবে অন্য খাতে ব্যবহার করা উচিত হয়নি। এই অর্থ তাঁর বেতনের অংশও ছিল না। কারণ, ‘বিশিষ্ট শিক্ষক’ হিসেবে উন্নীত হওয়ার পরে তাঁর বেতন এইচআরএমএস পোর্টালের মাধ্যমেই পাওয়ার কথা।

এফআইআর অনুযায়ী, সব মিলিয়ে ওই শিক্ষিকা অনুমোদনহীনভাবে ১০,৪৩,৯৫০ টাকা পেয়েছেন।

তদন্তকারীরা ওই শিক্ষিকার সঙ্গে অর্থ অনুমোদনের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের সম্ভাব্য যোগসূত্রের কথাও জানিয়েছেন। তাঁদের নজরে এসেছে, ২০২৫ সালের ২০ মে ওই শিক্ষিকার স্টেট ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে সতীশ কুমার নামে এক ব্যক্তির পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ১ লক্ষ টাকা পাঠানো হয়েছিল।

পুলিশের সন্দেহ, ওই অ্যাকাউন্টের মালিক এবং দফতরের প্রধান করণিক তথা পোর্টালের চেকার সতীশ কুমার একই ব্যক্তি হতে পারেন। তবে অ্যাকাউন্টধারীর পরিচয় এবং অভিযোগে উল্লিখিত যোগসূত্র এখনও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তদন্তকারীদের বক্তব্য, ১০ লক্ষ টাকার বেশি অতিরিক্ত অর্থ মেটানোকে “করণিকের ভুল” বলে ব্যাখ্যা করা যায় না।

দ্বিতীয় ঘটনা: পটনা

২০২৬ সালের ১৪ অক্টোবর পটনার জেলা শিক্ষা আধিকারিক যোগেশ কুমার গুলজারবাগের এফএনএস অ্যাকাডেমির করণিক বিজয় কুমার বিদ্যার্থীকে সাসপেন্ড করেন। সরকারি ও বিভাগীয় তহবিলের ৭৬,৭১,৯৮৩ টাকা সংক্রান্ত আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

সাসপেনশনের নির্দেশ অনুযায়ী, বিদ্যার্থী জেলা শিক্ষা আধিকারিকের সরকারি ‘মেকার লগইন আইডি’ ব্যবহার করে পোর্টালে অনুমোদনহীন তথ্য নথিভুক্ত করেন এবং অতিরিক্ত অর্থ মেটানোর ব্যবস্থা করেন বলে অভিযোগ। তাঁর বিরুদ্ধে প্রতারণা, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র এবং বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ আনা হয়েছে।

সাসপেনশনের মেয়াদে তাঁর নির্ধারিত দফতর করা হয়েছে ঘোসওয়ারির ব্লক শিক্ষা আধিকারিকের কার্যালয়। যাচাইকৃত হাজিরার রিপোর্টের ভিত্তিতে তিনি খোরপোশ ভাতা পাবেন। পাশাপাশি আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র তৈরি ও বিভাগীয় তদন্তের প্রক্রিয়া চলছে। সাসপেনশনের নির্দেশের প্রতিলিপি এফএনএস অ্যাকাডেমির প্রধান শিক্ষক, পটনার ট্রেজারি আধিকারিক এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দফতরের আধিকারিকদের কাছে পাঠানো হয়েছে।

তৃতীয় ঘটনা: ভাগলপুর

২০২৬ সালের ২১ অক্টোবর জারি করা একটি সরকারি নির্দেশে শিক্ষা দফতরের অধিকর্তা—প্রশাসন—বিজয় কুমার পাণ্ডে জানান, ভাগলপুরের জেলা কর্মসূচি আধিকারিক শশী চন্দন চৌধুরীর বিরুদ্ধে ৮ অক্টোবর জোগসর থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। অভিযোগ, এইচআরএমএস পোর্টালের মাধ্যমে এক অস্তিত্বহীন শিক্ষকের নামে অনুমোদনহীনভাবে অর্থ মেটানো হয়েছিল। পরের দিন চৌধুরীকে গ্রেফতার করা হয়। তবে কত টাকা তোলা হয়েছিল, ওই নির্দেশে তা উল্লেখ করা হয়নি।

ভাগলপুরের আরেকটি ঘটনায়, তনুশ্রী নামে এক অস্তিত্বহীন শিক্ষকের নামে কয়েক মাস ধরে মোট ৯৮,১২,৭৭৩ টাকা অনুমোদনহীনভাবে মেটানোর অভিযোগে জেলা শিক্ষা আধিকারিককে সাসপেন্ড করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধেও ২০২৬ সালের ৮ অক্টোবর জোগসর থানায় মামলা দায়ের করা হয়।