বিহারের বিধান পরিষদ নির্বাচনে প্রথমবার খাতা খুলল প্রশান্ত কিশোরের জন সুরাজ পার্টি। অন্যদিকে, পাটনায় বিজেপির দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটিতে জয় পেল রাষ্ট্রীয় জনতা দল বা আরজেডি। আবার দলের ভিতর থেকে প্রকাশ্য বিরোধিতার মুখে পড়েও নিজের আসন ধরে রাখলেন জনতা দল ইউনাইটেড বা জেডিইউয়ের প্রধান মুখপাত্র নীরজ কুমার। সব মিলিয়ে এই নির্বাচনের ফল বিহারের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সামনে সাফল্য ও দুর্বলতা—দুইয়েরই ছবি তুলে ধরেছে।
পাটনায় পাঁচবারের বিধান পরিষদ সদস্য তথা বিজেপি প্রার্থী নওলকিশোর যাদবকে হারিয়েছেন আরজেডির সঞ্জীব কুমার সিংহ। সঞ্জীব পরবত্তার প্রাক্তন বিধায়ক। রাজধানীর যে আসন বিজেপি বহু বছর ধরে নিজেদের দখলে রেখেছিল, সেখানে এই জয় আরজেডিকে গুরুত্বপূর্ণ জমি দিল।
এই ফল দেখাচ্ছে, চিরাচরিত শক্ত ঘাঁটির বাইরেও বিজেপিকে চ্যালেঞ্জ জানানোর ক্ষমতা রয়েছে আরজেডির। তবে এই সাফল্য এসেছে এমন এক পরিস্থিতিতে, যখন বিরোধী শিবির বিভক্ত এবং বিভিন্ন দল ও প্রার্থী একই ভোটারগোষ্ঠীর সমর্থন পেতে পরস্পরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
জন সুরাজের বড় সাফল্য এসেছে দ্বারভাঙা শিক্ষক আসনে। সেখানে দলের প্রার্থী সুরেশপ্রসাদ রাই পরাজিত করেছেন দু’বারের বিধান পরিষদ সদস্য তথা বিহার কংগ্রেসের প্রাক্তন সভাপতি মদনমোহন ঝাকে। এই জয় নবীন দলটিকে বিধান পরিষদে প্রথম পা রাখার সুযোগ করে দিল।
পাটনা স্নাতক আসনের লড়াইয়ে আবার প্রকাশ্যে চলে এসেছিল জেডিইউয়ের অন্তর্দ্বন্দ্ব। দলের প্রধান মুখপাত্র নীরজ কুমারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন মোকামার বিধায়ক অনন্তকুমার সিংহ। জন সুরাজ প্রার্থী অনুজ সিংহের সমর্থনে সক্রিয় প্রচারও চালান তিনি।
অনন্ত সিংহ যখন নিজের দলের প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রচার করছিলেন, তখন জেডিইউ নেতৃত্ব হস্তক্ষেপ করেনি। তবে ভোটের পরে তাঁকে এবং তাঁর স্ত্রী নীলম দেবীকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
প্রচারের প্রবল চাপের মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন নীরজ কুমার। তা সত্ত্বেও পাটনা স্নাতক আসন থেকে টানা চতুর্থবার জিতেছেন তিনি। ২০০৮ সালে এই আসনে প্রথম জয়ী হয়েছিলেন নীরজ। অনন্ত সিংহের সমর্থন পাওয়া জন সুরাজ প্রার্থীকে তৃতীয় স্থানে ঠেলে দিয়েছেন তিনি।
এই ফল একদিকে দলের ভিতর থেকে আসা চ্যালেঞ্জ সামলে নীরজের জেতার ক্ষমতা প্রমাণ করেছে। অন্যদিকে, জেডিইউয়ের অভ্যন্তরীণ টানাপড়েনও স্পষ্ট করে দিয়েছে।
তিরহুত শিক্ষক আসনে জয়ী হয়েছেন বিজেপির নরেন্দ্রপ্রসাদ সিংহ। পরাজিত বিদায়ী সিপিআই বিধান পরিষদ সদস্য সঞ্জয় কুমার সিংহ নেমে গিয়েছেন তৃতীয় স্থানে। হাড্ডাহাড্ডি ত্রিমুখী লড়াইয়ে দ্বিতীয় হয়েছেন নির্দল প্রার্থী ভূষণ কুমার ঝা।
সারণ শিক্ষক আসনে জয় পেয়েছেন বিজেপির বিদ্রোহী প্রার্থী রাহুল রাজ। নির্দল হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি হারিয়েছেন বিদায়ী নির্দল বিধান পরিষদ সদস্য আফাক আহমেদকে। এই ফল দেখিয়েছে, বড় রাজনৈতিক দলের আনুষ্ঠানিক সমর্থন না থাকলেও প্রতিষ্ঠিত দলের বিদ্রোহী প্রার্থীরা নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারেন।
দু’টি স্নাতক আসনেও জয় পেয়েছে বিজেপি। দ্বারভাঙায় আরজেডির অনিল কুমার ঝাকে হারিয়েছেন সর্বেশ কুমার। কোশিতে আরজেডি প্রার্থী নীতেশ কুমারকে পরাজিত করেছেন এন কে যাদব।
এই নির্বাচনের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা জন সুরাজের বিধান পরিষদে প্রবেশ। দ্বারভাঙা শিক্ষক আসনে জয় এবং পাটনা স্নাতক আসনে দলের উপস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, সাম্প্রতিক নির্বাচনী প্রচারের মাধ্যমে গড়ে তোলা সমর্থনভিত্তির বাইরেও ভোটারদের আকৃষ্ট করতে পারছে প্রশান্ত কিশোরের দল।
শিক্ষক ও স্নাতক আসনের শিক্ষিত ভোটারদের একাংশের কাছে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হওয়ায় জন সুরাজের সামনে নতুন রাজনৈতিক সুযোগ খুলতে পারে। এত দিন এই পরিসরে মূলত প্রতিষ্ঠিত দলগুলিরই প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলত। তবে কয়েকটি আসনের সাফল্যকে বৃহত্তর ও স্থায়ী নির্বাচনী শক্তিতে পরিণত করা দলটির কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়েই থাকছে।
আরজেডির কাছে পাটনার জয় প্রতীকী ও রাজনৈতিক—দুই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। রাজ্যের রাজধানীতে বিজেপির পাঁচবারের বিধান পরিষদ সদস্যকে হারানো দেখিয়েছে, নিজেদের পরিচিত শক্ত ঘাঁটির বাইরেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ক্ষমতা রয়েছে তাদের।
অন্যদিকে, দ্বারভাঙা শিক্ষক আসনে মদনমোহন ঝায়ের পরাজয় কংগ্রেসের সাংগঠনিক শক্তি নিয়ে আরও প্রশ্ন তুলে দিল।
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
মন্তব্য করতে আপনার বাংলাস্ফিয়ার অ্যাকাউন্টে লগইন করুন। সদস্যতা কেনার প্রয়োজন নেই।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।