মহারাষ্ট্রের বিধান পরিষদের পাঁচটি আসনের মধ্যে সর্বশেষ গণনার প্রবণতায় তিনটিতে এগিয়ে ছিল শাসক মহাযুতি এবং দু’টিতে বিরোধী মহাবিকাশ আঘাড়ি। নাগপুরের স্নাতক আসনে প্রথম দফায় পিছিয়ে পড়ার পরে কংগ্রেসের বিদায়ী বিধান পরিষদ সদস্য অভিজিৎ ওয়াঞ্জারিকে টপকে এগিয়ে যান বিজেপির সুধাকর কোহালে। অন্য দিকে, পুণে ও ছত্রপতি সম্ভাজীনগরের স্নাতক আসন—দু’টিতেই এগিয়ে ছিলেন এনসিপি (শরদ পওয়ার)-এর প্রার্থীরা।

পুণের শিক্ষক আসনেও বিজেপি এগিয়ে ছিল। অমরাবতীর শিক্ষক আসনে এগিয়ে ছিল শিবসেনা।

এই প্রবণতা শেষ পর্যন্ত বজায় থাকলে বিজেপির প্রার্থী বাছাইয়ের পদ্ধতি, অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ সামলানোর ক্ষমতা এবং চিরাচরিত শক্ত ঘাঁটিতে সমর্থন একজোট করার সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হবে।

দলের পুরনো অনুগত কর্মী-নেতাদের সরিয়ে রাখার অভিযোগে গোড়া থেকেই বিজেপির ভিতরে অসন্তোষ ছিল। ভোটের ফলাফলে সেই উদ্বেগের কিছুটা প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। বিশেষত নাগপুরে, যেখানে শক্তিশালী সংগঠন থাকা সত্ত্বেও দলকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে।

নাগপুরে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই

নাগপুরের স্নাতক আসনে নির্দল প্রার্থী নীতেশ কারালের উল্লেখযোগ্য ভোটপ্রাপ্তি লড়াইয়ে আর একটি মাত্রা যোগ করেছে। বিজেপির কাছে এই আসনের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। অতীতে রাজ্যে কংগ্রেস-এনসিপি জোট ক্ষমতায় থাকাকালেও এই কেন্দ্রে বিজেপির প্রাধান্য বজায় ছিল। তবে ২০২০ সালে বিজেপি নেতা তথা প্রাক্তন মেয়র সন্দীপ জোশী এই আসনে হেরে যান।

এ বারের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা বুঝিয়ে দিচ্ছে, স্নাতক ভোটারদের মধ্যে নিজেদের চিরাচরিত সমর্থনকে বিজেপি নিশ্চিত ধরে নিতে পারে না। জাতপাত, সম্প্রদায়, ধর্ম ও মতাদর্শের ভিত্তিতে ভোটারদের মধ্যে বিভাজন রয়েছে। ফলে বিজেপি যতটা আন্দাজ করেছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠেছে এই কেন্দ্র।

নাগপুরে বিজেপির চ্যালেঞ্জ এসেছে দলের ভিতর থেকেও। প্রবীণ নেতা অনিল সোলে দলের কাজকর্মের সমালোচনা করে অভিযোগ তুলেছিলেন, স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে আর পরামর্শ করা হচ্ছে না; সমস্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে উপরমহল থেকে। নির্দল হিসেবে লড়ার হুমকিও দিয়েছিলেন সোলে। শেষ মুহূর্তে তাঁকে বুঝিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরানো হয়।

বিজেপি নাগপুরের স্নাতক আসন ধরে রাখার দাবি করলেও এই লড়াই সংগঠনের ভিতরে উদ্বেগ তৈরি করেছে। দলীয় নেতাদের মতে, ব্যবধান কমে আসা এবং নির্দল প্রার্থীদের ভূমিকা—দু’টিকেই রাজ্য নেতৃত্বের সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা উচিত।

বিজেপির মুখপাত্র নবনাথ বান অবশ্য এই ফলকে ধাক্কা বলতে নারাজ। তাঁর বক্তব্য, “পাঁচটি আসনের মধ্যে মহাযুতির তিনটি, মহাবিকাশ আঘাড়ির দু’টি। বিজেপি যে তিনটি আসনে লড়েছে, তার মধ্যে দু’টিতে এগিয়ে রয়েছে। একে ধাক্কা বা বিপর্যয় বলা হবে কেন?”

ব্যালট পেপারে ভোট হওয়ায় বিজেপির দুর্বল হয়ে পড়া নির্বাচনী অবস্থান প্রকাশ্যে এসেছে—বিরোধীদের এই দাবিও খারিজ করেন বান।

এর আগে শিবসেনা (উদ্ধব বালাসাহেব ঠাকরে)-র সাংসদ সঞ্জয় রাউত বলেছিলেন, ব্যালট পেপারে হওয়া নির্বাচন বুঝিয়ে দিয়েছে বিজেপি কোথায় দাঁড়িয়ে। তাঁর যুক্তি ছিল, আগে যে ভাবে বিজেপি একতরফা জয় পেত, এখন আর তা হচ্ছে না।

প্রার্থী বাছাই নিয়ে একরাশ প্রশ্ন

দলীয় নেতৃত্ব ফলাফলের পক্ষে সওয়াল করলেও বিজেপির অন্দরে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। দলের এক প্রবীণ নেতা বলেন, পুণের স্নাতক আসনে পরাজয় প্রার্থী বাছাইয়ের পদ্ধতি নতুন করে খতিয়ে দেখার প্রয়োজন সামনে এনেছে।

তাঁর প্রশ্ন, “মহারাষ্ট্রের সংস্কৃতি ও শিক্ষার রাজধানী পুণেতে আমরা বহিরাগত স্মিতা যাদবকে প্রার্থী করলাম। প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা তাঁর থাকতেই পারে। কিন্তু দলের ভিতরে এবং আমাদের মূল ভোটারদের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ছিল কি?”

ওই নেতা আরও জানতে চান, যিনি কয়েক দশক ধরে সংগঠনে কাজ করেছেন এবং দলীয় কর্মীদের সঙ্গে যাঁর গভীর যোগাযোগ রয়েছে, এমন কাউকে কেন প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরতে পারল না বিজেপি? আর যদি তেমন কোনও প্রার্থীই পাওয়া না যায়, তা হলে কেন পাওয়া গেল না, সেটাও দলকে খতিয়ে দেখতে হবে বলে তাঁর মত।

সুযোগ দেখছে শরদ পওয়ারের দল

পুণের স্নাতক আসনে বিজেপির পরাজয় এনসিপি (শরদ পওয়ার)-কে হারানো রাজনৈতিক জমি ফিরে পাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। এই লড়াইয়ে অন্যতম লাভবান হিসেবে উঠে এসেছেন হর্ষদা দেশমুখ।

বিধান পরিষদের এই নির্বাচন শাসক মহাযুতি জোটের ভিতরের মতপার্থক্যও প্রকাশ্যে এনেছে। ছত্রপতি সম্ভাজীনগরের স্নাতক আসনে এনসিপি প্রার্থী সতীশ চভান পিছিয়ে ছিলেন এনসিপি (শরদ পওয়ার)-এর প্রতাপসিংহ পাতিলের কাছে। এই লড়াই শরিকদের মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে শাসক জোটের ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

বিজেপি, শিবসেনা এবং এনসিপি একসঙ্গে রাজ্যে ক্ষমতায় থাকলেও নিজেদের প্রার্থীর পিছনে সমর্থন একজোট করতে সমস্যায় পড়েছে জোট। শিবসেনা নেতা আবদুল সাত্তার প্রকাশ্যেই অভিযোগ করেছিলেন, তাঁর দলের সদস্যরা এনসিপি (শরদ পওয়ার)-এর প্রার্থীকে সমর্থন করছেন। এই ঘটনা শরিক দলগুলির উপরে বিজেপির প্রভাবের সীমাবদ্ধতা এবং শাসক জোটের ভিতরে বিদ্রোহ নিয়ন্ত্রণের অসুবিধা স্পষ্ট করেছে।

বিজেপির স্বস্তির জায়গাও রয়েছে

পুণের শিক্ষক আসনে অবশ্য বিজেপির জন্য অন্য ছবি দেখা গিয়েছে। সেখানে কংগ্রেসের বিদায়ী বিধান পরিষদ সদস্য জয়ন্ত আসগাঁওকরের বিরুদ্ধে বিজেপি প্রার্থী কৌস্তুভ গাওড়ে বড় ব্যবধানে এগিয়ে যান। শিবসেনা নির্দল প্রার্থী শচীন সানাপকে সমর্থন করলেও তাঁর প্রার্থিতা বিজেপির সম্ভাবনায় উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারেনি।

অমরাবতীর শিক্ষক আসনে কংগ্রেস প্রার্থী অদিতি পোহারের বিরুদ্ধে এগিয়ে ছিলেন শিবসেনা প্রার্থী তথা বিদায়ী বিধান পরিষদ সদস্য কিরণ সরনায়েক। তবে এই লড়াইয়েও একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী এবং রাজনৈতিক শিবিরগুলির অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্যের প্রভাব দেখা গিয়েছে।

নির্বাচন আধিকারিকদের তথ্য অনুযায়ী, ভোট হওয়া পাঁচটি আসনে মোট ১৮২ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। ২,৪১৯টি ভোটকেন্দ্রে ভোট দেওয়ার অধিকার ছিল মোট ১০ লক্ষ ৬৮ হাজার নথিভুক্ত ভোটারের। সব মিলিয়ে ভোট পড়েছে ৭২.৯৬ শতাংশ।