অসমের কারখানায় তৈরি সব চোখের ওষুধের উৎপাদন, বিক্রি ও বণ্টন বন্ধের নির্দেশ নিয়ন্ত্রকদের; ৩৩২টি ব্যাচ প্রত্যাহার ঘিরে বাড়ছে উদ্বেগ

নয়াদিল্লি: চোখের ওষুধের গুণমান নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের মুখে ভারতের বৃহত্তম ওষুধ প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলির অন্যতম সান ফার্মা। গুণমান নিয়ন্ত্রণ ও ওষুধের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যবস্থায় একাধিক গাফিলতি ধরা পড়ায় অসমের একটি কারখানায় তৈরি সমস্ত চোখের ওষুধের উৎপাদন, বিক্রি ও বণ্টন বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে ভারতের ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলি। রয়টার্সের হাতে আসা সরকারি নথিতে এই তথ্য উঠে এসেছে। ত্রুটি সংশোধন করে নিয়ম মেনে চলার বিষয়ে নিয়ন্ত্রকদের সন্তুষ্ট করতে না পারলে ওই কারখানায় উৎপাদন শুরু করতে পারবে না সংস্থাটি।

ঘটনার সূত্রপাত গত জুলাইয়ে। সে সময় চোখের চিকিৎসায় ব্যবহৃত প্রায় ১১টি ব্র্যান্ডের ওষুধ স্বেচ্ছায় বাজার থেকে তুলে নেওয়ার উদ্যোগ নেয় সান ফার্মা। এর পরেই কেন্দ্রীয় ও রাজ্য ওষুধ নিয়ন্ত্রকদের যৌথ পরিদর্শনে অসমের কারখানাটিতে গুণমান ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত একাধিক ত্রুটি ধরা পড়ে। সেই ভিত্তিতে গত ২০ আগস্ট সেন্ট্রাল ড্রাগস স্ট্যান্ডার্ড কন্ট্রোল অর্গানাইজেশন (সিডিএসসিও) এবং অসমের ড্রাগস কন্ট্রোলারের দফতর উৎপাদন, বিক্রি ও বণ্টন বন্ধের নির্দেশ দেয়।

ভারতে তৈরি কাশির সিরাপ খেয়ে গাম্বিয়া ও উজবেকিস্তান-সহ বিভিন্ন দেশে শিশুদের মৃত্যুর অভিযোগ সামনে আসার পর থেকেই দেশের ওষুধ শিল্পের গুণমান নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নজরদারি বেড়েছে। সেই আবহে সান ফার্মার মতো বড় সংস্থার কারখানায় এমন ত্রুটি ধরা পড়া নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

৩৩২ ব্যাচের ওষুধ প্রত্যাহার

নিয়ন্ত্রকদের নথি অনুযায়ী, চোখের চিকিৎসায় ব্যবহৃত তরল ওষুধ ‘অফথ্যালমিক সাসপেনশন’-এর ৩৩২টি ব্যাচ বাজার থেকে প্রত্যাহার করার বিষয়ে সংস্থার কাছে বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে। ওই সময় মজুতদার ও সরবরাহকারীদের পাঠানো একটি অভ্যন্তরীণ বিজ্ঞপ্তিতে সান ফার্মা জানিয়েছিল, সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবেই ওষুধগুলি বাজার থেকে সরানো হচ্ছে।

তবে প্রত্যাহার করা সমস্ত ওষুধ দূষিত ছিল কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। এমনকি বাজার থেকে তুলে নেওয়া পণ্যগুলির সম্পূর্ণ তালিকাও প্রকাশ্যে আনেনি সংস্থা।

প্রত্যাহার করা ওষুধগুলির মধ্যে রয়েছে Lotepred 1% 5ml আই ড্রপ, Nepalact OD, Nepalact-Z, Brinzotim 5ml আই ড্রপ এবং Depopred 2ml। চিকিৎসকদের মতে, এই ধরনের ওষুধ চোখের প্রদাহ, সংক্রমণ এবং দীর্ঘস্থায়ী চক্ষুরোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।

ওষুধগুলি ব্যবহারের পর কোনও রোগী বিরূপ প্রতিক্রিয়ার অভিযোগ জানিয়েছেন কি না, কিংবা প্রত্যাহার করা ব্যাচগুলির কোনওটি বিদেশে রপ্তানি হয়েছিল কি না, তা এখনও জানা যায়নি।

রয়টার্স ওষুধের প্যাকেটের তথ্য পরীক্ষা করে দেখেছে, প্রত্যাহার করা পণ্যগুলির অধিকাংশই তৈরি হয়েছিল অসমের কোকঝাড় গ্রামের কারখানায়। তবে নিয়ন্ত্রকদের উল্লেখ করা ৩৩২টি ব্যাচ কেবল ওই ১১টি ব্র্যান্ডের অন্তর্ভুক্ত ছিল, নাকি আরও কোনও ব্র্যান্ডের ওষুধও এর মধ্যে রয়েছে, তা স্বাধীন ভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

শিল্পক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞদের অনুমান, সংশ্লিষ্ট ব্যাচগুলিতে সব মিলিয়ে কয়েক লক্ষ বোতল চোখের ড্রপ থাকতে পারে।

সংস্থার দাবি, সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে

নিয়ন্ত্রকদের নির্দেশের জবাবে সান ফার্মা নিয়ম মেনে চলা সংক্রান্ত একটি রিপোর্ট জমা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত এক আধিকারিক। বর্তমানে সেই রিপোর্ট খতিয়ে দেখছেন নিয়ন্ত্রকেরা।

গত শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, এক বিবৃতিতে সান ফার্মা জানিয়েছে, তারাই স্বেচ্ছায় কারখানার উৎপাদন সাময়িক ভাবে বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এবং বিষয়টি নিয়ন্ত্রকদের জানিয়েছিল। সংস্থার আরও দাবি, প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক পদক্ষেপ করা হয়েছে।

তবে বাজার থেকে ওষুধ প্রত্যাহারের কারণ ও তার বিস্তারিত তথ্য নিয়ে রয়টার্সের প্রশ্নের জবাব দেয়নি সংস্থা। নিজেদের ওয়েবসাইটে সান ফার্মার দাবি, বিশ্বজুড়েই তারা একই মানের গুণমান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অনুসরণ করে।

আগেও উঠেছে দূষণের অভিযোগ

চোখের ওষুধ নিয়ে এই বিতর্কের আগেও রোগীদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত সতর্কবার্তা জারি হয়েছিল। গত জুনে চক্ষুবিশেষজ্ঞদের স্বাধীন সংগঠন অল ইন্ডিয়া অফথ্যালমোলজিক্যাল সোসাইটি (এআইওএস) Predmet আই ড্রপের কয়েকটি ব্যাচ নিয়ে সতর্ক করেছিল। সংগঠনের বক্তব্য ছিল, ওই ব্যাচগুলির ওষুধে দূষণের আশঙ্কা রয়েছে।

এআইওএস-এর সম্পাদক চিকিৎসক সন্তোষ হোনাভর রয়টার্সকে জানিয়েছেন, Predmet ব্যবহার করা কয়েক জন রোগীর ক্ষেত্রে সংক্রমণের খবর পাওয়া গিয়েছিল। পরে সিল করা বোতলের নমুনা পরীক্ষা করেও ওষুধে দূষণের প্রমাণ মেলে বলে দাবি তাঁর। চিকিৎসক হোনাভরের বক্তব্য, ওই ওষুধগুলিও বাজার থেকে তুলে নিয়েছিল সান ফার্মা।

এআইওএস-এর সতর্কবার্তা নিয়ে মন্তব্য চাওয়া হলেও কোনও উত্তর দেয়নি সংস্থা।

নিয়ন্ত্রকদের নথিতে আরও জানা গিয়েছে, গুণমান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় ব্যর্থতার অভিযোগে গত ১০ আগস্ট সান ফার্মাকে কারণ দর্শানোর নোটিস পাঠানো হয়েছিল। সংস্থার জবাবে সন্তুষ্ট না হয়েই শেষ পর্যন্ত কারখানাটিতে তৈরি সমস্ত চোখের ওষুধের উৎপাদন, বিক্রি ও বণ্টন বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়।

অন্য দিকে, ওষুধ প্রত্যাহারের পরেও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলির তরফে জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত কোনও সতর্কবার্তা প্রকাশ করা হয়নি। এ বিষয়ে মন্তব্য চেয়ে পাঠানো প্রশ্নেরও উত্তর দেননি ভারতীয় নিয়ন্ত্রকেরা।

আগেও নজরে এসেছিল সান ফার্মার কারখানা

জীবাণুমুক্ত ওষুধ তৈরির ক্ষেত্রে সান ফার্মার কারখানায় গুণমান সংক্রান্ত সমস্যা এই প্রথম নয়। গত বছর গুজরাতের হালোল কারখানায় দূষণ প্রতিরোধের ব্যবস্থায় ঘাটতি খুঁজে পেয়েছিলেন পরিদর্শকেরা। এর পর ওই কারখানা থেকে তৈরি ওষুধের চালান আমেরিকায় আসা বন্ধ করে দেয় মার্কিন খাদ্য ও ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

সান ফার্মার ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের বার্ষিক রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশের বাজারে সংস্থার মোট আয়ের প্রায় ৩ শতাংশ আসে চোখের চিকিৎসা সংক্রান্ত ব্যবসা থেকে। আমেরিকার বাজারেও এই বিভাগ সংস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক ক্ষেত্র। জীবাণুমুক্ত ওষুধ উৎপাদনের ক্ষেত্রে অসমের কারখানাটিকে অন্যতম বৃহৎ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনাও ছিল সংস্থার।

এ দিকে, শুক্রবার প্রকাশিত আর্থিক ফলাফলে সান ফার্মা জানিয়েছে, চলতি অর্থবর্ষের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে তাদের মুনাফা কমেছে। মার্কিন সংস্থা অর্গানন অধিগ্রহণের সঙ্গে যুক্ত এককালীন খরচ এর অন্যতম কারণ।

সব মিলিয়ে, চোখের ওষুধ প্রত্যাহার এবং অসমের কারখানায় উৎপাদন বন্ধের নির্দেশ সান ফার্মার জন্য বড় ধাক্কা। বিশেষত আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিকল্পনার মধ্যে ওষুধের গুণমান নিয়ে এমন প্রশ্ন সংস্থার ভাবমূর্তি ও ব্যবসা—দুই ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলতে পারে। তবে প্রত্যাহার করা ওষুধের প্রকৃত ঝুঁকি কতটা, কত জন রোগী এর দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন এবং সংশোধনমূলক পদক্ষেপে নিয়ন্ত্রকেরা শেষ পর্যন্ত সন্তুষ্ট হন কি না, এখন নজর সেদিকেই।